নেপালের ভোটেকোশী নদীতে বুধবারের হড়পা বানের জেরে বিপদসীমা ছুঁয়ে ফেলেছিল বিহারের কোশী এবং গন্ডক নদী। বৃহস্পতিবার গন্ডকের জলস্তর কিছুটা নামলেও কোশীর পরিস্থিতি এখনও শঙ্কামুক্ত নয় বলে বিহার সরকারের সূত্রে পাওয়া খবর। নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভূমিধসের জেরে আবার হড়পা বান নামলে কোশীতে প্লাবনের আশঙ্কা প্রবল।
ভূবিজ্ঞানী এবং নদী বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন শুধু বন্যা নয়, কোশীর ক্ষেত্রে আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে নেপাল থেকে নেমে আসা বিপুল জলস্রোতের গতিপথ বদল। নেপাল থেকে বিহারে নেমে আসা নদীগুলোর মধ্যে কোশী একটি কারণে আলাদা— এটি শুধু বন্যা ঘটায় না, গতিপথও পরিবর্তন করতে পারে! বিপুল পলি জমার ফলে নিজের নদীখাত উঁচু করে তুলতে পারে এবং হঠাৎ করে তার বর্তমান গতিপথ থেকে অনেক দূরের এলাকাকেও বিপদের মুখে ফেলতে পারে। ১৯৫৪, ১৯৬৮ এবং ২০০৮ সালে বানভাসি কোশী আংশিক ভাবে গতিপথ বদলেছিল। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বিস্তীর্ণ এলাকা।
বুধবার সকালে তুষারধসের জেরে পাথর ও বরফের স্তূপে অবরুদ্ধ হয়েছিল নেপাল-তিব্বত সীমান্তের লেহন্দে নদীর গতিপথ। জমে যাওয়া জলের চাপে হঠাৎই সেই ‘অবরোধ’ ভেঙে যায়। ফলে সৃষ্টি হয় হড়পা বান। রাসুয়া জেলায় লেহন্দে নদী মিলিত হয়েছে তিব্বতে উৎপন্ন ভোটেকোশীর (তিব্বতে যার নাম পোইকু বা বোকু) সঙ্গে। আরও কয়েকটি ছোট জলধারার সঙ্গে মিলে সেই মিলিত প্রবাহের নাম হয়েছে ত্রিশূলী। এর পরে সুনকোশী (সঙ্কোশী), অরুণ ও তামাকোশীর মতো নদী ত্রিশূলীর সঙ্গে মিশে তৈরি হয়েছে সপ্তকোশী নদী। বিহারে প্রবেশ করে যার নাম হয়েছে কোশী। বিহারের কাটিহার জেলার কুরসেলার কাছে এটি গঙ্গা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে।
শুধু কোশী নয়, নেপালের পাহাড়ে হড়পা বান দেখা দিলে বিহারের গন্ডক নদীতেও প্লাবনের আশঙ্কা রয়েছে। তিব্বত সীমান্তবর্তী নেপালের মুস্তাং অঞ্চলের নুশিন হিমাল হিমবাহ থেকে সৃষ্ট কালীগন্ডকী নদী ত্রিশূলী একটি শাখার সঙ্গে মিলিত হয়ে নিম্ন নেপালে নায়ায়ণী নাম নিয়েছে। বিহারের বাল্মীকিনগর জেলায় ভারতে প্রবেশ করার পরে সেই জলপ্রবাহের নাম হয়েছে গন্ডক নদী। বিহারের শোনপুরের কাছে গন্ডক মিশেছে গঙ্গায়। তবে ‘বিহারের দুঃখ’ নামে পরিচিত কোশীর মতো বার বার গতিপথ বদলের ইতিহাস নেই গন্ডকের। আসলে হিমালয়ের প্রায় ৮০০০ মিটার থেকে যাত্রা শুরু করে কুরসেলার সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬০ মিটার উচ্চতায় গঙ্গায় মিলিত হওয়া পর্যন্ত বেশ কয়েকটি ধাপে হঠাৎ করে উচ্চতা বদলেছে কোশী। যার প্রভাব পড়েছে তার আচরণে।
পাহাড়ে, নদী ও এর উপনদীগুলো বিপুল পরিমাণ পলি বহন করে। নদী যখন ঢালু হিমালয়ীয় ভূখণ্ড ছেড়ে অপেক্ষাকৃত সমতল সমভূমিতে প্রবেশ করে, তখন এর প্রবাহের গতি কমে যায় এবং সেই পলির একটি বড় অংশ জমতে শুরু করে। ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট’ (আইসিআইএমওডি)-এর ২০১৯ সালের একটি গবেষণায় কোশীকে ‘অত্যন্ত গতিশীল নদীখাত এবং ঘন ঘন বন্যাপ্রবণ’ নদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তাতে দেখা গিয়েছিল, নেপালের চাতরায় হিমালয় থেকে তরাইয়ে নামার সময় কোশী বার্ষিক ১০ কোটি টন পলি জমা করে। ভারত-নেপাল সীমান্তের বীরপুরের কাছে জমা করে ২ কোটি টন। কেন কোশী এত বেশি পলি বহন করে? পলির প্রধান উৎস হল তরুণ ভঙ্গিল পর্বত হিমালয়ের মাটি, যার মধ্য দিয়ে বয়ে গিয়েছে কোশীর মিলিত জলপ্রবাহ। ক্ষয়, ভূমিধস এবং এর উপনদীগুলোর বহন করে আনা বালি, কাদা ও পলি ক্রমাগত কোশীর খাতে জমা হয়। ভারতে প্রবেশের সময় নদীখাতের ঢাল অনেকটাই কমে যায়। ফলে পলি জমে হারাতে থাকে নাব্যতা! নদীর গতিপথ বরাবর এবং প্লাবনভূমি জুড়ে জমা হতে শুরু করে পলি। তৈরি হয় গতিপথ বদল এবং আরও বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- ত্রাণ যেমন পাঠানো হচ্ছে, তেমনই আর্থিক সাহায্যও পাঠানো হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে।
- বিপর্যস্ত নেপালকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসছে অনেকেই। বিভিন্ন সংস্থা তো বটেই, ব্যক্তিবিশেষও সাহায্য পাঠাচ্ছেন নেপালে।
- হড়পা বানে বিপর্যস্ত নেপালে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ল। এখনও নিখোঁজ দেড় হাজারের বেশি মানুষ।
-
নিজের এক মাসের বেতন একটি পরিবারকে দেবেন মুখ্যমন্ত্রী! নেপালে নিখোঁজদের পরিজনকে সব রকম সহায়তারও আশ্বাস
-
চিনে নিরাপদ শিবিরে পশ্চিমবঙ্গের পর্যটকেরা? নেপালে হড়পা বানে নিখোঁজ ৩৭ জনের সন্ধানে নবান্নের দ্বারস্থ পরিবার
-
নিখোঁজদের পরিবারকে ডিএনএ নমুনা দিয়ে যেতে বলল কেন্দ্র! গভীর রাতে তিব্বতে ভূমিকম্প, কাঁপল নেপালও
-
হড়পা বানে ভেসে গিয়েছে খামার, ক্ষতিগ্রস্ত চাষজমি, সব হারিয়ে দিশাহারা নেপালের কৃষকেরা
-
নেপালের হড়পা বানে অনিশ্চিত চিনের স্বপ্নের প্রকল্প, রেলপথে নেপাল এবং তিব্বতকে আর জোড়া যাবে কি? সংশয়ে বেজিং