এই সে দিন পর্যন্ত বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে অন্য রাজ্যের ‘মডেল’ বারবার সামনে আনতেন বিজেপির নেতারা। বঙ্গ বিজয়ের পরে এ বার অন্য ছবি! উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের লক্ষ্যে বিজেপির নেতা-কর্মীদের পশ্চিমবঙ্গের দৃষ্টান্ত দিলেন সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। মঞ্চে তখন উপস্থিত বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীনও।
উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা নির্বাচন আগামী বছর। অযোধ্যার রামমন্দির ট্রাস্টের তহবিল ঘিরে বিতর্কের প্রেক্ষিতে এবং বিধানসভা ভোট মাথায় রেখে প্রস্তুতি শুরু করার লক্ষ্যে সে রাজ্যে গিয়ে দলের নেতা-মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন। তার মধ্যেই ছিল বিজেপির অওয়ধ অঞ্চলের শক্তি-কেন্দ্র (বুথ) সম্মেলন। সূত্রের খবর, লখনউয়ে ওই সম্মেলনে নিতিনের উপস্থিতিতেই বাংলার উদাহরণ টেনেছেন মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ। যোগী বলেছেন, ‘লোকসভা, বিধানসভা হোক বা পুরসভা, ভোটের মূল কেন্দ্র হল বুথ। প্রধানমন্ত্রী এই কথাটা বারবার বলেন। বুথেই মানুষের সঙ্গে আমাদের সরাসরি সংযোগ হয়। বুথ বা শক্তি-কেন্দ্র মজবুত করা তাই জরুরি’। এই সূত্রেই তাঁর সংযোজন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশকারীদের রমরমা ছিল, ব্যাপক অরাজকতা ছিল। বিজেপির বহু কর্মীকে সেখানে বলিদান দিতে হয়েছে। তার পরেও পশ্চিমবঙ্গে এমন জয় সম্ভব হয়েছে, কারণ শক্তি-কেন্দ্র মজবুত হয়েছে’। বুথ কো-অর্ডিনেটর বা শক্তি-কেন্দ্র সংযোজকদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রীর আহ্বান, বুথ মজবুত রেখে এবং সরকারের ভাল কাজের প্রচার করলে উত্তরপ্রদেশেও ফের পশ্চিমবঙ্গের মতোই জয় আসবে। পশ্চিমবঙ্গে এখন হিন্দুরা যে ‘সুরক্ষিত’, তার জন্য শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অবদানের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেছেন যোগী।
ভিন্ রাজ্যে এমন ‘স্বীকৃতি’ পেয়ে প্রত্যাশিত ভাবেই আনন্দিত বঙ্গ বিজেপির নেতৃত্ব। দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের কথায়, ‘‘আগে অন্য রাজ্যে দলের জয়ে আমরা আনন্দিত হয়েছি। মধ্যপ্রদেশে জয় এলে সে রাজ্যের চেয়ে কম বিজয় মিছিল এখানে হয়নি! কঠিন ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে এই রাজ্যে দলের কর্মীরা লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন। এ বার বৃহত্তর (ম্যাক্রো) ক্ষেত্রে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ ছিল। সেই ক্ষোভকে ভোটের বাক্সে নিয়ে আসার জন্য নিচু স্তরে (মাইক্রো) বুথ ব্যবস্থাপনা কার্যকর হয়েছে। এই লড়াইয়ের কথাই যোগীজি বলতে চেয়েছেন।’’ একই সঙ্গে শমীক মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ‘‘দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকের কমিউনিস্ট শাসনে অন্যায় ও অরাজকতা, তার পরে ১৫ বছরে তৃণমূলের অপশাসন ছিল বাংলায়। ভোটের নামে যে গুন্ডারাজ চলেছে, দেশের অন্য কোথাও তেমন হয়নি। এ সবের মোকাবিলা করেই শ্যামাপ্রসাদের রাজ্যে আমাদের দলের নেতা-কর্মীরা লড়াই করেছেন। কাজ এখনও শেষ হয়নি, বরং নতুন করে শুরু হয়েছে। মানুষের পাশে থেকে যেটা করে যেতে হবে।’’
বাংলায় বুথ স্তরের লড়াই অন্য রাজ্যে ‘মান্যতা’ পেলেও রাজ্য বিজেপির অন্দরে একাংশের অবশ্য উদ্বেগও রয়েছে। বাংলায় বহু জায়গাতেই সাংগঠনিক অস্তিত্ব বা সক্রিয়তা ছাড়াই তৃণমূল-বিরোধী ক্ষোভের হাওয়ায় বিজেপি জিতে গিয়েছে। এখন সরকার গঠনের পরে নানা জায়গায় বিজেপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে তৃণমূলের পুরনো জুতোয় পা গলানোর অভিযোগ আসছে, কোথাও কোথাও প্রাক্তন শাসক দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের একাংশকে বর্তমান শাসকের সঙ্গে ভিড়ে যেতে দেখা যাচ্ছে। দলের এক নেতার মতে, ‘‘সংগঠন বিস্তার নিশ্চয়ই কাম্য এবং কাঙ্খিত। তবে স্থানীয় স্তরে বেনো জলের অনুপ্রবেশ ঠেকানোও এখন বড় চ্যালেঞ্জ!’’
প্রসঙ্গত, দলীয় সম্মেলনে যোগী যেমন আগামী ৯ মাসে বুথ স্তরে সক্রিয়তা বাড়াতে বলেছেন, তেমনই নিতিন বার্তা দিয়েছেন শাসক দলে অন্তর্দ্বন্দ্ব বন্ধ করার। তাঁর বক্তব্য, নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সরিয়ে বিধানসভার নির্বাচনে বিধায়ক ও সাংসদদের ৫০-৫০ দায়িত্ব নিতে হবে।