দোকানে বড় অঙ্কের কেনাকাটার সময় অনেক ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারী একটি পরিচিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। বিক্রেতা তাঁদের কাছে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের জন্য মোট বিলের ওপর অতিরিক্ত ২% অর্থ দাবি করেন। কিন্তু গ্রাহকদের কি সত্যিই এই বাড়তি অর্থ দিতে হয়?
উত্তরটি যতটা সহজ মনে হতে পারে, আসলে ততটা নয়। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক ‘রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া’ (আরবিআই) জানিয়েছে, ক্রেডিট কার্ডের লেনদেনের উপর কোনও নির্দিষ্ট চার্জ বা ফি আরোপের বিষয়ে তারা কোনও সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা জারি করেনি। এ ছাড়াও, কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন বা অর্থ আদান-প্রদানের বিষয়টি বিক্রেতা, ব্যাঙ্ক, লেনদেন পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা এবং কার্ড নেটওয়ার্কগুলোর মধ্যেকার চুক্তির মাধ্যমেই পরিচালিত হয়।
কিন্তু ক্রেডিট কার্ডে লেনদেনের সময় বিভিন্ন দোকান কেন অতিরিক্ত ২% অর্থ দাবি করে? এক জন গ্রাহক যখন ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে কোনও কিছুর টাকা মেটান, তখন সেই অর্থ গ্রহণের জন্য বিক্রেতাকে সাধারণত একটি ফি দিতে হয়। এই খরচটিই মূলত ‘মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট’ বা এমডিআর নামে পরিচিত।
লেনদেনের পুরো অর্থ সরাসরি বিক্রেতা (মার্চেন্ট) থেকে গ্রাহকের ব্যাঙ্কে স্থানান্তরিত হয় না। কার্ডের মাধ্যমে টাকা মেটানোর প্রক্রিয়ার সঙ্গে কার্ড ইস্যু করা ব্যাঙ্ক, অ্যাকোয়ারিং ব্যাঙ্ক বা লেনদেনে সাহায্যকারী সংস্থা এবং কার্ড নেটওয়ার্কের মতো একাধিক অন্য পক্ষ জড়িত থাকে। ফলে কিছু অর্থ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। অর্থাৎ, পুরো ‘পেমেন্ট ইকোসিস্টেম’-এর কাছেই পৌঁছোয় টাকা। অন্য দিকে, বিক্রেতারা গ্রাহকের বিলের সঙ্গে নির্দিষ্ট শতাংশ অর্থ যোগ করে সেই খরচ পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তাই কোনও দোকান যখন ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে টাকা মেটানোর জন্য অতিরিক্ত ২ শতাংশ অর্থ দাবি করেন, তখন তারা মূলত কার্ড গ্রহণের খরচ আংশিক বা সম্পূর্ণ গ্রাহকের উপর চাপানোর চেষ্টা করে।
যদিও আরবিআই স্পষ্ট ভাবে জানিয়েছে যে, ক্রেডিট কার্ড লেনদেনের ওপর কোনও ধরনের চার্জ বা ফি আরোপের বিষয়ে তারা কোনও নির্দেশিকা জারি করেনি। তবে, বিক্রেতা এবং তাঁদের ব্যাঙ্ক, পেমেন্ট প্রদানকারী বা কার্ড নেটওয়ার্কের মধ্যকার চুক্তিতে এমন নিয়ম থাকতে পারে যা নির্ধারণ করে যে এই খরচ গ্রাহকের ওপর চাপানো যাবে কি না। কোনও দোকান যদি অতিরিক্ত অর্থ দাবি করে, তবে গ্রাহকেরা সেই চার্জ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন এবং প্রয়োজনে কার্ড ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করতে পারেন।
গ্রাহকদের এমনটা মনে করা উচিত নয় যে ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়মগুলি ডেবিট কার্ডের ক্ষেত্রেও একই ভাবে কার্যকর হবে। আরবিআই ডেবিট কার্ড লেনদেনের ক্ষেত্রে এমডিআর সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা জারি করেছে। এই কাঠামোর আওতায়, ব্যাঙ্ক এবং লেনদেন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত পক্ষগুলিকে নিশ্চিত করতে হবে যেন বিক্রেতারা ডেবিট কার্ডের এমডিআর গ্রাহকের উপর না চাপান। তাই, ডেবিট কার্ড এবং ক্রেডিট কার্ড একই পেমেন্ট টার্মিনালের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত হলেও, এই দুই ধরনের কার্ডের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অবস্থান ভিন্ন।
অনলাইনে টিকিট বুকিং বা নির্দিষ্ট কোনও পরিষেবার টাকা মেটানোর সময় গ্রাহকেরা অনেক সময় ‘কনভিনিয়েন্স ফি’ বা ‘সার্ভিস ফি’র মতো বিষয়ও দেখতে পান। এটিকে বিক্রেতার যোগ করা আলাদা কোনও ‘ক্রেডিট কার্ড চার্জ’-এর সঙ্গে একই ভাবে বিবেচনা করা উচিত নয়। আরবিআই-এর নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কনভিনিয়েন্স ফি সম্পর্কে লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার আগেই স্বচ্ছ ভাবে গ্রাহককে জানাতে হবে। নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী, পণ্য বা পরিষেবার মূল্যের বাইরে অন্য কোনও অতিরিক্ত টাকা কাটার বিষয় থাকলেও তা গ্রাহককে টাকা মেটানোর আগেই স্পষ্ট ভাবে জানাতে হবে। তাই পিন দেওয়ার আগে, কার্ড ট্যাপ করার আগে বা কোনও অনলাইন লেনদেনে অনুমোদন করার আগে গ্রাহকদের উচিত চূড়ান্ত টাকার অঙ্কটি ভাল ভাবে যাচাই করে নেওয়া।
কোনও দোকান যদি সারচার্জ বা অতিরিক্ত ফি যোগ করে, তা হলে গ্রাহকদের কী করা উচিত? লেনদেনের আগে বিক্রেতাকে জিজ্ঞাসা করা উচিত যে, ওই অতিরিক্ত অর্থ কিসের জন্য নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়াও, চূড়ান্ত বিলে টাকার পরিমাণ যাচাই করে নেওয়া উচিত যাতে লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার পর সারচার্জটি কোনও অপ্রত্যাশিত খরচ হিসেবে গ্রাহকের ঘা়ড়ে না চাপে।
আরও পড়ুন:
যদি কোনও গ্রাহকের মনে হয় যে তাঁর কাছ থেকে কোনও অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে, তবে ওই গ্রাহকের উচিত প্রথমে বিক্রেতা এবং পরে কার্ড প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করা। আরবিআই-এর নিয়ম বলছে, গ্রাহক যদি কার্ড প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের জবাবে অসন্তুষ্ট হন অথবা এক মাসের মধ্যে কোনও উত্তর না পান, তবে তিনি ‘আরবিআই ইন্টিগ্রেটেড ওম্বুডসম্যান স্কিম’-এর দ্বারস্থ হতে পারেন।