Advertisement
E-Paper

নেপাল বিপর্যয়: খোঁজ মিলছে না কলকাতা-সহ এ রাজ্যের অনেক পর্যটকের! প্রয়াত তৃণমূল নেতা মুকুল রায়ের পুত্রবধূও নিখোঁজ

বুধবার নেপাল-চিন সীমান্তে নেমে আসে বিপর্যয়। ভোটেকোশী নদীতে ভয়ানক হড়পা বান নেমে আসায় বহু গ্রাম ভয়াবহ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এখনও পর্যন্ত ১৬০-এর উপর মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। নিখোঁজ বহু।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৭ অগস্ট ২০২৬ ১৪:২২
(বাঁ দিক থেকে) মৌসুমি গঙ্গোপাধ্যায়, স্নেহাশিস দত্ত, মুকুল রায়ের পুত্রবধূ শর্মিষ্ঠা ভৌমিক, সমর মণ্ডল এবং অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়।

(বাঁ দিক থেকে) মৌসুমি গঙ্গোপাধ্যায়, স্নেহাশিস দত্ত, মুকুল রায়ের পুত্রবধূ শর্মিষ্ঠা ভৌমিক, সমর মণ্ডল এবং অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

নেপালে ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর থেকেই যোগাযোগ করা যাচ্ছে না কলকাতা-সহ এ রাজ্যের বহু পর্যটকের সঙ্গে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত ৩৬ জনের খোঁজ মিলছে না। পরিবারগুলিতে প্রতি মুহূর্তে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা বাড়ছে। অনেকেই প্রিয়জনের ফোনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। বুধবারই নেপাল-চিন সীমান্তে নেমে আসে বিপর্যয়। ভোটেকোশী নদীতে ভয়ানক হড়পা বান নেমে আসায় বহু গ্রাম ভয়াবহ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত ২৮৯ জন মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। নিখোঁজ বহু। নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন অনেক ভারতীয়। কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার উদ্দেশ্যে নেপালে গিয়েছিলেন পর্যটকেরা।

নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন কলকাতা, হুগলি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পশ্চিম বর্ধমান, দার্জিলিং-সহ রাজ্যের বেশ কয়েকটি জেলার পর্যটকেরা। পরিবারগুলির দাবি, যোগাযোগ করা যাচ্ছে না তাঁদের কারও সঙ্গেই। কোথায় রয়েছেন, কী ভাবে রয়েছেন, এ সব চিন্তা করেই উদ্বেগে কাটছে ওই পর্যটকদের পরিবারগুলির। কলকাতা থেকে নাকতলা এবং কসবা থেকে নেপাল ভ্রমণে গিয়েছেন রিনা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সুস্মিতা ভট্টাচার্য। ভ্রমণসংস্থার সঙ্গে গিয়েছিলেন তাঁরা। প্রয়াত তৃণমূল নেতা মুকুল রায়ের পুত্রবধূ শর্মিষ্ঠা ভৌমিক রায় গত ২১ অগস্ট নেপাল গিয়েছিলেন একটি ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গে। বুধবার থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। স্বামী শুভ্রাংশু জানিয়েছেন, এখনও পর্যন্ত কোনও ভাবে যোগাযোগ করা যায়নি।

নাকতলা ও কসবা (কলকাতা)

রিনার পরিবার জানিয়েছে, ২১ অগস্ট নেপালে গিয়েছেন রিনা। বেড়াতে তিনি ভালবাসেন। মায়ের সঙ্গে থাকেন রিনা। বেড়াতে যাওয়ায় তাঁর মাসি এবং ভাই রিনার মায়ের সঙ্গে নাকতলার বাড়িতে এসে রয়েছেন। মাসি জানান, রিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। ভ্রমণসংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু তারাও কোনও খোঁজ দিতে পারেনি। রিনার মতোই ভ্রমণসংস্থার মাধ্যমে নেপালে বেড়াতে গিয়েছেন কসবার সুস্মিতা। কসবায় তাঁর পুত্র এবং পুত্রবধূ থাকেন। আদতে সুস্মিতার বাড়ি উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতে। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা সুস্মিতা। তাঁর পুত্রবধূ তিয়াসা চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘ভ্রমণসংস্থার সঙ্গে গিয়েছিলেন। ঘনঘন বেড়াতে যান শাশুড়ি। রবিবার শেষ ফোনে কথা হয়েছিল। পরে কাঠমান্ডুতে হোয়াট্‌সঅ্যাপে কথা হয়।’’ ২১ আগস্ট ৩০ জনের একটি দল নেপালের উদ্দেশে যাত্রা করে। সেই দলে রয়েছেন সুস্মিতা। কাঠমান্ডুতে পৌঁছোনোর পর ওই দলটি পশুপতিনাথ মন্দিরে যায়। এর পর সেখান থেকে মানস সরোবর যাওয়ার পথে কেরুং এলাকার দিকে রওনা দেয় দলটি। সেই যাত্রাপথেই সুস্মিতার সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

সোনারপুর (দক্ষিণ ২৪ পরগনা)

দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরের বাসিন্দা সফ্‌টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার লোপামুদ্রা কুন্ডু। নেপাল ভ্রমণে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছেন। বিপর্যয় নেমে আসার আগে তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছিল পরিবারের। তখন জানিয়েছিলেন, চিন সীমান্তে রয়েছেন। কিন্তু এখন আর যোগাযোগ করা যাচ্ছে না তাঁর সঙ্গে। লোপামুদ্রার স্বামী শুভ্রজিৎ সিংহরায় ব্যাঙ্ককর্মী। সোনারপুরের বৈকুণ্ঠপুরের বাসিন্দা লোপামুদ্রা একাই ঘুরতে ভালোবাসেন। প্রতি বছরই বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যান তিনি। বাড়িতে রয়েছেন স্বামী, মা-বাবা, এক ছেলে এবং মেয়ে। গত ২১ অগস্ট একটি ভ্রমণসংস্থার সঙ্গে ৩০ জনের একটি দল বেড়াতে যায়। পরিবারের সঙ্গে বুধবার সকালেও কথা হয়েছিল লোপামুদ্রার।

দুর্গাপুর (পশ্চিম বর্ধমান)

যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন পশ্চিম বর্ধমানের দুর্গাপুরের এক দম্পতির সঙ্গেও। দুর্গাপুরের অম্বুজা টাউনশিপের বাসিন্দা ওই দম্পতি। তাঁরাও ২১ অগস্টে কৈলাস-মানস সরোবর ভ্রমণে যান। ওই দম্পতি হলেন দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর স্ত্রী সঙ্ঘমিত্রা। তাঁরা কোথায় রয়েছেন, কী ভাবে রয়েছেন, পরিবারের কেউ জানেন না বলে দাবি। দেবাশিস দুর্গাপুর ইস্পাত হাসপাতালের কর্মী। সঙ্ঘমিত্রা শিক্ষকতা করেন। দুর্গাপুরেরই আর দম্পতি অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায় এবং মৌসুমি গঙ্গোপাধ্যায় নেপাল ভ্রমণে গিয়েছেন। তাঁদের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারছে না পরিবার। দম্পতির খোঁজ না মেলায় উদ্বেগে পরিবার, আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে গোটা তপোবন সিটি এলাকা। দেবাশিস-সঙ্ঘমিত্রাদের মতো ২১ অগস্ট নেপাল ভ্রমণে যান অরিন্দম-মৌসুমি। বিপর্যয়ের খবর পাওয়ার পর যোগাযোগের চেষ্টা করে পরিবার। কিন্তু কোনও ভাবেই যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। ফলে উদ্বেগ বাড়ছে গঙ্গোপাধ্যায় পরিবারে। স্থানীয় বাসিন্দা গৌতম অধিকারী বলেন, ‘‘নেপাল হয়ে মানস সরোবর বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিল ওঁদের। এর আগেও দু’দিন আমি ফোন করেছিলাম। ফোন বেজেছিল, কিন্তু রিসিভ করতে পারেননি। কিন্তু বিপর্যয়ের পর থেকে ওঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা খুব চিন্তায় রয়েছি, উদ্বিগ্ন রয়েছি।’’ দুর্গাপুর থেকে ওই সংস্থার সঙ্গে মোট ছ’জন ভ্রমণে গিয়েছিলেন।

বসিরহাট (উত্তর ২৪ পরগনা)

উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট পৌরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের খান বাহাদুর রোডের বাসিন্দা স্বপন মণ্ডল ও তাঁর স্ত্রী মৌ মণ্ডল। দু’জনেই পেশায় শিক্ষক ছিলেন এবং বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রায় সাত দিন আগে তাঁরা নেপালে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে তাঁদের কৈলাসে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নেপালের ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর থেকেই তাঁদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের আর কোনও যোগাযোগ নেই। মোবাইল ফোনও বন্ধ থাকায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

তারকেশ্বর (হুগলি)

তারকেশ্বরের চাউলপট্টির বাসিন্দা স্নেহাশিস দত্তের খোঁজ মিলছে না। গত ২১ অগস্ট একটি সংস্থার সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেই সংস্থার কর্মী জয়ন্ত সান্যালের বাড়িও তারকেশ্বরে। তিনিও সেই দলে রয়েছেন। স্নেহাশিসের পরিবার জানাচ্ছে, রক্সৌল পৌঁছে সেখান থেকে কাঠমান্ডুতে যান পর্যটকেরা। মঙ্গলবার কাঠমান্ডুতেই ছিলেন। বুধবার নেপাল সীমান্ত থেকে তিব্বত সীমান্ত পেরোনোর কথা ছিল। বুধবার সকাল ৭.২৫ মিনিটে প্রৌঢ় তাঁর স্ত্রী সোমা দত্তকে ফোন করে জানান, তাঁরা অভিবাসন দফতরে যাচ্ছেন। সকাল আটটা নাগাদ সেখানে পৌঁছে যান তাঁরা। যে সময় হড়পা বান আসে, সে সময় ঘটনাস্থলেই ছিলেন পর্যটকেরা। তাই খোঁজ না মেলায় দুশ্চিন্তায় সময় কাটছে পরিবারের।

শিলিগুড়ি (দার্জিলিং)

কৈলাস-মানস সরোবর দর্শনে বেরিয়েছিলেন শিলিগুড়ির বাসিন্দা সমর মণ্ডল। নেপালে বিপর্যয়ের পর থেকে নিখোঁজ তিনিও। মঙ্গলবার শেষ বার পরিবারের সঙ্গে কথা হয়েছিল তাঁর। শান্তিনগর বউবাজার এলাকার বাসিন্দা সমর। বেড়াতে ভালবাসেন। সেই ভালবাসার তাগিদেই এ বার তিনি পাড়ি দিয়েছিলেন কৈলাসের উদ্দেশে। গত ১৬ অগস্ট শিলিগুড়ি থেকে ট্র্যাভেল এজেন্সি মারফত নেপালের উদ্দেশে রওনা দেন। সব ঠিকই ছিল। পরিবারের সঙ্গে প্রতিমুহূর্তে তার কথা হচ্ছিল। কিন্তু মানস সরোবর পৌঁছোনোর আগেই তাঁর শারীরিক পরিস্থিতির অবনতি হয়। কাজেই তিনি ফিরে আসতে চাইছিলেন বারবার। কিন্তু কৈলাস যাত্রার আকাঙ্ক্ষাও ছিল। পরিবার জানিয়েছে, বুধবার তার অভিবাসন দফতরের কাজ চুকিয়ে কাঠমান্ডু ফিরে আসার কথা ছিল। সমরের দাদা ইতিমধ্যেই ভাইয়ের খোঁজে কাঠমান্ডুর উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন।

সাঁকরাইল (হাওড়া)

হাওড়ার সাঁকরাইল থানার অন্তর্গত আন্দুল হাটগাছা এলাকার বাসিন্দা ৬৮ বছরের অনিতা দাস। নেপাল ভ্রমণে গিয়ে নিখোঁজ তিনিও। পরিবার জানিয়েছে, কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রা করার দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল তাঁর। মঙ্গলবার সকাল ৮টা নাগাদ তাঁর সঙ্গে ছেলের শেষ বার কথা হয়েছিল। সেই সময় জানিয়েছিলেন, তাঁরা নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছাকাছি রয়েছেন। এখনও পর্যন্ত অনিতার সম্পর্কে কোনও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। মোবাইল বন্ধ বলছে।

Missing Tourists

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy