রবীন্দ্রনাথ সরকারের ‘এই জীবন নির্বাক নয়’ (রবিবাসরীয়, ২৭-৯) প্রবন্ধটি পড়তে পড়তে এক ধরনের অসহায়তা গ্রাস করছিল। সেই অসহায়তা শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য নয়, বরং নিজেদের জন্য— আমরা যারা নিজেদের স্বাভাবিক মানুষ বলে দাবি করি, তাদের জন্য। আমরা মেঘের গর্জন শুনতে পাই, ঢাকের বাদ্যি ও বিজয়োৎসবের উল্লাসে মেতে উঠি, গানের সুরে আবেগে ভাসি। অথচ সেই আমরাই কি কখনও শুনতে পাই তাঁদের বুকের কাঁপন, তাঁদের তীব্র প্রতিবাদের নিনাদ?
লেখাটি অনুপ্রেরণামূলক। নিজের প্রতিবন্ধকতাকে তিনি যেমন নিজের অগ্রগতির পথে বাধা হতে দেননি, তেমনই অন্যদেরও এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়েছেন। নিজের ইচ্ছা ও জেদের কাছে হার না মানার বার্তা দিয়েছেন তিনি। উপহাস বা করুণার চোখে নিজেকে না দেখে, নিজের যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা বলেছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষদের জন্যও কাজের নানা পথ খুলে যেতে পারে। প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, সুযোগ এবং নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগানোর পরিবেশ। চাই সমান অধিকার ও মর্যাদা।
সঙ্কেত-ভাষার প্রশিক্ষণ নিয়ে তাঁর বক্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্কেত-ভাষায় পার্থক্য রয়েছে। এই ভাষা শিখলে শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের কাজের সুযোগ যেমন বাড়তে পারে, তেমনই অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগও সহজ হয়। নিজের জীবন ও কাজের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বিষয়টি তুলে ধরেছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর নিজের সঙ্কেত-ভাষার মাধ্যমে খবর পরিবেশনের উদ্যোগটি বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি একটি গঠনমূলক প্রচেষ্টা, যা শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষদের কাছে খবর পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি সমাজের অন্যদেরও তাঁদের অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজন সম্পর্কে সচেতন করতে পারে। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সঙ্গে শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের যোগাযোগ বাড়ানোর এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।
সমাজকে সত্যিই সকলের উপযোগী করে তুলতে হলে শুধু ব্যক্তির অদম্য ইচ্ছাশক্তির উপর নির্ভর করলে চলবে না, আমাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। প্রত্যেকের জীবনেই নানা বাধা আসতে পারে, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রতিবন্ধী মানুষের দৈনন্দিন লড়াইকে এক করে দেখা যায় না। তাঁদের জন্য সমান সুযোগ, মর্যাদা ও যোগাযোগের ব্যবস্থা তৈরি করা সমাজেরই দায়িত্ব।
ইতিকা সাহা, কলকাতা-৫৯
অন্যের কাঁধে
মানুষের স্বভাব কত বিচিত্র হতে পারে, তার ইয়ত্তা নেই। মানুষের স্বভাব ও আচরণের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করাও আচরণগত অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
প্রায়ই দেখি, সন্ধ্যার পর বাড়ির সামনের পাঁচিলের ধারে আবর্জনাভরা ক্যারিব্যাগ পড়ে রয়েছে। চারপেয়ে প্রাণীদের কেউ কেউ সিন্ধু সেচে মুক্তো খোঁজার আশায় সেই ক্যারিব্যাগ ছিঁড়ে আবর্জনা ছড়িয়ে দিয়ে যায় বাড়ির সামনে। পথচারীদের কেউ কেউ তখন বাড়ির গৃহস্থকে উদ্দেশ করে কটূক্তি করতেও ছাড়েন না।
সে দিন সন্ধ্যার পর হেঁটে বাড়ি ফিরছিলাম। দূর থেকে দেখলাম, এক ব্যক্তি সাইকেলে চড়ে আমার বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছেন। বাড়ির কাছে এসে একটু চার পাশে তাকিয়ে জঞ্জালভরা একটি ক্যারিব্যাগ পাঁচিলের ধারে ছুড়ে সাইকেলের গতি বাড়িয়ে নিমেষে চলে গেলেন।
অর্থনীতির পরিভাষায়, এই আচরণকে ‘নেগেটিভ এক্সটারনালিটি’ বা নেতিবাচক বহিঃপ্রভাবের একটি সহজ সামাজিক উদাহরণ বলা যেতে পারে। নিজের বাড়ির জঞ্জাল সরিয়ে ফেলার সুবিধা তিনি পেলেন, কিন্তু সেই জঞ্জাল পরিষ্কার করার খরচ ও ঝামেলা চাপিয়ে দিলেন অন্যের ঘাড়ে। অর্থাৎ, লাভ হল এক জনের, আর ক্ষতির বোঝা বইতে হল অন্য কাউকে।
এখানেই আসে ‘কস্ট শিফটিং’ বা খরচ অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়টি। নিজের কাজের অসুবিধা ও খরচ অন্যের ঘাড়ে ঠেলে দেওয়া হল কস্ট শিফটিং। নিজের বাড়ির সামনে থেকে জঞ্জালটি সরিয়ে ফেলতে পেরে ওই ব্যক্তি তাৎক্ষণিক স্বস্তি পেলেন বটে, কিন্তু সেই স্বস্তির মূল্য দিতে হল অন্য কাউকে। আচরণগত অর্থনীতির আলোচনায় দেখা যায়, মানুষ অনেক সময় তাৎক্ষণিক ব্যক্তিগত লাভকে ভবিষ্যতের বা অন্যের উপর পড়া ক্ষতির তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেন। নিজের ঝামেলা এখনই কমল— এই লাভটি তাঁর কাছে স্পষ্ট; কিন্তু অন্যের অসুবিধা, পরিবেশের ক্ষতি কিংবা পরে জঞ্জাল পরিষ্কারের সামাজিক ব্যয় তাঁর বিবেচনায় আসে না। তবে অন্যের ঘাড়ে খরচ চাপিয়ে দেওয়া মানে সেই খরচ পৃথিবী থেকে উধাও হয়ে যাওয়া নয়। জঞ্জাল কোথাও না কোথাও পড়ে থাকবেই। প্রশ্ন হল, তার বোঝা বইবে কে?
অজয় ভট্টাচার্য, বনগাঁ, উত্তর ২৪ পরগনা
কোন অধিকারে?
অচিন চক্রবর্তীর ‘সর্বজনীন শিক্ষার প্রশ্ন’ (২৫-৯) একটি জরুরি তথ্য সামনে এনেছে। ঔপনিবেশিক আমলে যে জেলাগুলিতে নিম্নবর্গের মানুষের পাশাপাশি উচ্চবর্ণের মানুষের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য ছিল, সেখানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল কম। অর্থাৎ, এই বঞ্চনা শুধু নীতির ত্রুটি ছিল না। সর্বজনীন শিক্ষার প্রশ্নে মুষ্টিমেয় মানুষের সিদ্ধান্তেও অসাম্যের ছাপ ছিল। অসাম্য দূর করতে বিদ্যাসাগর যে চেষ্টা করেছিলেন, তাকে স্বীকৃতি দিয়েই প্রবন্ধটি শেষ হয়েছে।
আজও প্রাথমিক শিক্ষা একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন। কিন্তু এর দু’টি দিক আছে। এক দিকে রয়েছে স্কুল, শিক্ষক ও অর্থের জোগান। অন্য দিকে রয়েছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: শিক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কার? জেলা বোর্ড যখন প্রাথমিক বিদ্যালয় তৈরিতে আগ্রহ দেখায়নি, তখন সমস্যা শুধু টাকার অভাব ছিল না। অচিনবাবু যে সর্বজনীনতার কথা বলেছেন, তার অর্থ সকলের জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ। অথচ যাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছিল, তাঁদেরই মতামত দেওয়ার সুযোগ ছিল না। এ ভাবেই শিক্ষার সর্বজনীনতার ধারণাকে দূরে সরিয়ে রেখে বৈষম্য বজায় রাখা হয়েছিল। আজও মিড-ডে মিল বা ‘নো ডিটেনশন’ নীতির বিরোধিতা করেন এমন অনেকে, যাঁদের নিজেদের সন্তানের জীবনে এই ব্যবস্থাগুলির বিশেষ প্রভাব নেই। প্রাথমিক স্কুল নিয়ে ককরোচ জনতা পার্টির সাম্প্রতিক কার্যকলাপ এবং ‘স্কুল ঠিক করো’ অভিযানও এই প্রশ্নে আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
শিক্ষার ব্যবস্থা যদি সবার আলোচনার মাধ্যমে ঠিক না হয়ে ‘আমরা’র দান হয়ে থাকে, তা হলে তাকে প্রকৃত অধিকার বলা যায় না। ‘আমরা-ওরা’র বিভাজন ঘুচিয়ে সবাইকে সমান গুরুত্ব দিতে না পারলে আরও অনেক নীতিপত্র তৈরি হবে, কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার থমকে থাকবে। তাই প্রশ্নটা শুধু ‘ওদের কতটা শিক্ষা দেব’ নয়। আসল প্রশ্ন হল, ‘ওদের হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আমাদের কে দিল? কোন অধিকারে?’
গুঞ্জন দাশগুপ্ত, কলকাতা-৯৪
ভাবা প্রয়োজন
‘অন্ধ প্রদীপ’ (২৬-৯) শীর্ষক সম্পাদকীয় প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে এই চিঠি। মাসের পর মাস স্কুলে যদি নানা ‘দিবস’ পালনের অনুষ্ঠান চলতে থাকে, তা হলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করবে কখন? বাংলা মাধ্যমের বহু সরকারি স্কুলে শিক্ষক-ঘাটতির কারণে নিয়মিত ক্লাস করানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। তার উপর যদি ঘন ঘন বিভিন্ন দিবস পালনের কর্মসূচি চালাতে হয়, তবে পঠনপাঠন আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা।
প্রধানমন্ত্রীকে সম্মান জানানোর নানা উপায় আছে। কিন্তু তাঁর জন্মদিন পালনের সঙ্গে স্কুলের পঠনপাঠনের সম্পর্ক কী, তা স্পষ্ট নয়। দিবস পালনের কর্মসূচি নির্ধারণের সময় পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে কি না, আগে বিবেচনা করা জরুরি।
রতন চক্রবর্তী, উত্তর হাবড়া, উত্তর ২৪ পরগনা