ব্রিকস-এর ‘আউটরিচ সেশন’-এ বিমস্টেক-এর সভাপতি হিসেবে আগামী মাসের ১২ তারিখ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গিয়েছে, ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকে এ কথা জানিয়ে দিয়েছে ঢাকা। সূত্রের বক্তব্য, তাঁর প্রথম ভারত সফরেই বহুপাক্ষিক বৈঠকের লেজুড় হিসেবে আসতে নারাজ তারেক। ঢাকা সূত্রের বক্তব্য, এই ধরনের বৈঠকে এসে করমর্দন আর ছবি তোলা ছাড়া কূটনৈতিক কোনও লাভ বাংলাদেশের নেই। বর্তমান স্পর্শকাতর সময়ে তারেক নয়াদিল্লি এসে যে খালি হাতে ফিরে যাবেন (কারণ, রাষ্ট্রীয় সফরের মতো দ্বিপাক্ষিক প্রতিনিধিস্তরের বৈঠক, যৌথ বিবৃতি এবং চুক্তিপত্র সইয়ের সম্ভাবনা নেই), তা বিএনপি-র রাজনীতির পক্ষে অলাভজনক বলেই মনে করছে ঢাকা।
তারেক ব্রিকসে না এলেও দ্বিপাক্ষিক স্তরে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্মেলনে আগ্রহী ভারত। সরকারি সূত্র খবর, ঢাকাকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে খুব শীঘ্রই ওই সম্মেলন করতে চায় দিল্লি। কিন্তু বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাংবাদিক সম্মেলনের কারণ দেখিয়ে তারেক যদি ভারতে আসা থেকে বিরত থাকে, তা হলে বাংলাদেশ ‘ঐতিহাসিক ভুল’ করবে। সে ক্ষেত্রে গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তি, চিকিৎসা, পর্যটন-সহ বহু বিনিয়োগের সুযোগ হারাবে ও পার বাংলা। তারেক নয়াদিল্লি এলে তাঁকে লাল কার্পেট দেবে ভারত। একটি সরকারি সূত্র জানাচ্ছে, ভারতের আমন্ত্রণে এখন যদি বাংলাদেশ মুখ ফিরিয়ে থাকে, তা হলে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা অনেকটাই পিছিয়ে যাবে। কারণ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ক্যালেন্ডারে আগামী ছ’মাসে তেমন কোনও জায়গা নেই।
ঢাকা থেকে ফিরে গত কালই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন দীনেশ। প্রশ্ন উঠছে, ব্রিকস-এ না হয় নাই এলেন, কিন্তু তার আগে কি স্বল্পমেয়াদি কোনও রাষ্ট্রীয় সফর করবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী? কাল বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র মনে করিয়ে দিয়েছেন, ভারতের তরফে দু’দফায় নিমন্ত্রণ করা রয়েছে তারেককে। একটি তিনি প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার সময়ে শীর্ষ দ্বিপাক্ষিক রাষ্ট্রীয় সফরের, অন্যটি ব্রিকস-এর। কূটনৈতিক শিবির বলছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তারেক রহমানের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক দিল্লিতে আয়োজনেরচেষ্টা চলছে। ঢাকা সূত্রের খবর, দ্বিপাক্ষিক সফরের প্রস্তুতিশুরু হয়েছে, তবে তারিখ এখনও স্পষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রেও একটি বিষয় মাথায় রাখতে হচ্ছে। বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফরকে ঘিরে প্রত্যাশার পারদ চড়বে, দেশের মানুষ, দল, জোট সঙ্গী জামায়েতের কাছে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক লাভ দেখানোর প্রশ্ন থাকবে। কিন্তু শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সাংবাদিক সম্মেলনের পর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ছিলা টানটান অবস্থায় রয়েছে। যে চড়া ভাষায় ঢাকা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, তা থেকে স্পষ্ট, তিক্ততা কমাতে কাঠখড় পোড়াতে হবে।
সে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘‘আপনারা এক দিকে হাসিনার তাস খেলবেন, অন্য দিকে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাইবেন সেটা কী করে হয়? এটি পরস্পরবিরোধী। আশা করি ভারতের সরকার বিষয়টি বুঝবে।’’
তবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলের একাংশ এটাও বলছে, চিনের সঙ্গে দলাই লামাকে নিয়ে সংঘাত থাকলেও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সমস্যা হয়নি। সূত্রের খবর, বাণিজ্যক্ষেত্রে যে নিষেধাজ্ঞা মাঝে মাঝেই জারি করা হয়, সেগুলি সম্পর্কে নরম হওয়ার বার্তা ইতিমধ্যেই নয়াদিল্লি ঢাকাকে দিয়েছে। মোদী সরকার হাসিনার প্রত্যর্পণ সম্পর্কে বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের স্পর্শকাতরতার দিক মাথায় রেখেই বিবৃতি দিচ্ছে। হাসিনার সাংবাদিক বৈঠকের পর রণধীর জায়সওয়াল বলেছেন, ‘‘আমরা ওই অনুষ্ঠানের কোনও বক্তব্যকে বিশেষ করে গণতান্ত্রিকভাবে জিতে আসা সরকারের বিরুদ্ধে কোনও কথাকে সমর্থন করি না।’’
নয়াদিল্লি মনে করে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত গতি না আনা গেলেও পারস্পরিক স্বার্থ এবং স্পর্শকাতরতাকে মাথায় রেখে সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় রয়েছে। প্রসঙ্গত, তারেকের সঙ্গে বৈঠকের পর দীনেশ বলেন, ‘‘যখন দুজন নেতা একে-অপরের সঙ্গে বসেন বা কথা বলেন, তখন অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। আমার পূর্ণ আস্থা আছে যে জনগণ ঐক্যবদ্ধ এবং এর সমাধান অবশ্যই হবে। আমি এ বিষয়ে অত্যন্ত আশাবাদী।’’