বিশ্বজিৎ রায়ের লেখা ‘বাংলা ভাষার মুখ’ (১২-৭) শীর্ষক আলোচনার শেষে বাংলা ভাষাকে পরিশুদ্ধিকরণ নামের কোনও একটি ছাঁচে ঢালার বিরোধিতাকে সর্বান্তঃকরণে সমর্থন করি। বাংলা ভাষা ও বাঙালির সাংস্কৃতিক অস্তিত্বকে ইতিহাসের নানা পর্যায়ে পশ্চিমে আর্য-ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতের প্রভাব এবং পূর্বে ইসলামি সংস্কৃতির ভাষাগত প্রভাবের সঙ্গে সহাবস্থান ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগোতে হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ ভারতেও এই বহুমাত্রিক সহাবস্থান আজও বিদ্যমান। এখনও হিন্দু বাঙালিদের অন্নপ্রাশন, বিবাহ, শ্রাদ্ধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সংস্কৃতের ব্যবহার প্রচলিত। অন্য দিকে, মুসলিম সমাজে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে আরবি এবং কোথাও কোথাও উর্দুর ব্যবহার দেখা যায়। এই বাস্তবকে উপেক্ষা করে সবাইকে এক ছাঁচে ফেলার চেষ্টা করলে বাংলা ভাষার স্বাভাবিক সহাবস্থান ও বহুত্ববাদ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে বাঙালির নিজেরও গুরুত্বপূর্ণ ভাষাগত সমস্যা রয়েছে।
দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ফলে পশ্চিমবঙ্গে ভাষাগত বিভাজনের প্রবণতা অন্তত তিনটি অঞ্চলে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রথমত, পশ্চিম বর্ধমান-বিহার সীমান্তবর্তী রাঢ়াঞ্চল, যেখানে হিন্দি ভাষার প্রভাব প্রবল; শিল্পাঞ্চল ও খনিশিল্প এই অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য। দ্বিতীয়ত, উত্তরবঙ্গের পার্বত্য ও সংলগ্ন অঞ্চল, যেখানে নেপালি, হিন্দি, রাজবংশী, কোচ প্রভৃতি ভাষার প্রভাব রয়েছে; চা-শিল্প ও পর্যটন এখানকার অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। তৃতীয়ত, কলকাতাকেন্দ্রিক গঙ্গা-সমতল ও উপকূলবর্তী অঞ্চল, যেখানে কৃষি, ক্ষুদ্রশিল্প, উচ্চশিক্ষা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে ‘মান্যতাপ্রাপ্ত বাংলা ভাষা’র বিকাশ ঘটেছে। সমুদ্র থেকে পাহাড় পর্যন্ত এই ভৌগোলিক বৈচিত্র বাংলা ভাষার ব্যবহারেও বৈচিত্র সৃষ্টি করেছে।
গৌড়বঙ্গ আজ ইতিহাস। পশ্চিম দিকে পশ্চিম বর্ধমান, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম এবং উত্তর দিকে মালদহ, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, দার্জিলিং ও কালিম্পঙের দিকে এগোলে কলকাতাকেন্দ্রিক মান্য বাংলা বহু ক্ষেত্রে আর একমাত্র প্রধান মাতৃভাষা থাকে না। রাজবংশী ও কামতাপুরি ভাষার পৃথক ভাষাগত স্বীকৃতির দাবিও জোরালো হয়েছে।
বর্তমানে কলকাতা, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলি, পূর্ব বর্ধমান, বীরভূম, নদিয়া, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর— এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মান্য বাংলা তুলনামূলক ভাবে পোক্ত অবস্থানে রয়েছে। যদিও এই এলাকাগুলিতেও বাংলা ভাষার নিজস্ব নানা সঙ্কট রয়েছে। মান্য বাংলা মূলত গ্রন্থ, সংবাদপত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবহারের মাধ্যমে টিকে আছে। কিন্তু রাজ্যের অন্য অংশে স্থানীয় ভাষা ও উপভাষার বাস্তবতা অনেক বেশি প্রকট।
কলকাতাকেন্দ্রিক মান্য ভাষা যখন সমগ্র রাজ্যের ভাষিক পরিচয়ের একমাত্র মানদণ্ড হয়ে ওঠে, তখন প্রান্তিক অঞ্চলের ভাষাভাষীদের নিজস্ব ভাষিক পরিচয় ও অভিব্যক্তি আড়ালে থেকে যায়। এক অর্থে, এটিও বাংলা ভাষাকে ‘পরিশুদ্ধি’র নামে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে ঢালার ঘরোয়া প্রবণতা। প্রশ্ন হল, এই বহুভাষিক বাস্তবতার মধ্যেই বাংলা ভাষার ঐক্য ও বৈচিত্র— দু’টিকেই কী ভাবে সমান মর্যাদা দেওয়া সম্ভব?
