দুর্গা পুজোর সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা-নেত্রীদের অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক অনেক বছরের। রাজ্যে দেড় দশকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার থাকাকালীন সেই সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছিল। ‘প্রভাবশালী’ নেতা-নেত্রীদের বদান্যতায় অনেক পুজোর আড়ে-বহরে বৃদ্ধিও হয়েছিল। পুজো উদ্বোধনে মুখ্যমন্ত্রী মমতার দৌড়ও যেন ছিল অন্তহীন! রাজ্যে পালাবদলের পরে মমতার সেই পুজোর বৃত্তে এ বার ঢুকতে চলেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
নতুন সরকারের আমলে প্রথম পুজো। স্বভাবতই মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পুজো উদ্বোধনের আবদারও বেড়ে চলেছে। ক্ষমতা হারানোর পরে তৃণমূল এখন তিন শিবিরে বিভক্ত। কিছু দিন আগে পর্যন্ত তৃণমূল নেত্রীর ‘কিচেন ক্যাবিনেটে’ থাকা নেতা-নেত্রীদের অধিকাংশই এখন বিদ্রোহী শিবিরে। পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে তাল রেখে তাঁরা নিজেদের পুজোয় নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে চাইছেন। মুখ্যমন্ত্রীও সাধ্যমতো তাঁদের ‘তথাস্তু’ বলছেন! সূত্রের খবর, সব ঠিকমতো চললে ফিরহাদ (ববি) হাকিম, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, মদন মিত্রদের পুজোয় এ বা দেখা যেতে পারে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুকে।
পুজোর প্রশ্নে বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যেই তাঁর মনোভাব স্পষ্ট করে দিয়েছেন। আয়োজনের জৌলুসের চেয়ে মুখ্যমন্ত্রীর অগ্রাধিকার সনাতনী আচারের দিকে। যে কারণে দেবীপক্ষ সূচনার আগে কোনও পুজো মণ্ডপে না-যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। পুজো উদ্বোধনে গেলেও পারতপক্ষে সেখানে বক্তৃতা করবেন না (মমতা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই করতেন)। প্রদীপ জ্বালবেন, প্রতিমাকে প্রণাম সেরে বেরিয়ে আসবেন। মুখ্যমন্ত্রীর উদ্বোধনের তালিকায় কিছু বড় বা নামী পুজো যেমন থাকবে, তেমনই থাকবে কিছু ছোট এবং বিজেপি নেতাদের সঙ্গে আগে থেকে যুক্ত থাকা পুজোও। কলকাতার পাট সেরে শুভেন্দুর কর্মসূচি থাকবে জেলায়। আর এই পর্বের আগে মুখ্যমন্ত্রীর বিশেষ নজর থাকছে ইডেন গার্ডেনে মহালয়ার মহা-অনুষ্ঠানের দিকে। বাঙালিয়ানা নিয়ে চলমান বিতর্কের আবহে এ বার মহালয়ার অনুষ্ঠানে তাক লাগাতে চাইছে রাজ্য সরকার। সূত্রের খবর, মুখ্যমন্ত্রী এবং তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু নিজেই ওই অনুষ্ঠানের পরিকল্পনায় নজর রাখছেন।
মমতার পুরনো কেন্দ্র ভবানীপুরেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু এখন বিধায়ক। ভবানীপুর এলাকার মধ্যে একাধিক পুজোর উদ্বোধনে দেখা যেত মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে। কিছু পাড়ায় পায়ে হেঁটেও গিয়েছেন তিনি। সেখানকারই বাসিন্দা, বিদ্রোহী শিবিরে যাওয়া বিধায়ক মদন মিত্র এ বার তাঁদের ৭৬ পল্লির পুজোর সূচনার জন্য মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুকে চিঠি দিয়েছেন। মদনের কথায়, ‘‘ভবানীপুরের অনেক পুজোই আগে মুখ্যমন্ত্রীকে পেয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর হাতের ছোঁয়া থেকে ৭৬ পল্লি কেন বঞ্চিত থাকবে! সেই কারণে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানিয়েছি।’’ কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ববির পুজো চেতলা অগ্রণীতে চোখ আঁকতে দেখা যেত মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে। এ বার সেই পুজোর দ্বারোদঘাটন হওয়ার কথা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর হাতে। ববির মতে, ভবানীপুর কেন্দ্রের অংশ হিসেবেই চেতলায় মুখ্যমন্ত্রী আসবেন। আরও এক প্রাক্তন মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের হিন্দুস্তান ক্লাবের পুজো মণ্ডপেরও ফিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর হাতেই কাটা হবে বলে এখনও পর্যন্ত ঠিক আছে। দক্ষিণ কলকাতার ওই অংশে ত্রিধারা, হিন্দুস্তান পার্ক, সিংহী পার্ক, একডালিয়া, সমাজসেবী সঙ্ঘ, বালিগঞ্জ কালচারাল-সহ একাধিক নামী পুজো রয়েছে। প্রায় সব উদ্যোক্তাই চাইছেন, মুখ্যমন্ত্রী ওই এলাকায় এলে তাঁদের মণ্ডপেও এক বার আসুন। নিউ আলিপুরের সুরুচি সঙ্ঘের কমিটি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় প্রাক্তন মন্ত্রী এবং পুজোর দাপুটে উদ্যোক্তা অরূপ বিশ্বাস অবশ্য এই বলয়ের বাইরে চলে গিয়েছেন আপাতত!
শুভেন্দু বিরোধী দলনেতা থাকাকালীন নিউ মার্কেটের মতো কিছু পুজো তাঁকে আমন্ত্রণ জানাত। মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ মহল সূত্রের ইঙ্গিত, পুরনো যোগাযোগের খাতিরে এবং বিজেপি নেতাদের অনুরোধে কিছু পুজোয় তিনি যাবেন। আয়তন যেমনই হোক না কেন। এক বিজেপি নেতার কথায়, ‘‘নানা রকম জল্পনা ছড়ানো হচ্ছে। তবে পুজো এ বার আগের চেয়ে বেশি নিয়ম মেনে ও সুষ্ঠু ভাবে হবে। মুখ্যমন্ত্রী তা নিশ্চিত করবেন।’’
এই বদলানো সময়ের পুজোয় মমতাকে কোথায় দেখা যেতে পারে, শুরু হয়েছে সেই চর্চাও!