সমুদ্রের তলদেশে জন্ম নিচ্ছে আস্ত একটা নতুন স্তর! অবিরত এই প্রক্রিয়া ঘটে চলে সমুদ্রের তলদেশে। কিন্তু এত দিন তা রেকর্ড করা হয়ে ওঠেনি বিজ্ঞানীদের। কিছু বিষয় দেখে তাঁরা অনুমান করতেন, নতুন স্তরের জন্ম হয়েছে। এ বার সেই জন্ম রেকর্ড করে ফেলেছেন তাঁরা। এই প্রথম বার। দক্ষিণ গোলার্ধে সমুদ্রের তলদেশে নতুন স্তরের জন্ম প্রত্যক্ষ করলেন বিজ্ঞানীরা। ‘নেচার’ পত্রিকায় তাঁদের সেই গবেষণার রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে।
ফ্রেঞ্চ ন্যাশনাল সেন্টার অফ সায়েন্টিফিক রিসার্চের ভূপদার্থবিজ্ঞানী জাঁ-ইভস রয়ের ‘সায়েন্স অ্যালার্ট’-কে জানিয়েছেন, নতুন এক স্তরের জন্ম যে তাঁরা এ ভাবে ধরতে পারবেন, তা স্বপ্নেও ভাবেননি। নিছক গবেষণার জন্যই ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দক্ষিণ ভারত মহাসাগরে আমস্টারডাম দ্বীপের কাছে সমুদ্রের গভীরে একটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বসানো হয়। সেখানে রাখা হয়েছিল পাঁচটি অটোনোমাস হাইড্রোফোন, যারা জলের নীচে শব্দ রেকর্ড করতে সক্ষম। বিজ্ঞানীদের উদ্দেশ্য ছিল, অস্ট্রেলিয়া এবং আন্টার্কটিকার মাঝে দক্ষিণ-পূর্ব ভারতীয় শৈলশিরা নিয়ে গবেষণা।
সমুদ্রের তলদেশে, সেই স্থানে সূর্যের আলো পৌঁছোয় না। সেখানেই নতুন স্তরের গঠনের প্রক্রিয়া রেকর্ড করেছেন বিজ্ঞানীরা। পরীক্ষায় দেখা যায়, ভূগর্ভে আলোড়নের ফলে সমুদ্রের তলদেশে ভূমিস্তরে ফাটল ধরছে। সেই ফাটল দিয়েই বেরিয়ে আসছে লাভা। তার পরে তা জমে তৈরি হচ্ছে নতুন এক আস্তরণ। দীর্ঘ কাল ধরে সেই প্রক্রিয়া ঘটেনি, বরং ঘটেছে খুব কম সময়ের মধ্যেই। সেই ঘটনার শব্দ শুনে বেশ কিছু সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন তাঁরা।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর ত্বকের তিন ভাগের দুই ভাগ এই পদ্ধতিতে তৈরি হয়েছে। রয়ের জানিয়েছেন, কী ভাবে ভূগর্ভের দু’টি পাত পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তার পরে সেই ফাটল দিয়ে কী ভাবে লাভা বেরিয়ে এসে নতুন স্তর তৈরি করে, সবই নথিবদ্ধ করতে পেরেছেন তাঁরা। ভারত মহাসাগরের গভীরে দক্ষিণ-পূর্ব ভারতীয় শৈলশিরা ধরে চলেছে সেই প্রক্রিয়া। ২০২৪ সালের এপ্রিল নাগাদ সেই প্রক্রিয়া টের পান এবং নথিবদ্ধ করেন তাঁরা।
কী ঘটে? রয়েররা টের পান, ওই অঞ্চলে বার বার ভূমিকম্প হচ্ছে। শৈলশিরা বরাবর কয়েক কিলোমিটার ধরে চলছে সেই ভূমিকম্প। আর তার পরেই সমুদ্রের তলদেশে ভূমিতে ফাটল ধরে তা থেকে বেরিয়ে আসছে লাভা। তাঁরা দেখেন দু’ঘণ্টার মধ্যে ১৫ কোটি ঘনমিটার ম্যাগমা বা লাভা চাদরের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। তৈরি করছে স্তর। ওই অঞ্চলে তখন প্রবল ঝাঁকুনি তৈরি হচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা জানান, অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ লাভা নির্গত হওয়ার কারণে সমুদ্রের তলদেশের নিচে ম্যাগমা চেম্বারটি খালি হয়ে যায়। এর ফলে সমুদ্রের তলদেশের উপরিস্তর বা মেঝে ধসে যায়। সেই অংশটি ধসে ৪.২ মিটার (১৩.৮ ফুট) নীচে পড়ে যায়। এর আগে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, এই প্রক্রিয়াগুলি খুব ধীরে ঘটে। প্রতি বছরে সমুদ্রের গভীরে গড়ে আড়াই ইঞ্চি করে প্রসারিত হয় তলের পৃষ্ঠদেশ। ২০২৪ সালের ওই গবেষণার পরে বিজ্ঞানীদের ধারণা হয়, দীর্ঘ সময় শান্ত থাকার পরে হঠাৎই এক ঝাঁকুনিতে অনেকটা সম্প্রসারিত হয় তলদেশের স্তর।
আরও পড়ুন:
সমুদ্রের তলদেশে সেই ঝাঁকুনির প্রক্রিয়া যখন চলছলি, তখন ফাটল বরাবর পাত দু’টি দু’দিকে সরে যাচ্ছিল। প্রতি সেকেন্ডে তারা প্রায় দু’ইঞ্চি করে দু’দিকে সরে যাচ্ছিল বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এই প্রক্রিয়া এত দ্রুত ঘটেছে বলেই বিজ্ঞানীরা তা প্রত্যক্ষ করতে পেরেছেন। বছরের পর বছর ধরে তা চললে এ ভাবে স্পষ্ট বোঝা যেত না।
বিজ্ঞানীরা যখন গবেষণা শুরু করেছিলেন, তখন তাঁদের আশা ছিল, পাতের ধীর সঞ্চালন ধরা পড়বে তাঁদের যন্ত্রে। কিন্তু তাঁরা যা দেখেছেন, তা ৪০ বছরে এক বার ঘটে, এমনটাই জানান রয়ের। আর সেই প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করেই তাঁদের ধারণা হয়েছে, সমুদ্রের তলদেশ বা নতুন টেকটোনিক ক্রাস্ট মসৃণ প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে তৈরি হয় না। বরং তৈরি হয় আকস্মিক ঝাঁকুনিতে।