সম্প্রতি বীরভূম জেলার ইলামবাজার সংলগ্ন জনবসতি পূর্ণ এলাকায় হঠাৎ একটি পূর্ণবয়স্ক হায়নার চলাফেরা লক্ষ করেন বাসিন্দারা। যে-হেতু স্থানীয়রা প্রাণীটিকে আগে কখনও দেখেননি, ফলে স্বাভাবিক ভাবেই তাঁদের মধ্যে কৌতূহল ও আতঙ্ক, দুই-ই ছড়ায়। গ্রাম পাহারা বসে হায়নাটিকে মারার জন্য। পরবর্তী কালে বনবিভাগে খবর দেওয়া হয়। গ্রামবাসীদের সাহায্যে ধরা হয় হায়নাটিকে। তবে, কিছু সময়ের মধ্যেই সেটির মৃত্যু হয়।
ডোরাকাটা হায়না প্রায় বিলুপ্তির পথে। জঙ্গল কমে যাওয়া, চোরাশিকার, কুসংস্কার থেকে মেরে ফেলা, ট্রেনে কাটা পড়া, পথ-দুর্ঘটনা— এ সবের কারণেই আজ হায়নার সংখ্যা কমেছে। এই প্রাণী আমাদের রাজ্যে সবচেয়ে বেশি আছে পুরুলিয়ার বনাঞ্চলে। অযোধ্যা পাহাড়, ঝালদা, বাঘমুন্ডি এলাকায় এদের দেখা মেলে। বীরভূম, বাঁকুড়া এবং মাইথনের জঙ্গলেও আছে, তবে সংখ্যায় কম। নিশাচর এই প্রাণীটি এমনিতে লাজুক, সাধারণত মানুষকে আক্রমণ করে না। জঙ্গলের মরা প্রাণী খেয়ে জঙ্গল পরিষ্কার রাখে।
ধরার আগে প্রাণীটিকে প্রচুর দৌড় করানো হয়। ধরার পরে যে ভাবে সেটির মুখ চেপে ধরা হয় নেট দিয়ে, তাতে মৃত্যু হওয়ারই কথা। হয়ও তাই। এখন মাঠে ঘন ধানগাছ রয়েছে। মাঠে নেমেও ছিল হায়নাটি। দৌড় না করিয়ে নির্দিষ্ট এলাকায় জাল দিয়ে ঘিরে রেখে প্রাণীটিকে ধরা যেতে পারত, ঠিক যে ভাবে সুন্দরবন এলাকায় বাঘ ধরা হয়। ধরার জন্য ঘুমপাড়ানি ওষুধও ব্যবহার করা যেতে পারত। ওই এলাকায় বনকর্মী কম থাকলে জেলার অন্য এলাকা থেকে কর্মী আনা যেতে পারত। খাঁচায় ছাগল বা অন্য খাবার দিয়ে ফাঁদ পেতে প্রাণীটিকে জীবন্ত উদ্ধার করা যেতে পারত। কিন্তু এ সব কিছুই করা হয়নি। সমস্যা হল, জেলা অনুযায়ী বনকর্মীর সংখ্যা কম। তা ছাড়া, সাধারণ মানুষেরও জীববৈচিত্র এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে সচেতনতা নেই বললেই চলে। শিক্ষিত মানুষের ধারণাও তথৈবচ। পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে কাজকর্ম হয়, এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও কম।
ফলে, এই সব বিষয়ে আরও সচেতনতা দরকার। এর জন্য স্কুল-কলেজ থেকেই দিতে হবে জীববৈচিত্র রক্ষার পাঠ। অন্য দিকে, নির্দিষ্ট করে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিষয়ে লিফলেট ইত্যাদি প্রকাশ ও বিতরণ করতে হবে। রেডিয়ো, দূরদর্শন, সমাজমাধ্যমে নিয়মিত বিষয়টি নিয়ে প্রচার হওয়া চাই। এগুলির সঙ্গে গ্রামপঞ্চায়েত অফিসে ও জনবহুল এলাকায় বনবিভাগের রাজ্য, জেলা এবং রেঞ্জ অফিসের নম্বর, ইমেল আইডি এমন জায়গায় রাখতে হবে, যাতে সকলের নজরে পড়ে। তৃণমূল স্তরে গ্রাম পঞ্চায়েতকে এ বিষয়ে উদ্যোগী হতে হবে এবং বনকর্মীদের উপযুক্ত ভাবে প্রশিক্ষিত হতে হবে প্রাণীগুলি ধরার জন্য। তবেই এই বিপন্ন প্রাণীগুলিকে বাঁচানো যাবে।
মৃণাল বিশ্বাস, মেদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা
কল্পনায় মাতৃরূপ
শিশির রায়ের সম্পাদকীয় প্রবন্ধ ‘হৃদয়মাঝে হৃদয়হরণী’ (২৫-১০) এক ঋদ্ধিময় আলোকপাত। প্রসঙ্গত, বঙ্কিমচন্দ্র, অবনীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতে দেবী দুর্গার আদলে ভারতমাতার যে রূপকল্প, নজরুলের গানে তার শিখরস্পর্শী পরিণতি। জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামীর জলদমন্দ্র স্বরে বাগেশ্রী রাগে ধৃত, একদা জনপ্রিয় ও বীররসাত্মক ‘চিন্ময়ী রূপ ধরে আয় মাগো’ গানে যেমন, ‘আমাদের দ্বিভুজে দশভুজা শক্তি দে পরব্রহ্মময়ী, শক্তিপূজার ফল ভক্তি কি পাব শুধু, হব না কি বিশ্বজয়ী?’ পূজা অসার, যদি সন্তানের শক্তিলাভ না হয়: ‘এই পূজা-বিলাস সংহার করো মা যদি পুত্র শক্তি নাহি পায়’।
এই শক্তি-উদ্দীপনার পিঠোপিঠি জাতিভেদ আর সাম্প্রদায়িকতা, অসাম্য আর অস্পৃশ্যতার ফাঁদে পড়া সমাজের সংস্কারের দিকটিও কবি কাজী নজরুল ইসলাম ভোলেন না। তাই তো তিনি চাইলেন, ‘এবার নবীন-মন্ত্রে হবে জননী তোর উদ্বোধন’। কেমন হবে সেই পূজার বোধন? ‘সকল জাতির পুরুষ-নারীর প্রাণ/ সেই হবে তোর পূজা-বেদী মা তোর পীঠস্থান.../ সেথা রইবে নাকো ছোঁয়াছুয়ি উচ্চ-নীচের ভেদ,/ সবাই মিলে উচ্চারিব মাতৃ-নামের বেদ।/... দীন-দরিদ্র রইবে না কেউ সমান হবে সর্বজন,/ বিশ্ব হবে মহাভারত, নিত্য-প্রেমের বৃন্দাবন।’ নজরুলের গানে অন্যত্র দেখি দুর্গাশক্তির তথা ভারতমাতার পুনর্জাগরণের পরাকাষ্ঠা: ‘দশ ভুজে দশ প্রহরণ ধরি আয় মা দশ দিক আলো করি...’ তবু এ গানের অন্তেও কল্যাণভাবনা, শুশ্রূষা: ‘দশ হাতে আন কল্যাণ ভরি নিশীথ-শেষের উষা গো’। রাত ভোর হয়ে আসছে, ভারতমাতার শৃঙ্খলমোচন দূরে নয়। সেই নবভারতেও চাই সাম্য মৈত্রী ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে জনকল্যাণ।
অন্য দিকে, রবীন্দ্রনাথের পুরাণভাবনায় শিব-নটরাজের প্রাধান্য থাকলেও স্বভাবতই আদি ব্রাহ্মসমাজের একদা-সম্পাদক তথা মহর্ষিপুত্র তাঁর রচনায় দেশমাতৃকাস্বরূপিণী দেবী দুর্গার স্তব প্রকট করেননি। যে-দেশের মাটিতে তিনি মাথা ঠেকান, তাতে বিশ্বময়ী বিশ্বমাতারই আঁচল পাতা। তবু তাঁর দ্বীপময় শাশ্বত ভারত-কল্পনায় দেখি ‘ধূর্জটির মুখের পানে পার্বতীর হাসি’ (‘সাগরিকা’)। কবি যখন মহেন্দ্রের ‘তপোভঙ্গ-দূত’, এমনকি ‘স্বর্গের চক্রান্ত’, তখনও তো দেখি মধুররসের উদ্দীপনে স্তোকনম্রা গৌরী উমাকে: ‘উমার কপোলে লাগে স্মিতহাস্য-বিকশিত লাজ’। অল্পবয়সে আমাদের কবিবর যে কুমারসম্ভব-এর কবিকে বঙ্গভাষায় বিক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন, সেই কুমারসম্ভব-এই পাই, নারদ যখন হিমালয়ের কাছে হরগৌরীর মিলনের ঘটকালি করতে এসেছেন, তখন পার্বতী ‘লীলাকমলপত্রাণি গণয়ামাস পার্বতী’। করধৃত লীলাকমলের পাপড়ি গুনতে থাকা, পূর্বরাগের সলজ্জ ব্যঞ্জনায় অভিব্যক্ত গৌরীর এই রাঙা রূপ রবীন্দ্রনাথের মনে চিরকাল। তাই তাঁর এই কবিতায় ‘মাধবীবল্লরীমূলে অস্থিমালা’ খুলে যায়, শিবের কপালে তখন বরবেশের ফুলরেণু আর ‘কৌতুকে হাসেন উমা কটাক্ষে লক্ষিয়া কবি-পানে’। তা থেকেই ওঠে সুন্দরের জয়ধ্বনি কবির প্রাণে (‘তপোভঙ্গ’, পূরবী)।
এমনকি আমাদের বক্ষ্যমাণ এ লেখায় উল্লিখিত, ‘ডান হাতে তোর খড়্গ জ্বলে, বাঁ হাত করে শঙ্কাহরণ’-এর পরেও কথা চলে, ‘দুই নয়নে স্নেহের হাসি, ললাটনেত্র আগুনবরণ’। বাংলাদেশের হৃদয় থেকে উঠে আসা এই দেবী বা দেশপ্রতিমা বীররসের আধার হলেও রবীন্দ্রনাথ তাঁর করুণরঙিন রূপটিকেও উপেক্ষা করেননি। ‘জননীর দ্বারে’ শঙ্খধ্বনিকে তিনি অবজ্ঞা করেননি, শুভসুন্দর কাজে মাতৃমন্দির-পুণ্য-অঙ্গন মহোজ্জ্বল করতে চেয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, পূর্বসূরি ও শ্রদ্ধাভাজন বঙ্কিমচন্দ্রের সন্তানদলের ধরনে ‘বরপুত্রসঙ্ঘ’ও রচনা করতে চেয়ে গেয়েছেন, ‘শুভ শঙ্খ বাজহ বাজ’ হে’। দুর্গাস্তোত্র লিখে ফেলছেন ভেবে খানিক অপরাধবোধে (?) শেষে ‘জয় তপস্বিরাজ হে’ বলে তাঁর প্রিয় যোগীন্দ্র শিবের জয়ধ্বনিই কি করলেন তিনি! এ গান ১৯১৭ সালে লেখা হলেও শক্তিপূজার প্রতি প্রয়াত পিতার (বা আদর্শগত ভাবে ব্রাহ্মসমাজের) বিরাগ কি কবির এই দোলাচলের মূলাধার?
রজতকান্তি সিংহচৌধুরী, দুর্গাপুর, পশ্চিম বর্ধমান
বেহাল রাস্তা
বেশ কিছু দিন আগে আদ্যাপীঠ মন্দিরে যেতে হয়েছিল। দক্ষিণেশ্বর মেট্রো স্টেশন থেকে আদ্যাপীঠ মন্দির পর্যন্ত রাস্তার অবস্থা দেখে হতাশ হলাম। রাস্তার বিভিন্ন অংশ ভেঙে গিয়ে তৈরি হয়েছে ছোট-বড় গর্ত, অটো বা সাইকেল-রিকশায় যাতায়াত কষ্টকর। আদ্যাপীঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও দর্শনীয় স্থান, প্রতি দিন বহু মানুষ এই পথে যাতায়াত করেন। সেই রাস্তা এই অবস্থায় থাকবে কেন? কালীপুজো, কল্পতরু উৎসবের সময় দক্ষিণেশ্বরে বহু মানুষের আগমন ঘটে, আদ্যাপীঠেও তাঁরা যান। এত গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাটিকে এ ভাবে ফেলে রাখা হবে কেন?
নিত্যযাত্রী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং দর্শনার্থীদের কথা মাথায় রেখে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দফতরের কাছে অনুরোধ, দক্ষিণেশ্বর মেট্রো স্টেশন থেকে আদ্যাপীঠ মন্দির পর্যন্ত রাস্তাটি যেন সারা বছর চলাচলযোগ্য থাকে, সে দিকে নজর দেওয়া হোক।
পার্থপ্রতিম রায়বর্মণ, কলকাতা-২৮