E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

নিধিরামের সর্দারি

সব সুপারিশের বেশ কয়েকটি কার্যকর হয়নি, যার অন্যতম হল এনটিএ-র অভ্যন্তরীণ কাঠামোর সংস্কার। স্থায়ী পদে বিশেষজ্ঞ কর্মী নিয়োগ, এবং দশটি স্বতন্ত্র বিভাগে এনটিএ-কে সাজানোর সুপারিশ করে কমিটি।

শেষ আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২৬ ০৭:১৫

ছাত্র আন্দোলনের অপ্রত্যাশিত তীব্রতার মুখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যে ঘোষণাগুলি করলেন, সেগুলো নেহাত প্রত্যাশিত। প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস রুখতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্ক ফোর্স তৈরি হবে, প্রশ্ন-দুর্নীতির সাজা আরও কঠোর করতে আইন হবে, পরীক্ষা-সংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করতে ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট হবে, ইত্যাদি। দু’টি প্রশ্ন থেকেই যায়। এক, এই ব্যবস্থাগুলি যদি সরকার জরুরি বলে মনে করে, তবে ছাত্রদের বিপুল জমায়েত, সোনম ওয়াংচুকের দীর্ঘ অনশন, সারা দেশে ছাত্র-প্রতিবাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকল কেন? দেশের লোক সব কাজ ফেলে রাস্তায় নেমে জনজীবন অবরুদ্ধ না করা পর্যন্ত কি সরকার নিজের ব্যবস্থার দোষত্রুটি দেখতে পাবে না? দুই, এর আগেও প্রশ্ন ফাঁস-সহ নানা দুর্নীতি হয়েছে, তার সমাধানে উচ্চস্তরীয় কমিটিও গঠন হয়েছে, তার সুপারিশও জমা পড়েছে। তার পরেও কী করে ফাঁস হল প্রশ্ন? এক-এক বার প্রশ্ন ফাঁস হবে, আর এক-একটা নতুন কমিটি গঠন হবে, এটাই কি তা হলে ধরে নিতে হবে? দু’বছর আগে, ২০২৪-এর জুন মাসে নিট পরীক্ষায় নানা সমস্যা হয়েছিল— বিহারে ফাঁস-হওয়া প্রশ্ন বিক্রি হয়েছিল ৩০-৫০ লক্ষ টাকায়। গুজরাতের গোধরায় একটি কেন্দ্রে শূন্য উত্তরপত্র জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন নজরদারির ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক। ভুল প্রশ্নপত্র বিলির জেরে এনটিএ গোপনে ‘গ্রেস মার্ক’ দিয়েছিল ১৫৬৩ জন পরীক্ষার্থীকে। সমালোচনার মুখে পড়ে মোদী সরকার ইসরো-র প্রাক্তন চেয়ারম্যান কে রাধাকৃষ্ণনের নেতৃত্বে উচ্চস্তরীয় বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছিল। সেই কমিটি ১০১টি সুপারিশ জমা দেয়।

সেই সব সুপারিশের বেশ কয়েকটি কার্যকর হয়নি, যার অন্যতম হল এনটিএ-র অভ্যন্তরীণ কাঠামোর সংস্কার। স্থায়ী পদে বিশেষজ্ঞ কর্মী নিয়োগ, এবং দশটি স্বতন্ত্র বিভাগে এনটিএ-কে সাজানোর সুপারিশ করে কমিটি। সরকার সে কথার কতটুকু গুরুত্ব দিয়েছে, তা প্রকাশ হয়ে যায় ২২ জুলাই ২০২৬, যখন রাজ্যসভায় একটি প্রশ্নের উত্তরে শিক্ষা মন্ত্রক জানায় যে মাত্র চব্বিশ জন স্থায়ী কর্মী, তিয়াত্তর জন চুক্তি কর্মী নিয়ে কাজ করছে এনটিএ। ঊনচল্লিশটি স্থায়ী পদ, তারও পনেরোটি শূন্য। এই লোকবল নিয়ে ২০১৮ সাল থেকে আজ অবধি ২৭০টিরও বেশি পরীক্ষা নিয়েছে এনটিএ, সাড়ে ছ’কোটি পরীক্ষার্থীর আবেদন যাচাই করেছে। স্বভাবতই বহু ধরনের কাজ ‘আউটসোর্স’ করেছে এনটিএ— পরীক্ষাকেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা, পরীক্ষার্থীদের বায়োমেট্রিক নথিভুক্তি, সিসিটিভি-র নজরদারি, টোকাটুকি আটকানোর জন্য এআই-প্রযুক্তির প্রয়োগ, প্রশ্নপত্র পরিবহণ ও মুদ্রণ, নানা দায়িত্ব তুলে দিতে হয়েছে বাইরের সংস্থার হাতে। ফলে বিপর্যয় ঘটেছে। এনটিএ-র বেশ কিছু পদাধিকারীকে ছাঁটাই করল সরকার। তাতেও দুর্নীতি-অপদার্থতার মূল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাধাকৃষ্ণন কমিটির আর একটি সুপারিশ ছিল যে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের পরীক্ষা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হোক এনটিএ-কে। সেই সুপারিশও মানা হয়নি।

নরেন্দ্র মোদী সরকার সব বিষয়ের, সব ধরনের প্রবেশিকা পরীক্ষার কেন্দ্রীকরণ করার নীতি নিয়েছে। ডাক্তারির জন্য এনইইটি (নিট), এঞ্জিনিয়ারিং-এর জন্য জেইই, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য কমন ইউনিভার্সিটি এন্ট্রান্স টেস্ট (সিইউইটি)-সহ নানা পরীক্ষা নিয়ে এসেছে এনটিএ-র অধীনে। সারা দেশের কয়েক কোটি ছেলেমেয়ের উচ্চশিক্ষার দুয়ার আগলে দাঁড়িয়ে এনটিএ। অথচ, তাকে শক্তিহীন করে রাখা হয়েছে এত বছর। ফলে নানা গোলযোগ হচ্ছে, ফল প্রকাশে বিলম্ব হচ্ছে। এক বার পরীক্ষা বাতিল হয়ে যাওয়া মানে কত পরিবারের সঞ্চয়, কত তরুণ-তরুণীর বহুমূল্য সময় নষ্ট হয়ে যাওয়া, তা কি সরকার বোঝে না? ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, নন্দন নিলেকানির নেতৃত্বে কমিটি নির্মাণ, বিশেষ আদালত তৈরি— এগুলি সূচনা মাত্র। আসল কাজ এখনও বাকি।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
NEET Exam

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy