বর্ষা তখনও বিদায় নেয়নি। নীল আকাশে সাদা মেঘও ভেসে আসেনি। তবু অন্য বছরের মতোই আলিপুর বেলভেডিয়ার রোডের উঁচু পাঁচিল টপকে ভিতরে ঢুকে পড়েছিল পুজোর হাওয়া। প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারের কারাকর্মী এবং বন্দিরা লেগে পড়েছিলেন থিম বাছাইয়ে। দর্শক উপচে না-পড়ুক, থিমের মণ্ডপ করতে তো বাধা নেই!
কারা সূত্রের খবর, বন্দে মাতরমের ১৫০ বছর উপলক্ষে এ বার ‘বন্দে মাতরম্ এবং জাতীয়তাবাদ’— এই থিমকেই বেছে নিয়েছেন প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারের উদ্যোক্তারা। সংশোধনাগারের বন্দিদের নিয়ে গঠিত সাংস্কৃতিক দলই হাতে-হাতে সাজিয়ে তুলেছে মণ্ডপ। মণ্ডপের চারপাশে ফ্লেক্সে তুলে ধরা হয়েছে ব্রিটিশ আমলে প্রেসিডেন্সিতে থাকা স্বাধীনতার শহিদদের গল্প।
শুধু প্রেসিডেন্সি নয়, রাজ্যের বহু সংশোধনাগারেই এই ক’দিন খুশির ছোঁয়া লাগে। ঢাকের বাদ্যি, আলো, ধুনোর গন্ধ মিলেমিশে যায় গরাদআঁটা কুঠুরিতেও। কারা দফতরের এককর্তা বলছিলেন, ‘‘পরিবার-সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অপরাধেরসাজা ভোগ করছে এরা। তবুও তার মধ্যে যেটুকু মুক্তি দেওয়া যায়! সন্ধ্যায় মণ্ডপে বসে আড্ডা দেওয়া বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য পুজোর ক’দিন একটু দেরিতেই কুঠুরিতে ফেরত পাঠানো হয়। মেনুতেওবদল আসে।’’
মণ্ডপসজ্জার ক্ষেত্রেও বন্দিদের প্রতিভাকে কাজে লাগানো হয়। বর্ধমান কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে এ বার গ্রামবাংলার থিম ফুটিয়ে তুলেছেন সুনীল নামে এক বন্দি। ফাঁসির সাজা মকুব হয়ে তিনি আপাতত যাবজ্জীবন কারাবাস ভোগ করছেন। সঙ্গে ছিলেন উৎপল নামে আরও এক জন। তবে ব্যতিক্রম দমদম কেন্দ্রীয় সংশোধনাগার। বহু বছর আগে থেকেই তাদের পুজো মূল ফটকের ঠিক বাইরে হয়। ‘জেলের পুজো’ বলে পরিচিত সেই মণ্ডপে আমজনতা যেতে পারে। পুজোর মণ্ডপসজ্জা, স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করেন ‘স্পেশাল প্যারোলে’ মুক্ত বন্দিরা। এ বছরও বাহারি মণ্ডপে সেজেছে ওই পুজো।
আসানসোল জেলে অবশ্য বেশি দিন পুজো শুরু হয়নি। এ বারই দ্বিতীয় বর্ষ। বন্দি-কারারক্ষীদের যৌথপুজোয় মণ্ডপসজ্জায় তেমন অভিনবত্বের ছোঁয়া না-থাকলেও পুজোর মেনুতে আছে। সূত্রের খবর, অষ্টমীর দুপুরে খিচুড়ি-লাবড়া যেমন থাকছে, তেমনই নবমীর দুপুরে পাঁঠার মাংসের ঝোল, দশমীতে ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেন থাকছে। শেষ পাতে মিলবে মিষ্টিও। হাওড়া জেলা সংশোধনাগারেও পুজো হচ্ছে। সেখানেও মণ্ডপ সাজানো থেকে পুজোর জোগাড়— সবই বন্দিদের হাতে। বন্দিদের মধ্যে পুরোহিত মেলেনি। তাই ঠাকুরমশাই বাইরে থেকেই যাবেন।
কারা দফতরের এক কর্তার কথায়, ‘‘কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারগুলিতে বড় মাপের পুজো হয়। সেই তুলনায় জেলা সংশোধনাগারে অত বড় পুজো সম্ভব হয় না। বেশির ভাগ উপ-সংশোধনাগারেও পুজো হয় না। তবে কল্যাণী উপ-সংশোধনাগারে গত পাঁচ বছর ধরে পুজো হচ্ছে।’’ স্থান সঙ্কুলানের জন্য উপ-সংশোধনাগারে পুজো না-হলেও অন্য সব জেলের মতোই ‘স্পেশাল মেনু’ হয়।
সর্বজনীনতাই বাঙালির দুর্গাপুজোর সব থেকে বড় বৈশিষ্ট্য। সেই বাহনে চেপেই বোধহয় গরাদবন্দি জীবনকেও ছুঁয়ে ফেলে সে!