যে দিকে চোখ যায়, শুধুই সাদা বরফ। আন্টার্কটিকায় সেই বরফের স্তরের মধ্যে বা নীচে কি কিছু বেঁচে থাকতে পারে? বিজ্ঞানীদের মনে দীর্ঘ সময় ধরে ছিল সেই প্রশ্ন। তার উত্তর পেতেই আন্টার্কটিকায় ৫২৩ মিটার পুরু বরফের মধ্যে দিয়ে খননকার্য চালিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। প্রায় ২২৮ মিটার নীচ থেকে তুলে এনেছিলেন কাদা, জীবাশ্ম, যা আদতে ভবিষ্যৎ জানান দিয়েছে। আন্টার্কটিকার সেই বরফস্তরের নীচে লক্ষ লক্ষ বছর আগে কী ছিল, তারই যেন কিছুটা ইঙ্গিত মিলেছে। সেই সঙ্গেই বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ, এ ভাবেই পৃথিবী উত্তপ্ত হতে থাকলে সেই বরফের স্তর গলে গিয়ে আবার বেরিয়ে পড়েব উন্মুক্ত সমুদ্র, যা কোটি কোটি বছর আগে ছিল। সে রকম হলে ডুবে যেতে পারে বহু শহর! বিজ্ঞানীদের একাংশ বলছেন, খননকাজ চালানোর কাজটা খুব একটা সহজ ছিল না। তার অন্যতম কারণ হল দুর্গম এলাকা এবং আবহাওয়া। মনে রাখতে হবে, আন্টার্কটিকায় যত বরফ রয়েছে, তা গলে গেলে সব সমুদ্রে জলের উচ্চতা ১৩ থেকে ১৬ ফুট বৃদ্ধি পেতে পারে। এ হেন আন্টার্কটিকায় বিভিন্ন দেশের গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। সেখানে নিকটতম যে গবেষণা কেন্দ্র ছিল, তার চেয়ে ৭০০ কিলোমিটার দূরে একটা জায়গা খননকাজের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল। পশ্চিম আন্টার্কটিকা বরফ-চাদরের প্রান্তে ক্রেরি আইস রাইসে তৈরি করা হয় সেই গবেষণাশিবির।
ওই শিবিরে খননকাজের জন্য গিয়েছিলেন ১০টি দেশের ২৯ জন বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার, ড্রিল কর্মী এবং মেরু বিশেষজ্ঞ। বরফের উপরে বিশেষ তাঁবু খাটিয়ে থাকতে শুরু করেছিলেন তাঁরা। আন্টার্কটিকার পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া মোটেও সহজ ছিল না। আকাশে সর্বক্ষণ জ্বল জ্বল করছিল সূর্য। এ দিকে গায়ে চাপানো একের পর এক জ্যাকেট ভেদ করে হাড়ে বিঁধত ঠান্ডা বাতাস। হাঁটাচলা করতে পর্যন্ত কষ্ট হত তাঁদের। কেউ কেউ ধরেই নিয়েছিলেন, এই আবহে সফল হওয়া এক প্রকার অসম্ভব। তার আগে দু’বার একই উদ্যোগ নিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা, যা ভেস্তে যায়। মূলত প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণেই সেই উদ্যোগ ভেস্তে গিয়েছিল। তাই তৃতীয় বারে বিজ্ঞানীরা ছিলেন বদ্ধপরিকর। তাঁর বুঝেছিলেন, তৃতীয় বার না হলে আর কখনও গবেষণা সফল হবে না।
আরও পড়ুন:
এই দোনামনার মধ্যেই খননকাজ শুরু করেন বিজ্ঞানীরা। বিশেষ ধরনের গরম-জল ড্রিলের মাধ্যমে বরফের ভিতর দিয়ে ৫২৩ মিটার গভীর গর্ত খনন করেন। বরফের নীচে আন্টার্কটিকায় কী রয়েছে, তার হদিস পাওয়াই ছিল উদ্দেশ্য। তার পরে ১,৩০০ মিটার দীর্ঘ রাইজ়ার এবং ড্রিল পাইপ খনন করা গর্তের মধ্যে দিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে তুলে আনা হয়েছিল পলি, মাটির নমুনা। চলতি বছর জানুয়ারি নাগাদ তা হয়েছিল। সেই নমুনা পরীক্ষা করে এমন কিছু জীবাশ্ম মেলে, যা পরখ করে বিজ্ঞানীদের ধারণা হয়, আজকের আন্টার্কটিকা অতীতে বরফমুক্ত ছিল। সেখানে সমুদ্র ছিল উন্মুক্ত।
জীবাশ্মের বয়স নির্ধারণ করে বিজ্ঞানীদের ধারণা, ২ কোটি ৩০ লক্ষ বছর আগে সেগুলি সেখানে ছিল। তখন আন্টার্কটিকার ওই অংশের তাপমাত্রা ছিল, শিল্পায়নের আগে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রার চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। সেই সময়ের কোনও প্রাণী বা উদ্ভিদ আজ আর বেঁচে নেই। বিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করছেন, পৃথিবী ক্রমে উষ্ণ হতে হতে এক সময় যে পর্যায়ে পৌঁছোবে, আন্টার্কটিকার গভীর থেকে মেলা সেই জীবাশ্ম ভবিষ্যতের সেই ছবিই তুলে ধরেছে। গভীরে খনন করে যে কাদা মিলেছে, তা আদতে পূর্বাভাস, এমনটাই মত বিজ্ঞানীদের।
আরও পড়ুন:
বিজ্ঞানীদের মতে বিষয়টি উদ্বেগজনকও। আন্টার্কটিকায় বরফের মধ্যে খনন করে ২২৮ মিটার গভীর থেকে যে কাদা তুলে আনা হয়েছে, তা প্রমাণ করে, সেখানে এক সময় উন্মুক্ত সমুদ্র ছিল। অর্থাৎ অতীতে সেই বরফের স্তর ছিল না। ওই স্তরে যে প্রাণীরা ছিল, আজ তারা কয়েকশো মিটার বরফের স্তরে চাপা পড়ে রয়েছে। পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়তে বাড়তে আবার আগের পরিস্থিতি তৈরি হলে ওই বরফের স্তর আবার গলে যাবে। তার জেরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাবে। ডুবে যেতে পারে মায়ামি, মুম্বইয়ের মতো শহরগুলিও। কাদার স্তর পরীক্ষা করতে এখনও বহু বছর সময় লেগে যাবে বিজ্ঞানীদের। তবু একটি ইঙ্গিত তারা পেয়েছেন, যা উদ্বেগজনক বলেই মনে করছেন।