ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) পরে বহু মানুষের আবেদনের নিষ্পত্তি ঝুলে থাকা নিয়ে আইনি লড়াই এবং বাইরে প্রতিবাদের ডাক ছিলই। এ বার জাতীয় নির্বাচন কমিশনে অভ্যন্তরীণ বিরোধ প্রকাশ্যে আসার পরে রাজনৈতিক প্রতিবাদের ঝাঁঝ ফের বাড়তে চলেছে। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দফতরে আজ, শুক্রবারই পৃথক ভাবে অভিযানের ডাক দিয়েছে বাম ও কংগ্রেস। কলেজ স্কোয়ারে সকালে জমায়েত করে স্ট্র্যান্ড রোডে সিইও দফতরের দিকে মিছিল করার কথা কংগ্রেসের। তার পরে সিপিএমের মহিলা সংগঠন গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির ডাকে ধর্মতলায় জমায়েত করে একই গন্তব্যে মিছিল হবে। এসআইআর-এর সময়ে নানা অভিযোগ জানানোর পরেও কোনও ব্যবস্থা না-নেওয়ায় তৎকালীন সিইও এবং রাজ্যের বর্তমান মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়ালকেও তদন্তের আওতায় আনার দাবি তুলেছেন সিপিএমের মহিলা নেতৃত্ব।
বিতর্কের মুখে বিরোধীদের বিঁধে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের পাল্টা বক্তব্য, “ভোট-পূর্ববর্তী, চলাকালীন, পরবর্তী হিংসা থেকে পশ্চিমবঙ্গকে বাঁচিয়েছেন যিনি, পাঁচ দশক পরে মৃত, ভুয়ো ভোটারদের নাম বাদ দিয়েছেন ও মানুষকে ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিয়েছেন যিনি, তিনি জ্ঞানেশ কুমার। অবাধ, শান্তিপূর্ণ, ত্রুটিমুক্ত ভোটার তালিকা করে দেখিয়েছেন তিনি। তাঁকে কমপক্ষে পদ্মভূষণ দেওয়া উচিত!”
‘ভোটার তালিকায় আমার নাম ফিরিয়ে দাও’— এই স্লোগান সামনে রেখে গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতি আগেই ২৫ সেপ্টেম্বর সিইও দফতর অভিযানের ডাক দিয়ে রেখেছিল। যে ভাবে যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির (লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি) কারণ দেখিয়ে বহু মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, বিয়ের পরে পদবি এবং ঠিকানা বদলের কারণে মহিলাদের হয়রানি করা হয়েছে— এই সব অভিযোগের পাশাপাশিই বৈধ ভোটারের নাম ফেরানো এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ চেয়ে তাঁরা পথে নামবেন বলে জানিয়েছেন মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়, কনীনিকা ঘোষ, মোনালিসা সিন্হা, জাহানারা খানেরা। একই বিষয়ে একই দিনে সিইও দফতর অভিযানে যাচ্ছে কংগ্রেসও। কমিশনের মধ্যে বিরোধের খবর সামনে আসার প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার দলের সব রাজ্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ও প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতিদের সঙ্গে বৈঠকে আজ সর্বত্র নির্বাচন কমিশনের দফতরে প্রতিবাদের কর্মসূচি ঠিক করে দিয়েছেন এআইসিসি-র সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) কে সি বেণুগোপাল। জেলায় জেলায় নির্বাচনী আধিকারিক তথা জেলাশাসকের দফতরে অভিযান হবে ২৮ সেপ্টেম্বর, সোমবার।
সিপিএম নেত্রী মীনাক্ষী এ দিন বলেছেন, ‘‘ত্রুটিপূর্ণ এসআইআর প্রক্রিয়ার নামে অপরাধ চালানো হয়েছে। নাম বাদ দেওয়ার জন্য কমিশন কী ভাবে আবেদন জানাল, প্রশ্ন তুলেছেন দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবিন্দর সিংহ সঁধু এবং বিবেক জোশীই। তা হলে সিইসি, কমিশন এবং এ রাজ্যের সিইও দফতরকে কেন বিচারের আওতায় আনা হবে না?’’ মহিলা সমিতির রাজ্য সম্পাদক মোনালিসার বক্তব্য, ‘‘বিচারাধীন থেকে বাদ গিয়েছিল ২৭ লক্ষ ভোটারের নাম। যার মধ্যে ৬৩% মহিলাদের নাম ছিল। ভোটার তালিকায় নাম না-থাকায় এখন বহু মানুষকে অন্যায় ভাবে সরকারি প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে।’’ সিইসি-র অপসারণ এবং ভোটারের নাম ফেরত-সহ একাধিক দাবিতে এসইউসি-র রাজ্য কমিটি ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিটি জেলায় বিক্ষোভ, প্রতিবাদ মিছিল করবে। সিইও দফতরেও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে তারা।
কমিশনে জ্ঞানেশের মনোনয়নের সময়েই এবং নিয়োগের পদ্ধতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কমিটিতে লোকসভার তৎকালীন বিরোধী দলের নেতা হিসেবে তিনি আপত্তি জানিয়েছিলেন, সেই তথ্য মনে করিয়ে দিয়ে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য অধীর চৌধুরীর বক্তব্য, ‘‘রাহুল গান্ধী আগেই যে অভিযোগ করেছিলেন, তা নিয়ে বিজেপি তাচ্ছিল্য, উপহাস করেছিল। এখন কী প্রমাণ হচ্ছে? কোনও দলীয় নেতা নন, নির্বাচন কমিশনারেরাই বলছেন।’’
এরই মধ্যে গত এপ্রিলে নির্বাচনী পর্যবেক্ষকদের ওয়টস্যাপ কথোপকথনের (সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার) স্ক্রিনশট ফের সমাজমাধ্যমে তুলে ধরেছেন মমতা-তৃণমূলের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাতে দেখা যাচ্ছে, কমিশন ও রাজ্যের সিইও-র বিরুদ্ধে ‘প্রতারণা ও অসততা’র অভিযোগ তুলছেন এক পর্যবেক্ষক। অভিষেকের বক্তব্য, ‘ভোটার তালিকা থেকে ৩০ লক্ষ নাম মুছে ফেলা নিয়ে ষড়যন্ত্রের যে অভিযোগ, তা নিয়ে এখানে বলা হচ্ছে। এটা এড়ানো বা ধামাচাপা দেওয়া যায় না। নীরব থেকেও জবাব দেওয়া অসম্ভব। জ্ঞানেশ কুমার এবং ভারতের প্রধান বিচারপতিকে দেশবাসীর কাছে উত্তর দিতে হবে।’ পক্ষান্তরে, কিছু পুরনো ভিডিয়ো (সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার) সামনে এনে অভিষেকের উদ্দেশে রাজ্য বিজেপির প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বলেছেন, ‘এগুলো আপনার কুখ্যাত ‘ডায়মন্ড হারবার মডেলে’র ভিডিয়ো। লোকসভা ভোটের সময় যেখানে বিজেপি প্রার্থীর বোতাম টেপ দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছিল’।