শুভ্রাংশুকুমার রায়, চন্দননগর, হুগলি
প্রশাসক বঙ্কিম
রিমি মুৎসুদ্দির ‘সত্য ও ন্যায়ের পথে ঋজু’ (৪-৬) শীর্ষক আলোচনায় প্রশাসক বঙ্কিমচন্দ্রের কর্মজীবন সম্পর্কে কয়েকটি তথ্যগত অসঙ্গতি চোখে পড়েছে।
প্রথমত, বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সরকারি কর্মজীবনে কখনও ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট বা ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর পদে দায়িত্ব পালন করেননি। বঙ্কিমচন্দ্রের কর্মজীবন সম্পর্কে যে প্রামাণ্য নথিগুলি এখনও পাওয়া যায়, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমকালীন ক্যালকাটা গেজ়েট-এ প্রকাশিত নিয়োগ, বদলি ও ছুটির সরকারি আদেশ; অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেলের দফতর থেকে সঙ্কলিত হিস্ট্রি অব সার্ভিসেস অব অফিসার্স হোল্ডিং গেজ়েটেড অ্যাপয়েন্টমেন্টস আন্ডার দ্য গভর্নমেন্ট অব বেঙ্গল; বেঙ্গল সেক্রেটারিয়েট প্রেস থেকে প্রকাশিত হিস্ট্রি অব সার্ভিসেস অব গেজেটেড অফিসার্স; এবং স্টেট আর্কাইভস-এর মিসেলেনিয়াস রেকর্ডস সিরিজ়-এর অন্তর্গত ক্যারেক্টার বুকস অব দি অফিসার্স অব দ্য সাবঅর্ডিনেট এগজ়িকিউটিভ সার্ভিসেস।
এ ছাড়া বঙ্কিমচন্দ্রের ভ্রাতুষ্পুত্র শচীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর গ্রন্থে বঙ্কিমচন্দ্রের কর্মজীবন সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য দিয়েছেন। বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে বঙ্কিমচন্দ্রের অবস্থানকাল ও সাল-তারিখ-সহ কালানুক্রমিক তালিকা প্রথম প্রস্তুত করেন মন্মথনাথ ঘোষ। সচিত্র শিশির পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর ‘বঙ্কিমচন্দ্রের রাজকার্যের ইতিহাস’ শীর্ষক আলোচনায় সেই তথ্য সঙ্কলিত হয়েছে। হেমেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তের গ্রন্থেও বঙ্কিমচন্দ্রের কর্মজীবনের নানা ঘটনা আলোচিত। গোপালচন্দ্র রায়ের রচিত জীবনীগ্রন্থেও তাঁর সরকারি কর্মজীবনের বিবরণ রয়েছে। পাশাপাশি, বঙ্কিমচন্দ্রের জীবদ্দশায় তাঁর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের স্মৃতিচারণও পরবর্তী কালে সঙ্কলিত।
১৮৫৮-র ৬ অগস্ট বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নরের আদেশে বঙ্কিমচন্দ্র যশোর জেলায় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। প্রায় এক বছর পরে, ১৮৫৯-এর ১৯ মে তাঁকে ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা প্রদান করা হয়। যশোরই ছিল তাঁর শিক্ষানবিশির কর্মক্ষেত্র। সেখানে প্রায় দু’বছর জেলা শাসকের অধীনে কাজ করে তিনি প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
১৮৬০ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে যশোর থেকে নাগোয়ার মহকুমা শাসক হিসাবে বদলি করা হয়। নাগোয়া ছিল তৎকালীন মেদিনীপুর জেলার কাঁথি-সংলগ্ন মহকুমা সদর। পরবর্তী কালে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে মহকুমা সদর কাঁথিতে স্থানান্তরিত হয়। নাগোয়ায় থাকাকালীন ১৮৬০ সালের নভেম্বর মাসে বঙ্কিমচন্দ্র পঞ্চম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট পদে উন্নীত হন। এই মহকুমায় তিনি মাত্র দশ মাস কর্মরত থাকলেও বিচারক হিসাবে অর্জিত অভিজ্ঞতা পরবর্তী কালে তাঁর সাহিত্যসৃষ্টির মূল্যবান উপাদানে পরিণত হয়। ১৮৬০-এর নভেম্বরের শেষ দিকে তাঁকে খুলনার মহকুমা শাসক হিসাবে বদলি করা হয়।
দ্বিতীয়ত, বিচারক বঙ্কিমচন্দ্রের প্রদত্ত রায়ের নথিপত্র আজও সম্পূর্ণ লুপ্ত হয়নি। কিছু পরিশ্রমসাপেক্ষ হলেও তাঁর কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জেলার রেকর্ড রুমে সেই নথির সন্ধান পাওয়া যায়। বারুইপুর মহকুমা আদালত এ ধরনের নথি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া, নৈহাটিতে অবস্থিত পশ্চিমবঙ্গ সরকার-পোষিত বঙ্কিম-ভবন গবেষণাকেন্দ্রে বঙ্কিমচন্দ্রের বিচারকার্যের সঙ্গে সম্পর্কিত রায়দানের খসড়া নোটবই এখনও সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে।
উৎপল চক্রবর্তী, চন্দননগর, হুগলি
ইলিশ সংরক্ষণ
‘ইলিশে বাঙালি’ (৮-৭) শিরোনামে পলাশ মান্নার চিঠি প্রসঙ্গে কিছু জরুরি কথা।
আজকাল বাজারে গেলে বরফের গুঁড়োর মধ্যে জলে ভেজা ঝকঝকে রুপোলি ইলিশের সম্ভার দেখেই যেন অর্ধেক ভোজন হয়ে যায়। কিন্তু দাম শুনে পকেটে হাত পড়তেই বোঝা যায়, ইলিশের নাগাল পাওয়া আর সহজ নয়।
কিন্তু প্রশ্ন হল, ইলিশ এ ভাবে কেন দুষ্প্রাপ্য, দুর্মূল্য হচ্ছে? অন্যতম প্রধান কারণ জলদূষণ। প্লাস্টিক, গৃহস্থালির বর্জ্য এবং অন্যান্য দূষিত পদার্থ যে ভাবে ইলিশের আবাসস্থলে প্রবেশ করছে, তাতে তাদের বাস্তুতন্ত্র মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত। তার উপর খোকা-খুকু বা অপ্রাপ্তবয়স্ক ইলিশ নির্বিচারে ধরা পড়ায় তারা পূর্ণবয়স্ক হয়ে প্রজননের সুযোগই পাচ্ছে না। ফলে বছর বছর ইলিশ আরও দুর্লভ ও দুর্মূল্য হয়ে উঠছে।
আমার আবেদন, বাঙালির এই প্রিয় মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে আরও কার্যকর উদ্যোগ করা হোক। ইলিশের বাস্তুতন্ত্র রক্ষা, পণ্যকরণের সময় সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা, অপ্রাপ্তবয়স্ক ইলিশ ধরা কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং ইলিশের অকাল ধ্বংস রোধে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
বিবেকানন্দ চৌধুরী, কাটোয়া, পূর্ব বর্ধমান