সুমন কল্যাণ মৌলিক তাঁর ‘স্কুলগুলি বাঁচিয়ে রাখা জরুরি’ (১১-৯) শীর্ষক প্রবন্ধে সরকারি স্কুলের বাস্তব চিত্রটি তুলে ধরেছেন। ভাবা যায় না, ভারতের স্বাধীনতার আশি বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও গত এক দশকে দেশে প্রতি দিন গড়ে ২৫টি সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শুধু এই একটি পরিসংখ্যানেই সরকারি স্কুলের ব্যবস্থাপনার করুণ চিত্রটি প্রকাশ পেয়েছে।
স্কুল বন্ধ হওয়ার অন্যতম কারণ স্কুল ভবনগুলির পরিকাঠামোর অভাব ও শিক্ষকের অপ্রতুলতা। স্কুল ভবনে আধুনিক পরিকাঠামো ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক-শিক্ষিকা থাকলে সরকারি স্কুলে পড়ুয়ার এমন ঘাটতি হত না এবং স্কুল উঠে যাওয়ার মতো লজ্জাজনক দৃশ্যও প্রত্যক্ষ করতে হত না। এই ঘটনা থেকে পরিষ্কার, কেন্দ্রেই হোক বা রাজ্যে, প্রশাসন এখনও শিক্ষাকে কতখানি অবহেলার চোখে দেখে। প্রশাসন বিভিন্ন উৎসবে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে। কিন্তু তাতে দরিদ্র মানুষের কতখানি উপকার হয়? বিভিন্ন ঘাটে গঙ্গা আরতি সাড়ম্বরে চললেও গঙ্গা দূষণ রোধে বা গঙ্গার নাব্যতা বৃদ্ধির জন্য তেমন উদ্যোগ চোখে পড়ে কি?
বিশ্বের উন্নত দেশগুলির দিকে তাকালে দেখা যায়, সে সব দেশের সরকার শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে। ফলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে তারা অনেক এগিয়ে। এই সব দেশে বেকারত্ব খুব কম। সেখানে দরিদ্রদের ফুটপাত দখল করে ব্যবসা বা ফুটপাতে সংসার পাতার প্রয়োজন পড়ে না। দুঃখের বিষয়, ভারতে দীর্ঘ দিন ধরেই কোনও সরকার শিক্ষাকে তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখেনি। বর্তমান সরকার যদি এই ধারার ব্যতিক্রম হত, তা হলে প্রতি দিন গড়ে ২৫টি সরকারি স্কুল বন্ধ হওয়ার বিষয়ে হয়তো উদ্যোগী হত। ভুললে চলবে না, দেশের প্রান্তিক ও নিম্নবিত্ত পরিবারের লক্ষ লক্ষ সন্তানের শিক্ষার জন্য একমাত্র ভরসা সরকারি ও সরকারপোষিত বিদ্যালয়গুলি। সেই ব্যবস্থাটুকুও হারিয়ে গেলে তারা শিক্ষার অধিকার থেকেই বঞ্চিত হবে।
অতীশচন্দ্র ভাওয়াল, কোন্নগর, হুগলি
বৃষ্টির পরে
প্রবল বৃষ্টি এ দেশে নতুন নয়। অথচ একটু জোরে বৃষ্টি হলেই কোথাও হাঁটুজল জমে, কোথাও যানবাহন অচল হয়ে যায়, কোথাও নর্দমার নোংরা জল ঢুকে পড়ে বাড়ির ভিতর। মহানগর থেকে জেলা শহর, সর্বত্র ছবিটা প্রায় একই। বর্ষার জলকে ধারণ করার একটি স্বাভাবিক ব্যবস্থা এক সময় আমাদের জনপদগুলিতে ছিল। খোলা মাটি জলের বড় অংশ শুষে নিত। পুকুর, ডোবা, মাঠ ও নিচু জমি অতিরিক্ত জল সাময়িক ভাবে ধরে রাখত। নগরায়ণের নামে আমরা সেই স্বাভাবিক ব্যবস্থাটিই নষ্ট করেছি। বাড়ির উঠোন থেকে রাস্তার ধার, সর্বত্র কংক্রিটের আস্তরণ। পুকুর ও ডোবা ভরাট হয়েছে, নিচু জমিতে গড়ে উঠেছে আবাসন, বাজার ও বহুতল। যে মাটি আগে জল শুষে নিত, তার উপর এখন পিচ কিংবা সিমেন্ট। ফলে বৃষ্টির জল মাটিতে প্রবেশের সুযোগ না পেয়ে রাস্তায় ও নালায় এসে জমা হচ্ছে। সমস্যা বাড়িয়েছে অপরিকল্পিত ভাবে রাস্তা উঁচু করার প্রবণতা। পুরনো রাস্তার উপর নতুন স্তর বসানো হচ্ছে, কিন্তু পাশের বাড়ি, নালার মুখ ও এলাকার স্বাভাবিক ঢালের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য রাখা হচ্ছে না। ফলে রাস্তার জল সরাসরি বাড়িতে ঢুকে যাচ্ছে।
নাগরিকদের দায়ও কম নয়। রাস্তায় ফেলা প্লাস্টিক, খাবারের প্যাকেট ও অন্যান্য আবর্জনা বৃষ্টির জলে ভেসে এসে নালার মুখ বন্ধ করে দেয়। তবে, শুধু নাগরিক সচেতনতার কথা বলে পুরসভা নিজের দায়িত্ব এড়াতে পারে না। নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, নির্মাণবর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট ব্যবস্থা এবং বর্ষার আগে নালার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পরিষ্কার করা প্রশাসনের কর্তব্য। এই সমস্যার সমাধান কয়েকটি নালা পরিষ্কার কিংবা জল জমার পরে পাম্প চালানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বৈজ্ঞানিক নিকাশি ব্যবস্থা চাই। কোথায় নিচু জমি আছে, কোন পথে জল আসে, কোথায় জমে এবং শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে পড়বে, তার সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার। পুকুর, খাল ও প্রাকৃতিক জলপথকে ভরাট করা যাবে না। বৃষ্টিকে বিপর্যয়ে পরিণত করছে আমাদের অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দীর্ঘ দিনের অবহেলা। জলকে শুধু নালা দিয়ে বার করার চেষ্টা না করে তাকে ধারণ করার জায়গাও দিতে হবে। আমরা সেই পথ বন্ধ করলে, সে মানুষের ঘরের ভিতর দিয়েই নিজের পথ তৈরি করে নেবে।
মিলন কর্মকার, আসানসোল, পশ্চিম বর্ধমান
একুশে-র স্মৃতি
২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হয়ে আসার পর ১৯৯৩-এর ২১ জুলাই ১৩ জন যুব কংগ্রেস কর্মীর পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে প্রাক্তন বিচারপতি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন। কমিশন তাঁর কাছে তদন্তের রিপোর্ট জমা দেওয়া সত্ত্বেও মুখ্যমন্ত্রী যে কারণেই হোক, সেই রিপোর্ট প্রকাশ করেননি। অবশেষে শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার ৭১ দিনের মাথায় বিধানসভায় দাঁড়িয়ে সেই রিপোর্ট প্রকাশ করেন।
এই পরিপ্রেক্ষিতে ওই দিনের প্রত্যক্ষদর্শী তথা কংগ্রেসকর্মী হিসেবে আমার এই পত্র। সে দিন এসপ্ল্যানেড ইস্ট-এ উপস্থিত থেকে পুরো ঘটনাটাই আমি প্রত্যক্ষ করেছিলাম। ১৯৯৩-এর ২১ জুলাই বিভিন্ন বিষয়কে সামনে রেখে তৎকালীন যুব-কংগ্রেসের সভানেত্রী মহাকরণ অভিযানের ডাক দিয়েছিলেন। আর সেই সূত্রেই মহাকরণে ঢোকার পাঁচটি প্রবেশপথে পাঁচটি সভার আয়োজন করা হয়েছিল। কে সি দাসের মিষ্টির দোকানের সামনে উত্তর ২৪ পরগনা জেলা ও যুব কংগ্রেসের সভার আয়োজন করা হয়েছিল। ধর্মতলার সভাস্থলে হঠাৎ কিছুটা উত্তেজনার সৃষ্টি হয় যখন খবর আসে মেয়ো রোডের সভাস্থলে পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি চলে যাওয়ার আগে আমাদের বলে যান খুব সাবধানে থাকতে, যে-হেতু ব্যাপক গোলমালের সম্ভাবনা ছিল। সৌগত রায়ও চলে যাওয়ার সময় সাবধান করে যান।
এর কিছু ক্ষণ পর ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে স্যর আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মূর্তির কাছেই হঠাৎ এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন। কোনও পুলিশকর্মী সেখানে ছিল না, কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে থাকা তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রধান শরিকের সশস্ত্র ক্যাডারদেরই চার দিকে দেখা যাচ্ছিল। দুপুর তিনটে নাগাদ এলোপাথাড়ি লাঠি ও গুলিতে সমাবেশ ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। আমরাও ছুটে পালাতে গিয়ে জ্যোতি সিনেমার কাছে পৌঁছে মঞ্চের উপরে মাইকে পুলিশকে ভর্ৎসনা করতে থাকা এক মহিলা যুব-কংগ্রেসকর্মীকে পুলিশের গুলিতে লুটিয়ে পড়তে দেখি।
এর দু’দিন পর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস বি চ্যবন কলকাতায় এসে আহত কংগ্রেসকর্মীদের হাসপাতালে দেখতে যান। কিন্তু রাজ্য সরকার বা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তিনি কড়া পদক্ষেপ বা মন্তব্য করেননি, সম্ভবত নরসিংহ রাও-এর মন্ত্রিসভাকে জ্যোতি বসুরা সমর্থন করছিলেন বলে। এই ঘটনার দু’দিন পর প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ময়না-তদন্তে মৃত যুবকংগ্রেসকর্মীদের অনেকের শরীরে যে সব গুলি পাওয়া গিয়েছে, তার অনেকগুলি পুলিশের গুলি নয়।
ওই দিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও প্রাণসংশয় হতে পারত। তাঁর জীবন রক্ষা পায় এক পুলিশকর্মীর সাহসিকতায়। পরে সেই পুলিশকর্মীর চাকরি যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর ওই পুলিশকর্মীর চাকরি ফিরে পাওয়ার আবেদনে সাড়া দেননি। পরে বিভিন্ন সূত্রে শুনেছি, ঘটনাটি ঘটানো হয়েছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পনামাফিক। ওই সময় যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিপিএম তথা বাম ফ্রন্টের বিরুদ্ধে যে ভাবে প্রতিনিয়ত আন্দোলনের ডাক দিয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলছিলেন, তাতে নিশ্চয়ই বাম ফ্রন্ট সরকার আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল।
এ ভাবেই ১৯৯৩-এর ২১ জুলাইকে বোঝা যেতে পারে।
বাবলু নন্দী, কলকাতা-৭৯