E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সম্পাদক সমীপেষু: ভাঙনের খেলা

মালদহ মুর্শিদাবাদে ভাঙন প্রতি বছরের চেনা ছবি। এ নিয়ে প্রশাসনের তেমন কোনও হেলদোল আগে দেখা যায়নি। ছিল শুধু মনভোলানো প্রতিশ্রুতি। ঘাটাল নিয়ে সেই কোন ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি ‘ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যান’।

শেষ আপডেট: ০৪ নভেম্বর ২০২৬ ০৭:২০

অনিতা অগ্নিহোত্রীর ‘ভাঙনের নির্বাক ছবি’ (৬-১০) শীর্ষক প্রবন্ধ প্রসঙ্গে এই চিঠি। মনে পড়ে গেল সুমন কল্যাণপুরের একটি গানের দু’-এক কলি— “দুরাশার বালুচরে একা একা আজও গান গাই,/ সাগরের ঢেউ আসে আমি তবু ঘর বেঁধে যাই।” ভাঙনের তীরে মানুষ কেন যে ঘর বাঁধে, শুধুমাত্র সে ছাড়া আর কেউ জানে না। নদীর এ-কূল ভাঙে আর ও-কূল গড়ে— এই তো নদীর খেলা। ভাঙনের মুখে বসতি থেকে শুরু করে বিপণি, স্কুলবাড়ি সবই তলিয়ে যায়। মানুষ হারায় ঘর, রুটিরুজি, শিক্ষাঙ্গন। সাময়িক আশ্রয় খোঁজে কোনও স্কুলবাড়িতে, খাদ্য হিসেবে জোটে চিঁড়ে, গুড় আর খিচুড়ি। বন্যার জল নেমে যায়, বন্যার্ত কিছু ত্রাণ পান। কিন্তু পুনর্বাসন খাতায়-কলমেই থেকে যায়, অনেকেই তার নাগাল পান না। লালগোলার পথের ধারে বা রেললাইনের পাশে গজিয়ে ওঠা ঝুপড়িগুলি এই ধরনের ভাঙনের কারণে উৎখাত হওয়া মানুষদের। হকারি করে, দিনমজুর হয়ে খেটে, আর মহিলাদের পরিচারিকার কাজ করেই জীবন কাটে। নিঃসীম অন্ধকারের মতো জীবনে নেমে আসে চরম দারিদ্র। গঙ্গার জলস্ফীতির কারণে এ বছর মালদহের ভুতনি চরের প্রায় সবটাই ডুবে গিয়েছে। অসহায় মানুষের ডোঙায় করে এসে ত্রাণসামগ্রী গ্রহণ করার দৃশ্য চোখে জল আনে।

মালদহ মুর্শিদাবাদে ভাঙন প্রতি বছরের চেনা ছবি। এ নিয়ে প্রশাসনের তেমন কোনও হেলদোল আগে দেখা যায়নি। ছিল শুধু মনভোলানো প্রতিশ্রুতি। ঘাটাল নিয়ে সেই কোন ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি ‘ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যান’। সেটা যে কী বস্তু, আজও বুঝে উঠতে পারলাম না, বন্যাচিত্রের কোনও পরিবর্তন চোখে পড়ল না। এত কাল সবই প্রতিশ্রুতির বস্তায় বন্দি থেকেছে। প্রবন্ধকারের সঙ্গে একমত, খনি ও বাঁধের জন্য যাঁরা বাস্তুহারা হন, তাঁরা যদি পুনর্বাসন পেতে পারেন, তবে যাঁদের বসত নদীর গহ্বরে তলিয়ে গিয়েছে, তাঁরা কেন পুনর্বাসনের জন্য মনোনীত হবেন না? বালির বস্তা ফেলে কাঁচা মাটির যে লোকদেখানো বাঁধের ব্যবস্থা করা হয়, তার স্থায়িত্ব কতটুকু? বাঁধ দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন নদীর পলি তুলে নাব্যতা বাড়ানো। তা হয় কি? প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য প্রশাসনের সক্রিয় উপস্থিতি জরুরি।

দিলীপকুমার সেনগুপ্ত, বিরাটি, উত্তর ২৪ পরগনা

ভিটেমাটি হারা

অনিতা অগ্নিহোত্রীর ‘ভাঙনের নির্বাক ছবি’ প্রবন্ধটি সময়োচিত। মালদহ এবং মুর্শিদাবাদের গঙ্গার ভাঙন এখন প্রায় বাৎসরিক ঘটনা। তাই বাংলার জনমানসে তার গুরুত্ব যে নেই, সেটি প্রবন্ধে প্রকাশিত হয়েছে। মালদহের গঙ্গার ভাঙন-রোগ দীর্ঘ দিনের। ২০১৬ সালের পর মালদহের ১২টি মৌজা মানচিত্র থেকে বেবাক হারিয়ে গিয়েছে নদীগর্ভে। ভুতনি চরে প্রতিনিয়ত নদী এগিয়ে আসছে। জনপদ যাচ্ছে পিছিয়ে। ফুলহার ও গঙ্গা নদীর দাপটে বহু গ্রাম স্রেফ ‘নেই’ হয়ে গিয়েছে। তবে কেবলমাত্র গঙ্গা বা পদ্মার ভাঙনই নয়। অন্য জেলাতেও এই একই চিত্র ধরা পড়ে। নদীমাতৃক বাংলায় ছোট নদীগুলি ভরা বর্ষায় ফুঁসে উঠে নদী-তীরবর্তী এলাকার মানুষজনকে ভিটেমাটি হারা করে তোলে। যেমন ঝাড়গ্রাম জেলার সুবর্ণরেখা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে গোপীবল্লভপুর ১ এবং ২ নম্বর ব্লকে ইছাপুর, কমলপুর, করবনিয়া ও মালিঞ্চা গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং কংসাবতীর ভাঙনে বিনপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে চলে গিয়েছে। বেশ কিছু বাড়ি এখন নদীর ধারে এসে পৌঁছেছে। এখনও আতঙ্কে কয়েকশো পরিবার। আবার রূপনারায়ণ নদীর অনবরত ভাঙনে মহিষাদলের বিস্তীর্ণ এলাকা বর্তমানে বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

জোয়ারের জল বাড়লেই ফুঁসে উঠে নদী। আতঙ্কে থাকেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা। একই দিনের এই কাগজে চোখে পড়ে ‘ভাঙনে পাড়া হারায়, তবুও আশ্বিনের অপেক্ষায় থাকেন ওঁরা’। প্রতিবেদক এখানে ঘোড়ামারা দ্বীপের দুর্গোৎসবে আনন্দের সংবাদ তুলে ধরতে চেয়ে মুড়িগঙ্গা নদীর ভাঙনের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রবীণ গ্রামবাসীর কথায় উঠে আসে— “অনেক পাড়া ছিল, অনেক মানুষ ছিলেন। নদী একে একে সব কেড়ে নিয়েছে। এখন যে জায়গায় জল, সেখানে এক সময়ে ঘর ছিল।” ভাঙনপ্রবণ নদীপাড়ের বাসিন্দাদের রাতের ঘুম চলে যায়, কারণ তাঁরা জানেন পুনর্বাসন দূর অস্ত্। জলবায়ু পরিবর্তন ফলে অসময়ে ভারী বৃষ্টিপাত আর দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণে নদী যেমন ভাঙছে, তেমনই বহু নদী শুকিয়েও যাচ্ছে। রূপসি বাংলাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে চাই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

সুব্রত পাল, কলকাতা-৩৮

সদিচ্ছা চাই

অনিতা অগ্নিহোত্রীর ‘ভাঙনের নির্বাক ছবি’ মর্মস্পর্শী প্রবন্ধ। যে ভাবে প্রতি বছর এই রাজ্যে মালদহ, মুর্শিদাবাদ জেলায়‌ গঙ্গা ভাঙনের কবলে পড়ে শত শত পরিবার গৃহহীন হয়, তা খুবই উদ্বেগজনক। নদী ভাঙনের ফলে প্রতি বছর শুধু মানুষ‌ গৃহহীন‌ হয় না, দেশের ব্যাপক ভূমিক্ষয়ও হয় একই সঙ্গে। চাষ ও বসবাসের জমি হ্রাস পায়। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, নদী ভাঙনের মতো বিধ্বংসী, ক্ষতিকারক বিষয় নিয়ে দেশের কোনও সরকারকেই সে ভাবে উদ্বিগ্ন হতে দেখা যায়নি। আবার, দেশের নানা বিষয়ে বিরোধীরা সরব হলেও নদী ভাঙনের ব্যাপারে তাঁরাও একেবারেই নীরব। এই নিয়ে প্রধান বিরোধী দলগুলিকে কখনও রাজপথে মিছিল, সমাবেশ করতে দেখা গিয়েছে কি? নদীর ধারের বাসিন্দাদের দুঃসময়ে তাঁদের পাশে কেউ থাকে না। তাঁদের যন্ত্রণা নির্বাক হয়ে দেখে শুধু সর্বগ্রাসী নদী।

