তীব্র উৎকণ্ঠায় কাটছে প্রতিটি মুহূর্ত। ফোন এলেই আশার আলো জ্বলে উঠছে— এই বুঝি ভাল খবর এসেছে, এই বুঝি ফোনের ও-পারে শোনা যাবে প্রিয়জনের গলা। কিন্তু পরক্ষণেই সেই আশার আলো দপ করে নিভে যাচ্ছে। নেপালে হড়পা বানের ঘটনায় প্রিয়জনেরা নিখোঁজ হওয়ার পরে প্রায় দু’দিন কেটে গিয়েছে। কিন্তু এখনও অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে কলকাতা-সহ পশ্চিমবঙ্গের একাধিক পরিবারের।
বুধবার সকালে আচমকাই ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসে নেপালে। জলের তোড়ে ভেসে যায় বিস্তীর্ণ এলাকা। সেখানে বেড়াতে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের কয়েক জনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় পরিবারের। তাঁদের মধ্যে কলকাতারও একাধিক বাসিন্দা রয়েছেন।
নেতাজিনগর থানা এলাকার খানপুর রোডের বাসিন্দা রিনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (৫৪) ভাই বিধানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিন কাটছে ফোন হাতে নিয়ে। বার বার দেখছেন রিনার পাঠানো শেষ ওয়টস্যাপ মেসেজটি। গত রবিবার রিনা লিখেছিলেন, ‘অল ইজ় গুড’। রিনা পেশায় গৃহশিক্ষিকা। বহু দিন ধরেই মানসরোবর-কৈলাস ভ্রমণের ইচ্ছে ছিল তাঁর। নানা কারণে সেই যাত্রা আটকে যাচ্ছিল। এ বার সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বসিত ছিলেন তিনি। আত্মীয় দ্বৈপায়ন মুখোপাধ্যায় জানান, রিনা ফোনে তাঁদের জানিয়েছিলেন, নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছাকাছি একটি জায়গায় ধস নেমেছিল। সেনাবাহিনী রাস্তা পরিষ্কার করে দিচ্ছে, সে কথাও জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তার পর থেকেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
একই উদ্বেগে দিন কাটছে কসবার হালতুর বাসিন্দা সুনীত ভট্টাচার্যের। তাঁর মা সুস্মিতা ভট্টাচার্য (৬৬) ওই দলের সঙ্গেই নেপাল গিয়েছেন। সুনীতের কথায়, মাকে একা ছাড়তে মন চাইছিল না তাঁর। কিন্তু ওই দলে মাত্র একটি আসনই খালি ছিল। সুযোগ ছাড়তে চাননি সুস্মিতা। বারাসত থেকে সপ্তাহান্তে ছেলে-বৌমার কসবার বাড়িতে আসেন তিনি। ছেলেকে ফোনে জানিয়েছিলেন, পশুপতিনাথ মন্দির দর্শন করে তাঁরা মানসরোবরের দিকে এগোচ্ছেন। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছাকাছি একটি হোটেলে থাকার কথাও জানিয়েছিলেন। গত ২১ অগস্ট সুনীতই হাওড়া স্টেশন থেকে মিথিলা এক্সপ্রেসে মাকে তুলে দিয়েছিলেন। এখন সেই সময়ের কথোপকথনই বার বার মনে পড়ছে পরিবারের। বারাসত থেকে চলে এসেছেন সুনীতের বাবা তপন ভট্টাচার্য। কসবা থানা, ভবানী ভবন, নবান্নের হেল্পলাইন— সর্বত্র ফোন ঘুরিয়েছেন স্ত্রীর খবর জানতে। কিন্তু আশার কথা শোনেননি কোথাও। তপনের কথায়, ‘‘রবিবার ফোনে জানিয়েছিল, সোমবার পশুপতিনাথে পুজো দিয়ে মানসরোবর যাবে। আমার সঙ্গে সেটাই শেষ কথা। আশ্চর্যের ব্যাপার যে ভ্রমণ সংস্থার স্যাটেলাইট ফোন নেই। কত বার এ ভাবে একা বেড়াতে গিয়েছে। এ বার কী যে হল!’’
পর্ণশ্রীর বাসিন্দা, প্রাক্তন রেলকর্মী রণজিৎকুমার হাওলাদারের (৬৩) পরিবারও একই ভাবে অপেক্ষায়। মঙ্গলবার রাতে কাঠমান্ডুর একটি হোটেল থেকে স্ত্রী ও একমাত্র মেয়ে সুনন্দার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলেন রণজিৎ। পরের দিন মানসরোবরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। সেটাই তাঁর সঙ্গে পরিবারের শেষ যোগাযোগ। বুধবার বিপর্যয়ের খবর দেখার পর থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। দোতলা বাড়ির সামনে প্রতিবেশীদের ভিড়। রণজিতের স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ার মতো অবস্থায়। মাকে সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছেন সুনন্দা। বেড়াতে যাওয়া রণজিতের নেশা। সুনন্দার অভিযোগ, ভ্রমণ সংস্থার তরফে এখনও কিছু জানানো হয়নি তাঁদের।
বন্ধ মানসকুমার ঘোষ ও দীপালি সরকারের সার্ভে পার্কের ফ্ল্যাট। বৃহস্পতিবার। ছবি: সুমন বল্লভ।
সার্ভে পার্ক থানা এলাকার পাটোয়ারি পার্ক, ইস্টার্ন পার্ক, ফোর্থ রোডের বাসিন্দা দম্পতি মানসকুমার ঘোষ ও দীপালি সরকারও মানসরোবর-কৈলাস ভ্রমণে গিয়ে নিখোঁজ। অবসরপ্রাপ্ত মানস ও দীপালি দু’জনেই ভ্রমণপ্রিয়। এ দিন তাঁদের ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখা যায়, দরজায় তালা। প্রতিবেশী অভী পাটোয়ারি জানান, তাঁদের মেয়ে অদ্রিজা ঘোষ দিল্লি এমসে পড়াশোনা করেন। ফোনে অদ্রিজা জানান, সোমবার সন্ধ্যায় মা-বাবার সঙ্গে শেষ বার কথা হয়েছিল তাঁর। ‘‘কী করে এমনটা ঘটে গেল, বুঝতে পারছি না,’’ বলেন তিনি।
পাটুলির অমরনাথ পালের (৬১) পরিবারও একটি ফোনের অপেক্ষায়। তাঁর মেয়ে রূপমা পাল জানান, তাঁর বাবা একাই ওই ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গে গিয়েছেন। মঙ্গলবার রাতে ফোনে জানিয়েছিলেন, তাঁরা নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছাকাছি রয়েছেন। এলাকায় ধস নামায় সীমান্তে পৌঁছতে কিছুটা দেরি হচ্ছে বলেও জানান। তার পরে আর যোগাযোগ করা যায়নি।
প্রিয়জনেরা কোথায়, কেমন আছেন— এই প্রশ্নের উত্তরই এখন খুঁজছেন এই সমস্ত পরিবারের সদস্যেরা। হাতে ফোন, চোখ বার বার চলে যাচ্ছে স্ক্রিনে। একটি ফোনের অপেক্ষাতেই যেন থমকে রয়েছে তাঁদের সময়।