E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সম্পাদক সমীপেষু: সম্পদ রক্ষায়

প্রশাসনের কাছে আবেদন, বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর-সহ ঐতিহ্যবাহী শহর ও গ্রামগুলির সাংস্কৃতিক সম্পদকে সংরক্ষণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হোক।

শেষ আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:২৯

দীপঙ্কর ঘোষের “এই ‘ঐতিহ্য’ রক্ষা করবে কে” (১২-৯) প্রবন্ধ প্রসঙ্গে বলতে চাই, বাঁকুড়া জেলা অত্যন্ত ঐতিহ্যপূর্ণ ও সংস্কৃতিসমৃদ্ধ। বিশেষত বিষ্ণুপুরের ইতিহাস, স্থাপত্য, সঙ্গীত ও হস্তশিল্প এই জেলার গৌরব। অথচ দীর্ঘদিনের অবহেলায় এই ঐতিহ্য যেন ক্রমশ মলিন হয়ে পড়ছে। মল্ল রাজবংশের ইতিহাস, পোড়ামাটির মন্দির, রাসমঞ্চ, মদনমোহন মন্দির, জোড়বাংলা মন্দির— সবই বিষ্ণুপুরের অমূল্য সম্পদ। দলমাদল কামানও এই ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। মল্লরাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত মন্দিরগুলির টেরাকোটা ফলকে পুরাণ, মহাকাব্য, ধর্মীয় আখ্যানের পাশাপাশি সমকালীন জনজীবনের নানা ছবি ফুটে উঠেছে। বিষ্ণুপুরের বালুচরি শাড়িতেও সেই ঐতিহ্য ও নকশার প্রভাব দেখা যায়। পাশাপাশি বিষ্ণুপুর ঘরানার শাস্ত্রীয় সঙ্গীতেরও রয়েছে নিজস্ব ঐতিহ্য ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দফতরও বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা মন্দির, বালুচরি, সঙ্গীত ও হস্তশিল্পের ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেছে।

ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক পর্যটনের উপযোগী করে তুলতে আরও পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু মন্দির সংরক্ষণ করলেই হবে না, পর্যটকদের যাতায়াতের সুবিধা, পরিচ্ছন্নতা, পানীয় জল, শৌচাগার, থাকার ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পর্যায়ে উপযুক্ত পর্যটন-পরিকাঠামোও গড়ে তুলতে হবে। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দফতরের তথ্য অনুযায়ী বিষ্ণুপুর কলকাতার সঙ্গে সড়ক ও রেলপথে যুক্ত এবং সেখানে পর্যটন-পরিকাঠামো গড়ে উঠেছে; কিন্তু ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলির মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আরও উন্নত ও পরিকল্পিত ব্যবস্থা করার অবকাশ অবশ্যই রয়েছে।

সর্বোপরি, প্রশাসনের কাছে আবেদন, বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর-সহ ঐতিহ্যবাহী শহর ও গ্রামগুলির সাংস্কৃতিক সম্পদকে সংরক্ষণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হোক। শুধু নামমাত্র সংস্কার নয়, পুরনো স্থাপত্যের চরিত্র অক্ষুণ্ণ রেখে বিশেষজ্ঞের পরামর্শে সংরক্ষণের ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় কারিগর, তাঁতি, শিল্পী ও অন্যান্য মানুষের জীবিকাকেও সংরক্ষণ-পরিকল্পনার অংশ করা দরকার। ঐতিহ্য বাঁচলে তাঁদের দক্ষতাও বাঁচবে, তাঁদের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।

গীতিকা কোলে, কলকাতা-৫২

সংরক্ষণ জরুরি

দীপঙ্কর ঘোষের “এই ‘ঐতিহ্য’ রক্ষা করবে কে?” প্রবন্ধটি পড়ে মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। বাংলার প্রাচীন স্থাপত্য-ভাস্কর্যের গৌরবময় সৃষ্টিগুলির এমন মৃতপ্রায় ও ক্ষয়িষ্ণু দশা দেখে শঙ্কিত ও লজ্জিত হতে হয়! প্রতিবেদনে উল্লিখিত বাঁকুড়ার সোনামুখীর বিরল পঁচিশ-রত্ন শ্রীধর মন্দিরটির বর্তমান সেবাইত তথা মালিক পরিবারের কাছে আমি এবং দীপঙ্করবাবু ব্যক্তিগত উদ্যোগে বহু বার গিয়েছি। সংস্কারের নামে কংক্রিট বা মার্বেলের আস্তরণ না চাপিয়ে মন্দিরগাত্রের অপরূপ টেরাকোটা শিল্পকে অক্ষুণ্ণ রেখে কী ভাবে যথাযথ সংরক্ষণ করা যায়, সে বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনাও করেছি। কিন্তু প্রতিবারই উপলব্ধি করেছি, সরকারি উদ্যোগ ও বিশেষজ্ঞ সহায়তা ছাড়া এই ধরনের সংরক্ষণ কার্যত অসম্ভব। এখানেই প্রাচীন ঐতিহ্য রক্ষায় প্রশাসনের ভূমিকার প্রশ্নটি মুখ্য হয়ে ওঠে। কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ উদ্যোগে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ অথবা রাজ্য হেরিটেজ কমিশনের মতো উপযুক্ত সংস্থার মাধ্যমে বাংলার গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন স্থাপত্যগুলির সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা ভাবা জরুরি।

বাংলার এই মন্দিরগুলি শুধু ধর্মীয় উপাসনাস্থল নয়, এগুলি ইতিহাস ও শিল্পেরও মূল্যবান দলিল। মন্দিরগাত্রের টেরাকোটা ফলকে পুরাণ, মহাকাব্য, লোকজীবন ও সমকালীন সমাজের নানা ছবি ফুটে রয়েছে। সেগুলি নষ্ট হলে কেবল একটি পুরনো স্থাপত্যই হারাবে না, হারাবে অতীত বাংলাকে বোঝার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। হিন্দু পুরাণ, বেদ, উপনিষদ, গীতা বা রামায়ণ-মহাভারতের ঐতিহ্য নিয়ে জনপরিসরে যত আলোচনা হয়, সেই ঐতিহ্যেরই দৃশ্যমান দলিল হয়ে থাকা গ্রামবাংলার প্রাচীন মন্দিরগুলির সংরক্ষণ নিয়েও ততটাই গুরুত্ব দিয়ে ভাবা প্রয়োজন।

সোনামুখীর শ্রীধর মন্দিরটি পঁচিশ-রত্ন স্থাপত্যরীতির একটি বিরল নিদর্শন; এর চার দিকের টেরাকোটা ফলকে রয়েছে অসাধারণ শিল্পকর্ম। প্রয়োজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শে নিয়মিত সমীক্ষা, নথিভুক্তিকরণ এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ।

হিন্দোল চট্টোপাধ্যায়, সোনামুখী, বাঁকুড়া

শিল্পের সন্ধানে

দীপঙ্কর ঘোষের “এই ‘ঐতিহ্য’ রক্ষা করবে কে” শীর্ষক প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা। গুপ্ত যুগের সাংস্কৃতিক প্রভাবে বাংলায় প্রচুর মন্দির নির্মিত হয়েছিল। তার পরে কিছু কাল মন্দির নির্মাণের ধারায় ছেদ পড়ে। আবার পঞ্চদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে সেই ধারা শুরু হয়। বাংলায় শত শত মন্দির নির্মিত হলেও সংরক্ষণের অভাবে বহু মন্দিরের আজ কোনও চিহ্নই অবশিষ্ট নেই। গ্রামবাংলায় নির্মিত এই সব মন্দিরে প্রাচীন রুচি ও আদর্শের ছাপ থাকলেও প্রয়োগপদ্ধতি ও প্রকাশভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ডেভিড ম্যাককাচ্চন ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। ভারতে এসে তিনি ভারতীয় শিল্পের একনিষ্ঠ অনুরাগী হয়ে ওঠেন। বাংলার পোড়ামাটির মন্দির সম্পর্কে গভীর আগ্রহ নিয়ে আলোকচিত্রের মাধ্যমে সেগুলির নথিভুক্তকরণের কাজে তিনি হাত দেন এবং এই সব মন্দিরের সন্ধানে বাংলার গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে বেড়ান। তাঁর এই কাজ বাংলার টেরাকোটা মন্দির সম্পর্কে পরবর্তী গবেষণার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সত্যজিৎ রায়ও ম্যাককাচ্চনের কাজের প্রশংসা করেছিলেন।

গৌতম নারায়ণ দেব, কলকাতা-৭৪

দুই পৃথিবী

কেতকী কুশারী ডাইসনের প্রয়াণ পরিপ্রেক্ষিতে সুশোভন অধিকারীর ‘ভাবনার ধারালো কলম’ (১৩-৯) লেখাটি সহজ, সাবলীল ও মনকাড়া। বাংলা ও ইংরেজিতে সমান স্বচ্ছন্দ লেখিকার রচনা নারী, প্রেম, দেশ, অভিবাসন ইত্যাদি নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখায়। তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে কোথায় যেন হারিয়ে যাই। বিস্ময়কর হল, তাঁর লেখার বহুমুখীনতার মধ্যে রয়েছে এক নিবিড় সম্পর্ক। সৃষ্টিশীল ও গবেষণামূলক লেখার মধ্যে দেওয়াল ভেঙে দেওয়াও ছিল তাঁর লক্ষ্য।

তিনি প্রবাসকে কখনও নস্টালজিয়ার বিষয় করেননি। তাঁর নোটন নোটন পায়রাগুলি রচনায় এক জন নারী একটি অপরিচিত সমাজব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হতে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেন। এ যেন তাঁর নিজের জীবনেরও গল্প। রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সম্পর্ক নিয়ে লেখাতেও তিনি ইতিহাসকে খুঁজেছেন। রবীন্দ্রনাথকে খুঁজেছেন রঙের মধ্যে দিয়ে। লেখার মাধ্যমে অনুসন্ধান করেছেন, ব্রিটিশরা ভারতে এসে কী ভাবে ভারতকে দেখেছিল, আবার ভারত থেকে যাওয়া মানুষরা ইংল্যান্ডকে কী ভাবে দেখেছিল। এর মাঝে দাঁড়িয়ে তিনি ‘দেখা’ নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছেন।

তিনি দেখিয়েছেন, এক জন মানুষকে একটি মাত্র পরিচয়ে বাঁচতে হবে, এমন নয়। আমরা একাধিক সংস্কৃতি, ভাষা ও জীবনদর্শন নিয়ে বাঁচতে পারি। আর এই দুই পৃথিবীর মাঝখানের যে জায়গাটিকে এত দিন নিজের বলে ভেবেছি, সেটিই হয়ে উঠতে পারে আমাদের আপন আলয়।

অনীতা চৌধুরী, শ্রীরামপুর, হুগলি

গৌরবের দিন

ভারতীয় ইতিহাসে ১১ সেপ্টেম্বরের গুরুত্ব নিয়ে কম কথা হয়। দিনটি ভুলে গেলে চলবে না। এ এক গৌরবোজ্জ্বল দিন। ১৮৯৩ সালের এই দিনে শিকাগোয় বিশ্বধর্ম মহাসভার উদ্বোধনী অধিবেশনে স্বামী বিবেকানন্দের বক্তৃতা জগৎকে মুগ্ধ করেছিল। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল বিভাজন নয়, মিলন ও ঔদার্য।

আজ তাঁর সেই বাণীর প্রাসঙ্গিকতা যেন আরও গভীর। ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, সামাজিক বিভাজন, বিদ্বেষ ও পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস যখন পৃথিবীর নানা প্রান্তে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে, তখন বিবেকানন্দের শিকাগো-বার্তা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য যদি মানুষকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসা হয়, তবে সেই মানবিক চেতনাই হওয়া উচিত আমাদের পথের দিশা।

সিদ্ধার্থ দত্ত, বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Preservation Conservation

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy