Advertisement
E-Paper

আশা জাগালেন চাঙ্গা রাহুল, তোপ মোদীকে

রাহুল গাঁধীই তো! হ্যাঁ, তিনিই। বিস্মিত হওয়ার মতো ব্যাপক পরিবর্তন তাঁর মধ্যে এখনই দেখা গেল না। তবে দু’মাস ছুটি কাটিয়ে ফেরার পর যাঁরা আজ দিল্লির রামলীলা ময়দানে রাহুলকে দেখলেন তাঁরা বলছেন, আশা জাগিয়েছেন কংগ্রেস সহ-সভাপতি। কামব্যাক ইনিংসের শুরুটা ভালই হয়েছে। এখন তিনি উইকেটে কতটা পড়ে থাকতে পারেন, সেটাই দেখার।

শঙ্খদীপ দাস

শেষ আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০১৫ ০৩:৪১
লাঙল কাঁধে। রবিবার রামলীলা ময়দানে প্রেম সিংহের তোলা ছবি।

লাঙল কাঁধে। রবিবার রামলীলা ময়দানে প্রেম সিংহের তোলা ছবি।

রাহুল গাঁধীই তো!

হ্যাঁ, তিনিই। বিস্মিত হওয়ার মতো ব্যাপক পরিবর্তন তাঁর মধ্যে এখনই দেখা গেল না। তবে দু’মাস ছুটি কাটিয়ে ফেরার পর যাঁরা আজ দিল্লির রামলীলা ময়দানে রাহুলকে দেখলেন তাঁরা বলছেন, আশা জাগিয়েছেন কংগ্রেস সহ-সভাপতি। কামব্যাক ইনিংসের শুরুটা ভালই হয়েছে। এখন তিনি উইকেটে কতটা পড়ে থাকতে পারেন, সেটাই দেখার।

নতুন ইনিংসের গোড়া থেকেই আজ রীতিমতো চালিয়ে খেলেছেন রাহুল। যে নরেন্দ্র মোদীর নাম করে সমালোচনা করতে একটা সময়ে ইতস্তত করতেন, আজ জমি নীতি নিয়ে সরাসরি তাঁকেই ঝাঁঝালো আক্রমণ করেছেন। জমি অধ্যাদেশ, সার সঙ্কট, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের ক্ষতিপূরণ নিয়ে কৃষকদের একাংশে যখন অসন্তোষ পুঞ্জীভূত হচ্ছে, তখন রাহুল ‘কর্পোরেটের বন্ধু’ তকমা সেঁটে দিতে চেয়েছেন মোদীর গায়ে। সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন, কৃষকদের জমি ছিনিয়ে নিয়ে পুঁজিপতিদের কাছে নিজের ভোটের দেনা শোধ করছেন মোদী! মোদ্দা কথা, প্রত্যাবর্তন সভা থেকে রাহুল স্পষ্ট করে দিয়েছেন, সরকারের জমি ও ‘গরিব বিরোধী’ নীতির বিরুদ্ধে এ বার থেকে ধারাবাহিক লড়াই চালিয়ে যাবেন তিনি।

কাল থেকে সংসদের বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হচ্ছে। তার আগে যে আগ্রাসন আজ দেখালেন রাহুল, তাতে এই অধিবেশনেও জমি অধ্যাদেশ পাশ নিয়ে জটিলতার অশনি সঙ্কেতটাই পরিষ্কার। তবে অধ্যাদেশ পাশ হওয়া-না হওয়া পরের কথা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আজকের নিরিখে সনিয়া ও রাহুল গাঁধীর বৃহত্তর রাজনীতিটাই বেশি প্রাসঙ্গিক। আজ রামলীলা ময়দানের কৃষক সভার ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল কেন্দ্রের নয়া জমি নীতির বিরোধিতা। কিন্তু আসলে এই সভা হল কংগ্রেসেরই হারানো রাজনৈতিক জমি ‘অধিগ্রহণের’ সভা। যার পুরোভাগে রাখা হল রাহুলকে। কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের মতে, জমি নীতিকে হাতিয়ার করে মোদী ও তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে ক্রমশ নেতিবাচক ধারণা গড়ে তোলা এখন দলের লক্ষ্য। রাহুল নিজেও চাইছেন অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের মধ্যে নতুন করে জনভিত্তি গড়তে। এখন এই লড়াইকে তিনি কতটা দক্ষ ভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন, তার ওপরেই নির্ভর করছে কংগ্রেসে এবং জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর ভবিষ্যৎ।

স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, প্রত্যাবর্তন-সভা থেকে কি অক্সিজেন পেল কংগ্রেস? উত্তর হল, কিছুটা হলেও, হ্যাঁ। রামলীলা ময়দানে আজ তিল ধারণের স্থান ছিল । এপ্রিলের চড়া রোদ উপেক্ষা করে মাঠের বাইরের রাস্তাতেও থিকথিক করেছে গোলাপি, বাঁধনি প্রিন্টের পাগড়ির ভিড়। যে ভিড় হর্ষধ্বনিতে স্বাগত জানিয়েছে রাহুলকে। ধৈর্য ধরে শুনেছে তাঁর বক্তব্য। এমনকী কেউ কেউ বলেছেন, রাহুলের বক্তৃতার পাশে আজ খোদ কংগ্রেস সভানেত্রীর বক্তৃতাকেও স্তিমিত দেখিয়েছে। তবে অনেকের মতে, সনিয়া ও মনমোহন সিংহ আজ খুব ভেবেচিন্তেই সংক্ষেপে নিজেদের বক্তৃতা সেরে ফেলেছেন, যাতে রাহুল নিজেকে মেলে ধরতে পারেন।

তা রাহুল নিজেকে মেলে ধরেওছেন। আগাগোড়া ‘নতুন রাহুল’ হয়ে হয়তো দেখা দেননি, কিন্তু তাঁর শরীরী ভাষা ছিল চোখে পড়ার মতো। গলাটাও আগের মতো অতটা মিঠে শোনায়নি। শেষ কবে এমন দাপিয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন রাহুল? অনেকেই মনে করতে পারলেন না। সব চেয়ে বড় কথা, রাহুলের বক্তৃতার বিষয়বস্তুও আগের চেয়ে অনেক ধারালো বলে মনে হয়েছে অনেকের। দীর্ঘ ভূমিকা নয়, প্রসঙ্গান্তরে চলে যাওয়া নয়, দোদুল্যমানতা নয়। গরিবের সমস্যা, কৃষকের সমস্যা, কেন্দ্রের জমি নীতি— এই ত্রিভূজের বাইরে বেরোনো নয়। বরং কেন এই সভা, তিনি কী বলতে চান, গোটাটা নিয়েই (ফের ক্রিকেটের ভাষায়) অনেক বেশি ‘ফোকাস্ড’!

আর রাহুল আক্রমণ যখন হেনেছেন, তখন সেই তিরের লক্ষ্য এক জনই— নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী। পর্যবেক্ষকদের মতে, কেন্দ্রে নতুন সরকার গঠনের মাত্র ১১ মাসের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এত ঝাঁঝালো আক্রমণের নজির নিতান্তই কম। চাঁছাছোলা ভাষায় রাহুল অভিযোগ তুলেছেন, ‘‘মোদীজি কেন জমি আইন বদলাতে চাইছেন, তা পরিষ্কার। লোকসভা ভোটের সময় তাঁর প্রচারের খরচ জোগাতে পুঁজিপতিদের কাছ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ধার নিয়েছিলেন তিনি। কৃষকদের কাছ থেকে জমি ছিনিয়ে নিয়ে সেই দেনা শোধ করতে চাইছেন প্রধানমন্ত্রী।’’

এমনকী মোদীর সাধের ‘গুজরাত মডেল’ তুলে ধরে তাঁকে খোঁচা দিতেও ছাড়েননি রাহুল। অভিযোগ করেছেন, ভোটের আগে শিল্পপতিদের কাছে গুজরাত মডেল তুলে ধরেছিলেন মোদী। আসলে তিনি গুজরাতের কৃষকদের কাছ থেকে জমি কেড়ে নিয়ে পুঁজিপতিদের দিয়েছিলেন। এখন এই মডেল গোটা দেশে কার্যকর করা হবে বলে পুঁজিপতিদের কথা দিয়েছেন তিনি। এই প্রসঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার হিরের খনির প্রসঙ্গ তুলে আনেন কংগ্রেস সহ-সভাপতি। বলেন, ‘‘ওখানকার জমির মালিকদের এখন খনির শ্রমিক হয়ে কাজ করতে হচ্ছে।’’ শুধু গুজরাত মডেল নয়, মোদীর ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্পকেও তীব্র কটাক্ষ করেছেন রাহুল। বলেছেন, ‘‘শিল্প চাই ঠিকই। কিন্তু এমন একটা ভারত আমি চাই না যেখানে হাতে গোনা কিছু লোকের শ্রীবৃদ্ধি হয়। যেখানে বিমানে চড়ে আসা লোকেদের চাকরের কাজ করতে হয় আপনাদের সন্তানকে।’’

সরাসরি মোদীকে একের পর এক আক্রমণের পর স্বভাবতই বিজেপি শিবির থেকে রাহুলের উদ্দেশে পাল্টা তোপ উড়ে এসেছে। ‘পুঁজিপতি’ সংক্রান্ত মন্তব্যের জন্য রাহুলকে ক্ষমা চাইতে হবে বলে দাবি তুলেছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা রবিশঙ্কর প্রসাদ। কিন্তু কংগ্রেসের প্রথম সারির একাধিক নেতা মনে করছেন, এতে আখেরে ভালই হয়েছে। কারণ রাহুলের কথা শুনে আজ অন্তত এটুকু মনে হচ্ছে যে, শাসক দলের আক্রমণের ভয় তিনি করেন না। এই ‘মুড’টাই ধরে রাখতে হবে। এবং সেটা শুধু সংসদের বাইরে নয়, ভেতরেও। লোকসভায় তাঁকে আগের থেকে অনেক বেশি সক্রিয় হতে হবে। কারণ নেতাদের মতে, সরকার-বিরোধী এই রাজনীতিতে ধারাবাহিকতা না থাকলে আখেরে কোনও উদ্দেশ্যই সফল হবে না।

এর পাশাপাশি, সমান্তরাল আরও একটা সঙ্কটও কাটিয়ে উঠতে হবে রাহুলকে। সেটা হল, তাঁর রাজনৈতিক উত্তরণের পথে বাধা— দলের বৃদ্ধতন্ত্র। কংগ্রেস সভাপতি পদে রাহুলের অভিষেক নিয়ে সম্প্রতি লাগাতার প্রশ্ন তুলছিলেন দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিত-সহ বেশ কয়েক জন প্রবীণ নেতা। এমনকী শীলা-পুত্র সন্দীপও একই সুর গেয়েছিলেন। তবে আজ রামলীলার রাহুল যে এঁদের মনেও ছাপ ফেলেছেন, তা সন্দীপের কথাতেই স্পষ্ট। শীলা-পুত্র বলেছেন, ‘‘রাহুল ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক আন্দোলনের যে রূপরেখা সামনে রেখেছেন, তা প্রশংসনীয়। তিনি সফল ভাবে এগোতে পারলে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় আর কোনও বাধা থাকবে না।’’

রাহুল নিজেও বিলক্ষণ সেটা জানেন। এখন তাঁর স্কোরবোর্ড সচল রাখার পালা!

sankhadip das Land Acquisition Bill Narendra Modi land bill Sonia Gandhi congress BJP

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy