আদি, সরল, অনুন্নত প্রোক্যারিওটিক কোষ থেকে উন্নত ইউক্যারিওটিক (পূর্ণগঠিত) কোষে উত্তরণ। কোন পথে এই বদল, তার ধারণা ছিল। কিন্তু প্রত্যক্ষ প্রমাণ ছিল না। সেই অভূতপূর্ব ঘটনা প্রথম বার দেখা গিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই গবেষণা সরল থেকে জটিল কোষের বিবর্তন-পথের রহস্য উন্মোচনে যেন এক আলোকরেখা, যা উস্কে দিয়েছে জীবন বিকাশে পারস্পরিক সহযোগিতার গুরুত্বও।
জীববিজ্ঞানীদের একাংশের মত, চরম পরিবেশে টিকে থাকার জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা ছিল প্রাচীন জীবনের অন্যতম কৌশল। আর এই গবেষণা শুধু এক নতুন অণুজীবের সন্ধান দেয়নি, পৃথিবীতে জীবনের ইতিহাস যে আসলে সংযোগ, সহাবস্থান ও পারস্পরিক নির্ভরতার এক দীর্ঘ কাহিনি, তারই প্রমাণ দিয়েছে।
জীববিজ্ঞানের তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রথম ইউক্যারিওটিক কোষ সৃষ্টি হয় অণুজীব আর্কিয়া ও ব্যাক্টিরিয়ার বিশেষ সহাবস্থানের (সিমবায়োসিস) মাধ্যমে। প্রাচীন এক আর্কিয়া ও ব্যাক্টিরিয়া ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত হয় এবং এক পর্যায়ে একটি অন্যটির ভেতরে প্রবেশ করে। তা থেকে সৃষ্টি মাইটোকন্ড্রিয়ার, যে অঙ্গাণু ইউক্যারিওটিক কোষে শক্তিকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
‘কারেন্ট বায়োলজ়ি’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার ‘শার্ক বে’-তে পৃথিবীতে প্রাচীনতম জীবনের অন্যতম নিদর্শন ‘স্ট্রোমাটোলাইট’ নামের অণুজীবের আস্তরণে খোঁজ মিলেছে এক নয়া অণুজীবের। ‘অ্যাজ়গার্ড আর্কিয়া’ গোষ্ঠীর আদিম অণুজীবের সম্প্রদায়ই হয়তো সরল কোষ থেকে জটিল কোষের বিবর্তনের অন্যতম ভিত্তি তৈরি করেছিল। উল্লেখ্য, জটিল অণুজীবের নগরী ‘মাইক্রোবিয়াল ম্যাট’ই প্রথম আণবিক অক্সিজেন তৈরি করে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে বদলে দিয়েছিল।
গবেষক দলের অন্যতম, বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি ও ফার্মাকোলজির অধ্যাপক দেবনাথ ঘোষাল জানান, ইলেকট্রন ক্রায়োটোমোগ্রাফি প্রযুক্তি ব্যবহার করে যে ত্রিমাত্রিক ছবি মিলেছে, তাতে স্পষ্ট দেখা গিয়েছে ওই অণুজীব ন্যানোটিউবের মাধ্যমে সরাসরি ব্যাক্টিরিয়ার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে। রয়েছে ছোট ছোট ‘ভেসিকল’ ও অন্য নলাকার অঙ্গসদৃশ গঠনও। পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, অণুজীবগুলি ভিটামিন, পুষ্টি পদার্থ ও হাইড্রোজেন গ্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান একে অপরের সঙ্গে বিনিময় করে। “এই পারস্পরিক নির্ভরতা প্রাচীন জীবনের সহযোগিতামূলক বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র”, মত দেবনাথের।
দেবনাথ আরও জানান, এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে চার বছরের কঠিন পরিশ্রম। কারণ, ওই আর্কিয়াকে পরীক্ষাগারের পরিবেশে টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত কঠিন, যে হেতু এগুলি পরিবেশের অন্য অণুজীবের উপরে নির্ভর করে বেঁচে থাকে। তাই বিচ্ছিন্ন ভাবে নয়, বরং ওই আর্কিয়াকে তার নিজস্ব পরিবেশে রেখেই পর্যবেক্ষণের জন্য নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কাজে লেগেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ‘ডিপ লার্নিং’-ও। মেশিন লার্নিং-নির্ভর প্রোটিন গঠন বিশ্লেষণ করে কোষীয় গঠনের প্রাচীন রূপ চিহ্নিত করা গিয়েছে।