E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সম্পাদক সমীপেষু: জাতীয়তার পিতামহ

রাজনারায়ণ ছিলেন বিচিত্র বিষয়ের প্রবন্ধ রচনায় পারদর্শী। ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার চর্চায় আত্মচিন্তনের গুরুত্বপূর্ণ স্বাক্ষর রয়েছে তাঁর বহু রচনায়। আবার সমাজ, ইতিহাস, রাজনীতি ও সাহিত্যবিষয়ক আলোচনাতেও তাঁর লেখনী ছিল অনায়াসচারী।

শেষ আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২৬ ০৭:৫১

সন্দীপন মিত্রের ‘জাতিগঠনের অগ্রদূত’ (২৭-৯) শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। এ কথা ঠিকই যে, রাজনারায়ণ বসু ছিলেন জাতীয় ঐক্যের সন্ধানী এক সমাজরূপকার। স্বদেশানুরাগ ছিল তাঁর চিন্তার প্রধান চালিকাশক্তি। তবে তিনি ছিলেন গভীর চিন্তাসমৃদ্ধ সুলেখকও। তাঁর রচনায় ছিল নিজস্ব ও মৌলিক চিন্তার প্রকাশ। বাংলা সাহিত্যে যথার্থ গদ্যপ্রবন্ধের বিকাশের আলোচনায় রাজনারায়ণ বসু ও ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের নাম এক সঙ্গে উচ্চারিত হয়।

রাজনারায়ণ ছিলেন বিচিত্র বিষয়ের প্রবন্ধ রচনায় পারদর্শী। ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার চর্চায় আত্মচিন্তনের গুরুত্বপূর্ণ স্বাক্ষর রয়েছে তাঁর বহু রচনায়। আবার সমাজ, ইতিহাস, রাজনীতি ও সাহিত্যবিষয়ক আলোচনাতেও তাঁর লেখনী ছিল অনায়াসচারী। তাঁর বাঙ্গালা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ক বক্তৃতা গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনার প্রথম পর্বের একটি উল্লেখযোগ্য রচনা। সে যুগে দাঁড়িয়ে কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী থেকে ঈশ্বর গুপ্ত, বঙ্কিমচন্দ্র ও রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ কবি-সাহিত্যিকের মূল্যায়ন আমাদের বিস্মিত করে। তাঁর তাম্বুলোপহার গ্রন্থটিও এক সময় পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছিল। ইংরেজি ভাষায় সুপণ্ডিত হয়েও রাজনারায়ণ বাংলা সাহিত্যের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। ইংল্যান্ডের টাইমস পত্রিকায় তাঁর চিন্তাপূর্ণ, যুক্তিগ্রাহ্য ও জাতীয়তাবাদী ভাবনাসমৃদ্ধ বক্তৃতার সারাংশ প্রকাশিত হলে তা প্রশংসিত হয়েছিল বলে জানা যায়।

উনিশ শতকের বাংলায় আধ্যাত্মিক, সাহিত্যিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে একটি বিশিষ্ট নাম রাজনারায়ণ বসু। দেশীয় ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর যেমন গভীর অনুরাগ ছিল, তেমনই ইতিহাসের প্রতি ছিল বিশেষ আকর্ষণ। সেই সঙ্গে বাংলার সামাজিক জাগরণেও তিনি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। সুরাপান নিবারণের সামাজিক দায়িত্ব পালনে তিনি ‘সুরাপান নিবারিণী সভা’ প্রতিষ্ঠা করেন। মদ্যপানবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে তাঁর এই উদ্যোগ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। শিক্ষকতার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক উন্নতি ও দেশপ্রেমের প্রসারেও তিনি আত্মনিয়োগ করেছিলেন। বিধবাবিবাহ আন্দোলনেও তিনি বিদ্যাসাগরকে সমর্থন করেন। এই ধরনের সমাজসংস্কারমূলক উদ্যোগের জন্য তাঁকে সামাজিক বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

‘ভারতীয় জাতীয়তার পিতামহ’ আখ্যায় ভূষিত স্বদেশহিতৈষী রাজনারায়ণ ধর্মচিন্তার ক্ষেত্রেও ঔদার্যের পরিচয় দিয়েছিলেন। তাঁর চিন্তায় ধর্মীয় চেতনার সঙ্গে স্বদেশানুরাগের সমন্বয় ঘটেছিল। ব্রাহ্ম সমাজের মধ্যে বিশ্বজনীনতা ও স্বদেশানুরাগের সমন্বয় সাধনের যে প্রচেষ্টা তিনি করে গিয়েছেন, তার মধ্যেই আজও তাঁর প্রাসঙ্গিকতা নিহিত রয়েছে।

সুদেব মাল, তিসা, হুগলি

বিরল সমন্বয়

সন্দীপন মিত্রের ‘জাতিগঠনের অগ্রদূত’ প্রবন্ধটি পড়ে মনে হল, রাজনারায়ণ বসুকে শুধু স্বদেশচেতনার অন্যতম প্রবক্তা হিসাবে দেখলে তাঁর বহুমুখী প্রতিভার প্রতি সুবিচার হয় না। এই মনীষী ছিলেন শিক্ষক, সাহিত্যিক, ধর্মচিন্তক, সংগঠক এবং জাতিগঠনের এক দূরদর্শী কর্মী। রাজনারায়ণ ইংরেজি সাহিত্য, ইতিহাস ও পাশ্চাত্য দর্শনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কেও গভীর ভাবে অধ্যয়ন করেন। পরে ব্রাহ্ম ধর্ম ও বেদান্তচর্চায় প্রবৃত্ত হন। তাঁর ধর্মভাবনায় ঐতিহ্যের প্রতি আস্থা ছিল, ছিল যুক্তি ও আত্মসমালোচনার অবকাশ।

শিক্ষাক্ষেত্রেও তিনি অভিনব পরিবর্তন আনেন। শারীরিক শাস্তির পরিবর্তে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, পারস্পরিক মতবিনিময়, বিতর্ক, খেলাধুলা ও চরিত্রগঠনের উপর জোর দেন। দেশীয় শিল্প, শরীরচর্চা, ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ এবং আত্মনির্ভরতার উপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন। আত্মসমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে তাঁর সময়ের অনেকের থেকে স্বতন্ত্র করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর মধ্যে দেশের উন্নতির জন্য নিরন্তর কর্মপ্রচেষ্টা এবং গভীর ঈশ্বরচেতনার এক বিরল সমন্বয় দেখেছিলেন।

বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির যুগে তাঁর ভাষা, গ্রন্থাগার, জ্ঞানচর্চা, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং আত্মনির্ভরতার ভাবনা নতুন করে ভাবায়। জাতিগঠন তাঁর কাছে শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্ন ছিল না; শিক্ষিত, চিন্তাশীল ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ তৈরি করাও ছিল তার ভিত্তি। তাঁর জীবন ও কর্ম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জাতি গড়ার প্রথম কাজ অন্যকে অনুসরণ করা নয়, নিজের ভিতকে চিনে নেওয়া। নিজের ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের ভিত মজবুত থাকলেই অন্ধ অনুকরণ এড়িয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আধুনিকতাকে গ্রহণ করা সম্ভব।

অলোককুমার মুখোপাধ্যায়, সোদপুর, উত্তর ২৪ পরগনা

চিরস্মরণীয়

‘জাতিগঠনের অগ্রদূত’ প্রবন্ধে রাজনারায়ণ বসুর মতো প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্বকে স্মরণের সুযোগ দিয়েছেন প্রাবন্ধিক সন্দীপন মিত্র।

রাজনারায়ণ বসু প্রায় দেড়শো বছর আগে বাঙালি সমাজের যে দোষত্রুটিগুলি সম্পর্কে সচেতন করেছিলেন, তার অনেক ক’টিই আজও আমাদের সমাজকে ক্রমাবনতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তাঁর বক্তব্যে যে দুর্বলতাগুলির উল্লেখ পাওয়া যায়, সংক্ষেপে সেগুলি হল— শারীরিক বলবীর্য হারানো, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বিদেশিদের অনুকরণ, বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থায় নীতিশিক্ষার অভাব, ছাত্রদের মুখস্থবিদ্যার উপর নির্ভরতা, অর্থপুস্তক বা নোটবইয়ের সর্বনাশা প্রভাব, পানদোষ, অসারল্য, স্বার্থপরতা, প্রবল সুখপ্রিয়তা এবং ধর্মবিষয়ক অবনতি।

তবে তিনি শুধু নিরাশার কথাই বলেননি। তাঁর মতে, নিরাশ না হয়ে আশা অবলম্বন করে থাকতে হবে, কারণ আশাই সকল উন্নতির মূল। এত দুর্বলতা সত্ত্বেও বাঙালির গুণের কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, বাঙালিরা উত্তাল সমুদ্র পেরিয়ে ইংল্যান্ডে গিয়ে সম্মান অর্জন করছেন, সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় সাফল্য পাচ্ছেন, এমনকি অযোধ্যা, জয়পুর ও কাশ্মীরের মতো অঞ্চলে শিল্প গড়ে তুলছেন। ধর্ম ও সংস্কার আন্দোলনেও ভারতে অগ্রণী ভূমিকা নিচ্ছেন বাঙালিরা।

তবে দু’টি ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ ভাবে উন্নতির লক্ষণ দেখেছিলেন— বাঙালির উৎকোচ গ্রহণে পরাঙ্মুখতা এবং স্বদেশপ্রেম। তাঁর মতে, এই দুই গুণ বাঙালির অন্যান্য দোষকে অনেকটাই আচ্ছাদিত করে। বাঙালি যখন এত দূর এগিয়েছে, তখন সে আরও এগোবে। তাঁর মতে, বিধাতার কাছে কিছুই অসাধ্য নয়; তিনি নীচকে উচ্চ করতে পারেন, উচ্চকে নীচ করতে পারেন। হয়তো এই দুর্বল বাঙালি জাতিই ভবিষ্যতে পৃথিবীর অন্যতম প্রধান জাতি হয়ে উঠবে— এই প্রার্থনাই ছিল তাঁর।

সুতরাং, রাজনারায়ণ বসুর মতো ব্যক্তিত্বকে এবং জাতিগঠনে তাঁর অবদানকে আমাদের সর্বদা স্মরণে রাখা উচিত। তাঁর জীবন ও চরিত্র যে জাতির স্মৃতিসম্পদের মূল্যবান অংশ, রবীন্দ্রনাথের স্মরণেও সেই ভাবনারই প্রতিফলন ঘটেছে।

সন্দীপ সিংহ, হরিপাল, হুগলি

মিলিত অবদান

রাজনারায়ণ বসুকে নিয়ে সন্দীপন মিত্রের ‘জাতিগঠনের অগ্রদূত’ প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। নিঃসন্দেহে রাজনারায়ণ বসুও আমাদের জাতিগঠন প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান অংশীদার। কিন্তু সতীদাহ, কুসংস্কার, নারীর অধিকার ও ধর্মীয় সংস্কারের প্রশ্নে এবং বাংলা, ইংরেজি ও ফারসি ভাষায় সংবাদপত্র প্রকাশের মাধ্যমে রামমোহন রায়ই এ দেশে বিজ্ঞানমনস্কতা ও যুক্তিবাদের ভিত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। তাঁর উদ্যোগ ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয় ও রাজনৈতিক চেতনা এবং স্বাতন্ত্র্যবোধ জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করেছিল। এই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী কালে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজনারায়ণ বসু, বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দ ও রবীন্দ্রনাথের মতো মনীষীদের চিন্তা ও কর্মে জাতিগঠন প্রক্রিয়া আরও বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ হয়েছে।

স্বাতন্ত্র্যবোধের বিকাশে বিদ্যাসাগরেরও উল্লেখযোগ্য অবদান স্বীকার করতে হয়। আর স্বাজাত্যবোধ ও জাতীয় ভাবধারার বিকাশে বঙ্কিমচন্দ্রের অবদানই বা অস্বীকার করি কী করে? মনীষীদের চিন্তা, কর্ম ও অবদানের সম্মিলিত ধারাই জাতিকে উন্নত করেছে।

নিত্যরঞ্জন খান, পশ্চিম মেদিনীপুর

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Nationalism Renaissance

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy