ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ককে সামনে রেখে দিল্লিতে ইতিমধ্যেই বিরোধী-ঐক্য দেখা যাচ্ছে। ভোটাধিকারের প্রশ্নে কমিশনের উপরে চাপ বাড়াতে এ বার কলকাতাতেও এক জায়গায় এল বিরোধীরা। এসআইআর-এ বাদ যাওয়াদের নাম তালিকায় পুনর্বহাল করার পরেই কলকাতা, হাওড়ার পুরভোট হোক, এই দাবিতে সোমবার পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য নির্বাচন কমিশনার (এসইসি) কৃষ্ণ গুপ্তকে লিখিত আবেদন জানাল বিরোধীরা। তাতে সই করেছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার, সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শমীক লাহিড়ী, মমতা-তৃণমূলের সাংসদ সৌগত রায়, সিপিআই (এম-এল) লিবারেশনের পার্থ ঘোষের সঙ্গে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) জহর সরকার, সুজাত ভদ্র, ‘নাগরিক সমন্বয় মঞ্চে’র সামসুর আলি মল্লিক-সহ নাগরিক সমাজের একাংশ।
রাজ্যে ভোটারদের অধিকার ফেরানোর প্রশ্নে ও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আগামী ৫ নভেম্বর সব ক’টি বামপন্থী দল একযোগে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দফতর অভিযানের ডাক দিয়েছে। তার আগে প্রদেশ কংগ্রেস ৩০ অক্টোবর রাজ্য নির্বাচন কমিশনে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। সূত্রের খবর, আপাতত পৃথক প্রতিবাদ হলেও যৌথ কর্মসূচি করার লক্ষ্যেও আলোচনা চলছে।
পশ্চিমবঙ্গ-সহ ১৭টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত এলাকায় এসআইআর-এ বাদ পড়া ভোটারদের জন্য এখন বিশেষ অভিযান চলছে। এর পরে নভেম্বরে শুরু হবে ভোটার তালিকার বিশেষ সংক্ষিপ্ত সংশোধন (এসএসআর)। সেই সব প্রক্রিয়া শেষে ৪ জানুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হওয়ার কথা। কিন্তু আগে বাদ পড়া ভোটারদের আবেদনের নিষ্পত্তির আগেই কলকাতা, হাওড়ায় পুরভোট হয়ে যাওয়ার কথা। এই আবহে এসইসি-কে পাঠানো আবেদনে বিরোধীদের দাবি, ‘কমিশনের বিশেষ অভিযান এবং এসএসআর প্রক্রিয়া শেষের পরে, অর্থাৎ আগামী বছর ৪ জানুয়ারির পরে কলকাতা, হাওড়া-সহ রাজ্যের যে কোনও এলাকার পুরভোট হোক।’ এই প্রেক্ষিতে তারা স্মরণ করিয়েছে কলকাতায় প্রায় এক লক্ষ ২০ হাজার এবং ও হাওড়া পুর-এলাকায় প্রায় ৩৯ হাজার নাগরিকের আবেদন ট্রাইবুনালে এখনও বিচারাধীন রয়েছে। একই সঙ্গে, বিরোধীরা বলেছে, কমিশনের তথ্যেই দেখা যাচ্ছে, ট্রাইবুনালে কলকাতা ও হাওড়ার যে আবেদনগুলির নিষ্পত্তি হয়েছে, তাতে যথাক্রমে ১০০% ও ৯৯% ক্ষেত্রে নাম পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে বিরোধীদের দাবি, ‘আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করে ট্রাইবুনালে আবেদন জানানো সবার নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা করুক রাজ্য নির্বাচন কমিশন।’ বিরোধীদের প্রতিনিধিদলকে কাল, বুধবার আলোচনার জন্য সময় দিয়েছে রাজ্য নির্বাচন কমিশন।
যৌথ আবেদনের প্রেক্ষিতে ভোটাধিকারের প্রশ্নে রাজ্যেও বিরোধী-ঐক্য দানা বাঁধতে শুরু করল কি না, তা নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক শিবিরের একাংশ। সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী বলেছেন, “বিধানসভায় যাঁদের ভোট দিতে দেওয়া হয়নি, সেটার পুনরাবৃত্তি পুরভোটেও হবে? নাম বাতিলের প্রক্রিয়াটাই বেআইনি। দেশবাসী বুঝেছেন, নির্বাচন কমিশন বিজেপির হয়ে বকলমে কাজ করছে। স্বাভাবিক ভাবেই প্রতিবাদ হবে।” তাঁর সংযোজন, বিভিন্ন দল ও সংগঠনের সঙ্গে জেলা স্তরে পুরভোটের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করছে সিপিএম। আর পুরভোটে বিরোধী-জোট প্রসঙ্গে প্রদেশ সভাপতি শুভঙ্করের জবাব, ‘‘সময় বলবে!’’
শুভঙ্করের সংযোজন, “কলকাতা পুর-এলাকায় প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার মানুষের নাম ভোটার তালিকায় নেই। তাঁদের তালিকায় ফেরত আনার পরেই যাতে পুরভোট হয়, সেই দাবি তুলছি।” তবে মমতা-তৃণমূলের বিধায়ক কুণাল ঘোষ স্পষ্টতই বলেছেন, “প্রতিটি দলের আলাদা সত্তা আছে। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে মানুষের অধিকার রক্ষায় এই পদক্ষেপ গণতন্ত্রের অঙ্গ। দিল্লিতে ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চ আছে। তার বঙ্গীয় সংস্করণ থাকলে সমস্যা কোথায়?”