যাওয়ার কথা ছিল শঙ্করপুর থেকে সুন্দরবন। জল কেটে খাল থেকে সাগরে পড়বে এমভি নিবেদিতা। পর্যটকেরা লঞ্চে বসে জল-জঙ্গলের সৌন্দর্য উপভোগ করবেন। কিন্তু নিয়মিত সাগরযাত্রা আর হয়ে ওঠেনি নিবেদিতার। সে এখন শঙ্করপুরের খালের জেটিতে আটকে পড়েছে। হলদিয়া থেকে দিঘায় গিয়ে সুসজ্জিত লঞ্চটি ধীরে ধীরে সৌন্দর্য হারাচ্ছে।
ভূতল পরিবহণ নিগমের লঞ্চ নিবেদিতা। হুগলি, রূপনারায়ণ ও হলদি— তিন নদ-নদীর সঙ্গমস্থলে একসময় সে ছিল পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। হলদিয়া উন্নয়ন পর্ষদ লঞ্চটি পরিচালনা করত। ত্রিবেণী সঙ্গমে পর্ষদের অতিথিশালা ‘ত্রিবেণী’ এবং নতুন অতিথিশালা ‘ত্রিস্রোতা’ আর নিবেদিতায় ভ্রমণ একসময়ে আকর্ষণীয় পর্যটন প্যাকেজ ছিল।
৮০ জন পর্যটক পরিবহণের ক্ষমতা ছিল নিবেদিতার। লঞ্চে ছিল ব্যাঙ্কোয়েট হল, আলোচনা কক্ষ। সব মিলিয়ে এক বিলাসবহুল জলযান। শিল্পশহর হলদিয়ার শিল্পকর্তারা বৈঠক ও পার্টির আয়োজন করতেন এই লঞ্চে। ওয়েবসাইটে বুকিং করতে হত। নিবেদিতায় জন্মদিনের অনুষ্ঠানও হয়েছে বহুবার।
কিন্তু নিবেদিতাকে হলদিয়া ছাড়তে হল কেন? বছর তিনেক আগে দিঘার প্রশাসনিক বৈঠকে আসেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি ঘোষণা করেন, গোয়ার আদলে দিঘায় ক্রুজ় ভ্রমণের ব্যবস্থা করা হবে। সেই পরিকল্পনা মতো ত্রিবেণী সঙ্গম থেকে নিবেদিতাকে নিয়ে আসা হয় শঙ্করপুর খালের পন্টুন জেটিতে। ঠিক হয়, লঞ্চে করে পর্যটকেরা খাল ধরে সুন্দরবন পর্যন্ত যাবেন। সুসজ্জিত বাসে চড়ে দেখবেন দিঘা। সেই বাসও তৈরি হয়। দামি রং পর্যন্ত করা হয় বাসে।
কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী ফিরে যাওয়ার পর পরিকল্পনাটির অগ্রগতি হয়নি। লঞ্চ জেটিতে বাঁধা পড়ে রইল। যাঁরা লঞ্চের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁরা এখানে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছেন জলযাত্রার জন্য। এখন শুধু কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষী রয়েছেন। লঞ্চের দায়িত্বে থাকা প্রদীপ দাস বলেন, ‘‘লঞ্চ চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় দিঘা-শঙ্করপুর ডেভেলপমেন্ট অথরিটি। কেন চলেনি, বিস্তারিত বলতে পারব না। কোনও প্রযুক্তিগত কারণ হয়তো বাধা হয়েছে।’’
বন্দর প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত অভিজ্ঞ মহল জানাচ্ছেন, লঞ্চটি তৈরি হয়েছিল নদীতে চলার জন্য। সমুদ্রে চালানোর উপযুক্ত নয় নিবেদিতা। তাই ‘ফিটনেস সার্টিফিকেটে’র প্রশ্নই ওঠে না। হলদিয়া উন্নয়ন পর্ষদের এক সূত্র জানাচ্ছে, দিঘায় পাঠানোর পর থেকে লঞ্চটি একবার মাত্র পরীক্ষামূলক ভাবে চালানো হয়েছিল। তার পর জেটিতেই আটকা পড়ে রয়েছে।
প্রায় কোটি টাকা মূল্যের লঞ্চ এমভি নিবেদিতা। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হওয়ায় মূল্যবান সম্পদ আজ জেটিতে আটকে মরচে ধরছে। কবে আবার জলে সাঁতার দেবে নিবেদিতা, সে প্রশ্নের উত্তর নেই।