জরুরি চিকিৎসার খরচ হোক বা পরিবারে হঠাৎ এসে পড়া কোনও আর্থিক টানাপড়েন— আর চড়া সুদের ফাঁদে পড়তে হবে না রাজ্য সরকারি কর্মীদের। কর্মীদের সুরক্ষিত ও স্বচ্ছ উপায়ে আপৎকালীন আর্থিক সহায়তা দিতে উদ্যোগী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। মঙ্গলবার রাজ্যের অর্থ দফতরের তরফে জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল স্যালারি অ্যাডভান্স স্কিম’ চালুর কথা ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে এ বার থেকে বেতনের ভিত্তিতে খুব সহজেই স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি অগ্রিম বা ঋণ নেওয়ার সুবিধা পাবেন রাজ্য সরকারি কর্মচারীরা। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, প্রথম পর্যায়ে ‘গ্রুপ এ’ থেকে শুরু করে ‘গ্রুপ ডি’— সব শ্রেণির সরকারি কর্মচারীরা এই সুবিধার আওতায় থাকবেন। যাঁরা বর্তমানে ‘ট্রেজারি’ বা ‘পে অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস’-এর অধীনে এইচআরএমএস এবং ডব্লিউবিআইএফএমএস পোর্টালের মাধ্যমে বেতন পান, তাঁরা সরাসরি এই সুযোগ পাবেন। পরবর্তী সময়ে অন্যদের ক্ষেত্রেও ধাপে ধাপে এটি চালু করা হতে পারে।
নবান্ন সূত্রে খবর, সরকারি কর্মচারী মহলে চড়া সুদের অনিয়ন্ত্রিত ঋণ নেওয়ার প্রবণতা ঠেকাতে এবং পরিবারে শিক্ষা বা চিকিৎসার মতো জরুরি প্রয়োজনের কথা ভেবেই এই সিদ্ধান্ত। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া অনুমোদিত বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক ও এনবিএফসি-র সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে এই ডিজিটাল পরিকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। পুরো ব্যবস্থাই হবে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও কাগজহীন। আবেদনকারীর সম্মতির ভিত্তিতে অনুমোদন পাওয়ার কয়েক সেকেন্ড থেকে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সরাসরি তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে যাবে। তবে অগ্রিম বেতন পাওয়ার ক্ষেত্রে ঋণের দু’টি ভাগ ও নিয়মাবলিও রয়েছে। অর্থ দফতরের নির্দেশিকা অনুযায়ী, এই প্রকল্পে মূলত দু’ধরনের অগ্রিম নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
১) স্বল্পমেয়াদি অগ্রিম: জরুরি প্রয়োজন মেটাতে সর্বোচ্চ ৬০ দিন বা পরবর্তী বেতন চক্রের মধ্যে এটি পরিশোধ করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ে টাকা মিটিয়ে দিলে কোনও সুদ লাগবে না। কেবল সর্বোচ্চ ১ শতাংশ বা তার কম নামমাত্র ট্রান্সাকশন ফি নেওয়া হতে পারে।
২) দীর্ঘমেয়াদি অগ্রিম: একটু বড় অঙ্কের আর্থিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য দু’মাস থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৬০ মাস (৫ বছর) মেয়াদে ঋণ নেওয়া যাবে। তবে চাকরির মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার আগেই তা শোধ করতে হবে।
অগ্রিম বেতন নেওয়ার ক্ষেত্রে যথা সময়ে ইএমআই নেওয়ার পরিমাণ এবং আর্থিক সুরক্ষার উপরেও কড়া নজরদারি করা হবে। তাই সরকারি কর্মচারীদের সুরক্ষার স্বার্থে একাধিক বিধিনিষেধও কার্যকর করা হয়েছে। কোনও অবস্থাতেই কর্মচারীর মাসিক মোট প্রাপ্ত বেতনের ৫০ শতাংশের বেশি ইএমআই কাটা যাবে না। পাশাপাশি, একজন কর্মচারী এক সময়ে একটির বেশি অগ্রিমের সুবিধা চালু রাখতে পারবেন না। ঋণ পরিশোধের টাকা সরাসরি পরবর্তী মাসের বেতন থেকে স্বয়ংক্রিয় ভাবে কেটে নেওয়া হবে। মেয়াদ শেষের আগেই পুরো টাকা মিটিয়ে দিতে চাইলে কোনও ‘ফোরক্লোজার চার্জ’ লাগবে না। বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এই প্রকল্পে রাজ্য সরকারের উপর কোনও আর্থিক দায়ভার বা ঝুঁকি থাকবে না। কর্মচারীদের তথ্যের গোপনীয়তা এবং সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সমস্ত নিয়ম কড়া ভাবে মেনে চলা হবে। পাশাপাশি, কর্মীদের বিভিন্ন অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ২৪ ঘণ্টার হেল্পডেস্ক পরিষেবার নির্দেশও দিয়েছে অর্থ দফতর। আগামী পাঁচ বছরের জন্য এই প্রকল্প কার্যকর থাকবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
রাজ্য সরকারি কর্মচারী পরিষদ রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। সংগঠনের রাজ্য সভাপতি দেবাশিস শীল বলেন, ‘‘এই উদ্যোগ প্রশংসা পাওয়ার মতো। আগে মাসে দু’বার পেমেন্ট হত। একটা অ্যাডভান্স দিত। মাসের শেষে সেটা শোধ করে দিতে হত। আর এখন যে স্কিম রাজ্য সরকার ঘোষণা করেছে যে, মাসের একটা সময় অ্যাডভান্সটা নিয়ে নিলেন, তার পর নির্দিষ্ট সময়ে কিস্তিতে শোধ করে দেবেন। তার মানে, মাসের শেষেই পুরোটা একসঙ্গে শোধ করতে হবে না। সময় মতো কিস্তিতে দিলেই হবে। আমরা এই ধরনের সরকারি পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানাচ্ছি।’’
বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির নেতা স্বপন মণ্ডল বলেন, ‘‘সরকার আজ যে স্যালারি অ্যাডভান্স স্কিম চালু করেছে তার ভাল ও খারাপ দিক— উভয়ই আছে। কেউ যদি প্রতি মাসে বাহানা করে অ্যাডভান্স নেওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন তা হলে বিষয়টি সেই ব্যক্তি ও পরিবারের কাছে ক্ষতিকর। কিন্তু প্রকৃত প্রয়োজন যাঁদের, তাঁদের উপকার হবে। এটা যাতে ভাল কাজে ব্যবহার করা হয়, তার জন্য সরকারকে প্রতিটি বিষয় নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে।’’