সেমন্তী ঘোষের ‘রুদ্ধ দ্বারে আঘাত করো’ (১৪-৮) প্রবন্ধটি ভারতের স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বকে সমগ্র বিশ্বের পরিপ্রেক্ষিতে যে ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
ভারতের স্বাধীনতা লাভ তিনটি প্রধান বৈশ্বিক পরিবর্তন এনেছিল। প্রমাণ করে দিয়েছিল যে ব্রিটিশ বা অন্যান্য ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কোনও অপরাজেয় সত্তা নয়। ভারতের সাফল্য এশিয়া ও আফ্রিকার অজস্র দেশের উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামকে এক অপ্রতিরোধ্য গতি প্রদান করেছিল। শীতল যুদ্ধের মেরুকরণে বিশ্ব যখন আমেরিকা ও সোভিয়েট— দুই বৃহৎ শক্তির শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল, তখন ভারত নবস্বাধীন দেশগুলির জন্য জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন গড়ে তোলে। এটি বিশ্ব-দক্ষিণকে কোনও সামরিক ব্লকের দাসত্ব না মেনে নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার ঐতিহাসিক সুযোগ দেয়। বিশ্বমঞ্চে বিশ্ব-দক্ষিণের অধিকার রক্ষা, সুয়েজ সঙ্কট নিরসন এবং বর্ণবাদের বিরুদ্ধে ভারতই হয়ে উঠেছিল প্রথম ও প্রধান বলিষ্ঠ কণ্ঠ।
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে ভারতের স্বাধীনতা ও মহাত্মা গান্ধীর দর্শনের অবদান ছিল অপরিসীম। দিল্লিতে নেলসন ম্যান্ডেলা শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ভারত নিজের স্বাধীনতা অর্জনের আগেই বিশ্বমঞ্চে দক্ষিণ আফ্রিকার নিপীড়িত মানুষের পক্ষে লড়াই শুরু করেছিল।
ভারতের স্বাধীনতা কোনও একক রাজনৈতিক অর্জনের গল্প নয়। এটি এক দিকে নেহরুর রাষ্ট্রনৈতিক মুক্তি, আন্তর্জাতিক সংহতি ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার রূপরেখা; অন্য দিকে শ্রী অরবিন্দ ও রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণ, চিত্তের মুক্তি এবং সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদকে ছাপিয়ে সর্বজনীন বিশ্বমানবতাবাদের মহৎ আহ্বান। এই রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকতা ও সুগভীর দর্শনের বিরল সমন্বয়েই স্বাধীন ভারত বিশ্ব-দক্ষিণের নির্ভরযোগ্য অভিভাবক এবং বিশ্বশান্তির এক অবিচল অনুঘটক হিসাবে ইতিহাসে চিরস্থায়ী আসন গ্রহণ করেছে।
সরোজ উপাধ্যায়, কলকাতা-৫০
আঁখি ফুটবে
সেমন্তী ঘোষের ‘রুদ্ধ দ্বারে আঘাত করো’ প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু কথা। ১৯৪৭ সালে ভারত রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেয়েছে। কিন্তু নানা বিষয় অসম্পূর্ণ থেকে গিয়েছিল। এই সঙ্গে অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, সামাজিক, জাতীয়, আন্তর্জাতিক, ব্যক্তিগত ইত্যাদি বিষয়ে স্বাধীনতার দিকে আরও এগোনোর কথা ছিল। বিগত ৮০ বছরে তা কি হয়েছে? প্রয়োজনীয় কর্তব্য পালন হয়নি। প্রয়োজনীয় সংস্কার অসম্পূর্ণ থেকে গিয়েছে।
এর বিরুদ্ধে লেখক আঘাত করার আহ্বান জানিয়েছেন, কিন্তু বিশ্বজোড়া এক নৈতিক মডেল অনুসারে। সেই মডেলে রয়েছে গান্ধীর অহিংসবাদ, রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ, সুভাষের জাতীয়তাবাদ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় আবারও বলা যায়— “ওদের যতই আঁখি রক্ত হবে মোদের আঁখি ফুটবে, ততই মোদের আঁখি ফুটবে।”
শুভ্রাংশুকুমার রায়, চন্দননগর, হুগলি
অশ্রুজলে লেখা
স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে সেমন্তী ঘোষের লেখা ‘রুদ্ধ দ্বারে আঘাত করো’ পড়ে হৃদয় মথিত হল। ভারতে জনগণের মনে স্বাধীনতার স্পৃহা প্রবল করার এক মোহিনী শক্তি ছিল গান্ধীজির। ‘হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা’র মতোই তাঁর কথায় দেশবাসী প্রভাতফেরিতে যোগ দিতেন, চরকায় সুতো কাটা, বিদেশি পণ্য বর্জন, লবণ সত্যাগ্রহ বা অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। শুনেছি, আমার দুই স্কুলপড়ুয়া পিসি প্রভাতফেরি করতেন। বাড়িতে কাঠের চরকা, মোটা সুতোর লেচি আর খদ্দরের কাপড়ে তৈরি তেরঙ্গা পতাকাও দেখেছি। আর ছিল কাচের ফ্রেমে বাঁধানো, ফুলে সাজানো মৃত্যুশয্যায় শায়িত দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ছবি, নীচে লেখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই অমর পঙ্ক্তি, ‘এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ/ মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।’
দেশের জন্য উৎসর্গীকৃত প্রাণ সশস্ত্র বিপ্লবীদের হাতে থাকত গীতা ও পটাশিয়াম সায়ানাইড। ব্রিটিশ শাসকের হাতে যাতে ধরা না পড়েন, তার জন্য বাদল গুপ্ত ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার আত্মহত্যা করেন। কত বিপ্লবী ফাঁসির দড়িতে প্রাণ দিয়েছেন। কিশোর ক্ষুদিরামের ফাঁসি দেশবাসীর মনে বড় বেজেছিল, রচিত হয়েছিল সেই অমর লোকগান, ‘এক বার বিদায় দে মা ঘুরে আসি...’।
আন্দামানের পোর্ট ব্লেয়ারে সেলুলার জেল স্মারক মিউজ়িয়মে দেখেছিলাম, কত বিপ্লবী জেলের অন্ধকূপে অত্যাচারিত হয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনুশীলন সমিতির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সতীশচন্দ্র বসুকে লিখেছিলেন যে তিনি দেশাত্মবোধক গান লিখে উদ্বুদ্ধ করতে পারবেন। ‘ও আমার দেশের মাটি’র মতো অনেক গান তিনি লিখেছিলেন। আমার নিজের মামা অনুশীলন সমিতির সদস্য ছিলেন। খুলনা শহরের ভৈরব নদের ও পারে তাঁদের নন্দনপুর গ্রামের বাড়িতে দু’জন বিপ্লবী এসেছিলেন। খুলনার বিখ্যাত করোনেশন গার্লস ইংলিশ হাই স্কুলে পড়া আমার মা আমৃত্যু সে ঘটনা প্রসঙ্গে বলতেন যে বিপ্লবী বারীন ঘোষ ও উল্লাসকর দত্তের ‘পায়ের ধুলো’ পড়েছিল সে বাড়িতে।
আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে ভারতের যোগসূত্র ছিল। অ্যানি বেসান্ত আইরিশ বংশোদ্ভূত হওয়ায় ‘হোম রুল’-সহ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সমর্থক ছিলেন। আইরিশ লেডি ভারতপ্রাণা, বিবেকানন্দ-শিষ্যা সিস্টার নিবেদিতা তথা মার্গারেট এলিজ়াবেথ নোবেল বাংলার মানুষদের সহায়তা দিতেন। শত প্রাণের আত্মবলিদানে আমরা চোখের জলের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি।
শিখা সেনগুপ্ত, বিরাটি, উত্তর ২৪ পরগনা
সুদূরপ্রসারী
ভারতের আশিতম স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপনের অঙ্গ হিসাবে সেমন্তী ঘোষের ‘রুদ্ধ দ্বারে আঘাত করো’ শীর্ষক প্রবন্ধটি নিঃসন্দেহে ভিন্ন ধরনের একটি লেখা। পড়ে অন্য একটি মিলের কথাও মনে পড়ছিল। ঠিক এ ভাবেই তো ১৭৭৫ সালে শুরু হওয়া আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ ও ১৭৭৬ সালের স্বাধীনতার ঘোষণা ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের উপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে আমেরিকার সফল বিদ্রোহ ফরাসি সেনা ও সাধারণ মানুষের একাংশকে নতুন রাজনৈতিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ করেছিল। এক দশকের মধ্যেই ফ্রান্সে পুরনো রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যে বিপ্লবের সূচনা হল, তার পটভূমি তৈরিতে আমেরিকার অভিজ্ঞতারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
তবে, অন্যান্য দেশে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রভাবও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সুদূরপ্রসারী তার ফল।
গৌতম নারায়ণ দেব, কলকাতা-৭৪
বদল এসেছে?
“‘অনিয়মে’ নিলম্বিত ২২, কড়া হতে চায় বিজেপি” (৬-৮) প্রতিবেদন প্রসঙ্গে কিছু কথা। মনে পড়ে, এক সময় সিপিএমের লোকাল কমিটিগুলি ছিল এলাকার অঘোষিত প্রশাসন। পারিবারিক ঝামেলাতেও লাল পার্টির নেতাদের দাদাগিরিই ছিল শেষ কথা। মানুষ সেই সংস্কৃতি মেনে নেয়নি।
তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনেও ধীরে ধীরে পাড়ায় পাড়ায় দাদা-সংস্কৃতি শুরু হয়ে যায়। কাটমানি, সিন্ডিকেট, তোলাবাজির মতো শব্দগুলি বাংলার রাজনৈতিক অভিধানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। মানুষের সেই ক্ষোভের উপর ভর করেই বিজেপি আস্তে আস্তে তাদের জমি শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করিয়ে ক্ষমতায় এল। তাদের মনে রাখতে হবে, জনগণ শুধু দল বা পতাকার বদল চাননি, রাজনৈতিক সংস্কৃতির বদল চেয়েছিলেন। কিন্তু সেটা কি হল?
রতন চক্রবর্তী, উত্তর হাবড়া, উত্তর ২৪ পরগনা