ভাঙন রোধে দরকার‌ সরকারের দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণ। শীত ও গ্রীষ্মের মরসুমে নদীর পলি তুলে নাব্যতা বৃদ্ধি করতে হবে। নদীর কূলে অবৈধ নির্মাণ ও দখলদারি সরাতে হবে। মাটি ধরে রাখতে পারে এমন গাছ পোঁতা দরকার নদী কূলে। সদিচ্ছা না থাকলে কেবল বালি, সিমেন্টের বস্তা ফেলে নদী ভাঙন রোধ করা সম্ভব নয়। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ‌ সরকারি সাহায্য পেলে নদী ভাঙনের ফলে উদ্বাস্তুরা কেন পাবেন না?

অতীশচন্দ্র ভাওয়াল, কোন্নগর, হুগলি

বন্ধ পথ

এই বছর ষষ্ঠীর দিন আমরা পুরুলিয়ার উদ্দেশে রওনা হই হাওড়া থেকে ‘বন্দে ভারত’-এ। ট্রেনটি পুরুলিয়া পৌঁছয় সন্ধে সাড়ে সাতটার পরে। স্টেশন থেকে বাইরে বেরিয়ে দেখি কিছু নেই! কী ভাবে হোটেল পৌঁছব খোঁজ করতে গিয়ে জানতে পারলাম ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত পুলিশ টোটো, গাড়ি সব বন্ধ করে দিয়েছে বিকেল তিনটে থেকে ভোর তিনটে পর্যন্ত! বিকল্প ব্যবস্থা কিছু নেই! পুলিশদের কাছ থেকেও কোনও সাহায্য পেলাম না। ভাগ্যিস স্টেশনে আমাদের পরিচিত এক জন দেখা করতে এসেছিলেন। তিনি কোনও রকমে তাঁর চেনা একটি টোটো জোগাড় করলেন। কিন্তু তাতে চড়ে যে দিক দিয়েই যেতে যাই, পুলিশ এসে পথ আটকে দেয়, যেতে দেবে না, টোটোচালককে রীতিমতো ধমক দিতে থাকে। আমরা হোটেল বুকিং-এর প্রমাণ দেখিয়ে, লাগেজ দেখিয়ে, কথা কাটাকাটি করে এক-একটি মোড় পার হতে থাকি। হোটেলের কাছেই যে মোড়টি, তখনও বেশ কিছুটা পথ বাকি, পুলিশ এসে বলে, হেঁটে যান! বহু রাগারাগির পরে অবশেষে ছাড়া পেলাম! আট-দশ মিনিটের পথে সময় লেগেছিল চল্লিশ মিনিট! টোটোচালক বলেছিলেন, তিনি আর ফিরতে পারবেন না, ভোর তিনটে পর্যন্ত হোটেলের সামনেই থাকতে হবে!

পরে শুনলাম শহরবাসীদেরও এই তুঘলকি নিয়মের জেরে হয়রান হতে হয়েছে। আমরা যারা অত সুন্দর জায়গায় ঘুরতে গিয়েছি, তারাও চূড়ান্ত বিপাকে। হঠাৎ এই নিয়ম জারি করার কারণ কী, যেখানে কোনও বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়নি। প্রতি পুজোয় নানা জায়গায় আমরা ঘুরতে গিয়েছি। কিন্তু পুরুলিয়ার মতো এত হয়রানি, অব্যবস্থা কোথাও দেখিনি।

সুপর্ণা ঘোষ, কলকাতা-৩২

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
River Erosion human life Society Destruction

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy