‘ট্রামের পুনরুজ্জীবন ও সম্প্রসারণের ভাবনা’ (২-৭) শীর্ষক সংবাদটি নিয়ে কিছু কথা। শহরে ট্রামের পুনর্যাত্রার সম্ভাবনা ঘিরে প্রশাসনের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং শহরবাসীর কাছে প্রকৃত অর্থেই এক দারুণ সুখবর।
সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত, পরিবেশবান্ধব, আরামদায়ক এই যান এক সময়ে ছিল আমাদের কলকাতার অন্যতম গর্ব। শহরের প্রবীণ নাগরিকদের কাছে আজও এর আবেদন অপরিসীম। নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত বহু মানুষের মতো আমিও নির্দ্বিধায় জানাতে পারি, আজ থেকে প্রায় ষাট-পঁয়ষট্টি বছর আগে বাড়ির বড়দের সঙ্গে হাওড়া থেকে ট্রামে চড়ে কালীঘাট মন্দিরে দেবীদর্শনে প্রায়শই যাতায়াত করেছি। প্রয়োজনের তাগিদেও শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ট্রামে চড়ার সুযোগ হয়েছে। সেই সব মধুর স্মৃতি আজও আমার মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে। এক সময়ে সারা শহরই যেন ট্রাম চলার ঘড়ঘড় শব্দে মুখর হয়ে থাকত।
ট্রামগাড়ি ও তার পরিষেবার সেই জৌলুস আজ অনেকটাই অতীত। তবুও দূষণমুক্ত, আরামদায়ক এই যানটির ঐতিহ্যময় ইতিহাস আজও সমান উজ্জ্বল। কলকাতায় প্রথম ঘোড়ায় টানা ট্রাম চালু হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বৈদ্যুতিক ট্রামের সূচনা হয় এবং ক্রমে শহরের বিস্তীর্ণ অংশে লৌহবাঁধানো ট্রামপথ ছড়িয়ে পড়ে। সেই অগ্রগতির ধারায় এক সময়ে ট্রাম পৌঁছে যায় পাশের শহর হাওড়াতেও। হাওড়া স্টেশন থেকে উত্তরে সালকিয়া এবং দক্ষিণে শিবপুর পর্যন্ত ট্রামের রুট বিস্তৃত হয়েছিল। আজ হাওড়ায় ট্রাম না চললেও সেই চলাচলের স্মৃতি বহন করে ‘শিবপুর ট্রামডিপো’ নামটি এখনও এলাকার পরিচয়ের অংশ হয়ে রয়েছে।
এই দৃষ্টিনন্দন, ধীরগতির যানটির সঙ্গে আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতিরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় বার বার ট্রামের উল্লেখ এসেছে। বাংলা চলচ্চিত্রেও কলকাতার ট্রাম বহু বার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। তাই এই যানকে শুধু একটি পরিবহণ ব্যবস্থা হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি আমাদের নগর-ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিরও অংশ। সেই কারণেই একে অবহেলায় হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না।
প্রাসঙ্গিক ভাবে উল্লেখ করা যায়, আশির দশকের গোড়ার দিকে প্রতি দিন কমবেশি প্রায় ২৭৫টি ট্রাম কলকাতার রাস্তায় চলত এবং প্রায় লক্ষাধিক যাত্রী পরিবহণ করত। নিয়মিত যাত্রীদের সুবিধার জন্য মাসিক টিকিটের ব্যবস্থাও ছিল। অল্প খরচে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ট্রামে চড়ে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পেতেন সাধারণ মানুষ। সেই অর্থে ট্রাম শুধু কলকাতার একটি পরিবহণ ব্যবস্থা নয়, এটি নিজেই এক ঐতিহ্যমণ্ডিত ঐতিহাসিক সম্পদ। তাই কলকাতার ঐতিহ্যবাহী এই যানটির যথাযথ সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং পুনর্প্রতিষ্ঠার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ সময়ের দাবি।
অত্যন্ত আনন্দের বিষয়, সেই দাবি সরকারি উদ্যোগে ক্রমশ বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। আশা করা যায়, কলকাতার পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ এই ট্রাম আবারও নতুন প্রাণ ফিরে পাবে।
অমলকুমার মজুমদার, শিবপুর, হাওড়া
অভিন্ন আইন
শমীক সেনের ‘ব্যক্তিপরিসর এবং রাষ্ট্র’ (৭-৭) শীর্ষক প্রবন্ধে ইউনিফর্ম সিভিল কোড (ইউসিসি)-এর কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি অত্যন্ত সুন্দর ভাবে এসেছে।
ইউসিসি বা ইউনিফর্ম সিভিল কোড হল একটি প্রস্তাবিত অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, যার লক্ষ্য ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গ নির্বিশেষে ভারতের সকল নাগরিকের জন্য বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, দত্তক গ্রহণ এবং সম্পত্তির অধিকারের মতো ব্যক্তিগত পারিবারিক বিষয়ে একই আইন প্রযোজ্য করা। বর্তমানে ভারতে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর জন্য পৃথক ব্যক্তিগত আইন (পার্সোনাল ল’) কার্যকর রয়েছে। ইউসিসি বাস্তবায়িত হলে এই বিষয়গুলিতে সকল নাগরিকের জন্য একটি অভিন্ন দেওয়ানি আইন কার্যকর হবে।
১৯৮৫-র সুপ্রিম কোর্টের শাহ বানো মামলার রায়ের পর ইউনিফর্ম সিভিল কোড জাতীয় স্তরে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে। এর পর থেকে বিভিন্ন সময়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও মতবিনিময় অব্যাহত রয়েছে। ভারত ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তাই সংবিধানের মূল্যবোধ, সকল সম্প্রদায়ের অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে ইউসিসি নিয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত।
তপন মোহন চট্টোপাধ্যায়, সিউড়ি, বীরভূম
বিজ্ঞান ও বঙ্কিম
সিদ্ধার্থ মজুমদারের ‘বিজ্ঞান নিয়েও সমান আগ্রহী’ (৭-৭) শীর্ষক প্রবন্ধটি মন ছুঁয়ে গেল। আজকের দিনে যখন ‘ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেম’-এর আড়ালে নানা অপ্রমাণিত ও অবৈজ্ঞানিক ধারণাকে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পরিসরে স্থান দেওয়ার দাবি ওঠে, তখন মনে হয়, তা ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ভাবা যায়, ২০১৫ সালের ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেস-এ উপস্থাপিত একটি প্রবন্ধে দাবি করা হয়েছিল, আজ থেকে প্রায় ৯,০০০ বছর আগে ভারতের আকাশে পুষ্পক বিমান উড়ত!
স্কুল স্তরের পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন, সংযোজন বা বর্জনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কী বার্তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে, তা ভেবে দেখা জরুরি। স্কুলের পাঠ্যবই হওয়া উচিত প্রকৃত জ্ঞান ও মৌলিক তথ্যের নির্ভরযোগ্য ভান্ডার। এই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েই ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে উচ্চতর শিক্ষার আগ্রহ, প্রশ্ন করার সাহস এবং অনুসন্ধিৎসু মন গড়ে ওঠে— সেটাই কাম্য।
আজ যখন ‘বন্দে মাতরম্’ ও আনন্দমঠ-এর স্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্রকে স্মরণ করার নানা আয়োজন রাজ্য ও দেশ জুড়ে হয়, তখন তাঁর যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং মুক্তচিন্তার কথাও সমান গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করা প্রয়োজন। তা না হলে শুধু বাঙালি নয়, সমগ্র ভারতবাসীকেই আবার কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরতে পারে। তার অর্থ হবে সমাজের প্রগতির স্রোতকে উল্টোমুখী করে দেওয়া।
সুমিত কুমার রাউৎ, তমলুক, পূর্ব মেদিনীপুর
রায়ের মর্যাদা
গণতন্ত্রে ‘আয়ারাম-গয়ারাম’ রাজনীতি এখনও বহাল। তাই দলবদল-বিরোধী আইনের সংস্কার জরুরি। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সুযোগসন্ধানী দলত্যাগ রোধ এবং ভোটারদের রায়ের মর্যাদা রক্ষার উদ্দেশ্যেই এই আইন প্রণীত হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, সেই লক্ষ্য পূরণে আইনটি অনেকাংশেই ব্যর্থ। আইনের ফাঁকফোকর, আবার কখনও রাজনৈতিক কৌশলের কারণে দলবদলকারীরা নির্বিঘ্নে ক্ষমতার সুবিধা ভোগ করছেন। এতে যেমন আইনের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে, তেমনই গণতন্ত্রের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
প্রার্থী কেবল ব্যক্তি হিসাবে নির্বাচিত হন না; তিনি একটি রাজনৈতিক দল, তার আদর্শ এবং নির্বাচনী প্রতীকের প্রতিনিধিত্ব করেন। ভোটারও সেই বিবেচনাতেই তাঁর পক্ষে রায় দেন। নির্বাচনের পরে যদি কোনও জনপ্রতিনিধি ব্যক্তিস্বার্থে বা ক্ষমতার সমীকরণে দল পরিবর্তন করেন, তবে তা নিছক রাজনৈতিক ঘটনা নয়; তা ভোটারের রায়ের প্রতিই অশ্রদ্ধা।
দলবদলকে নিরুৎসাহিত করতে হলে আইনের আরও কঠোর ও কার্যকর প্রয়োগ প্রয়োজন। দলত্যাগ-সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে আরও নিরপেক্ষ করা এবং প্রয়োজনে দল পরিবর্তনকারী প্রতিনিধির পুনর্নির্বাচনের ব্যবস্থা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।
রবিশংকর রায়, কলকাতা-৫৬