পঞ্চায়েত দফতরে একঝাঁক নতুন নিয়োগের কথা ঘোষণা করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানালেন নতুন পঞ্চায়েত ভবন তৈরির কথা। আগামিদিনে পঞ্চায়েত দফতরের কাজ সুষ্ঠু ভাবে পর্যালোচনা করতে নিউটাউনেই তৈরি হবে নতুন কার্যালয়। গ্রামীণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করল রাজ্য সরকার।
বুধবার বিধাননগরে পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরের উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠকে একাধিক পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ, কৃষিমন্ত্রী দুধকুমার মণ্ডল, পঞ্চায়েত প্রতিমন্ত্রী শান্তনু প্রামাণিক-সহ দফতরের অন্য আধিকারিকেরা। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘পঞ্চায়েত ভবনে এসে আমি পঞ্চায়েত দফতরকে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে একটা উপহার দিয়ে গেলাম, আমরা নতুন পঞ্চায়েত ভবন বানানোর জন্য নিউ টাউনে যেখানে প্রস্তাবিত কলকাতা হাই কোর্ট এবং বিধানসভা হচ্ছে তার পার্শ্ববর্তী জায়গায় পাঁচ একর জমি আমরা দেব পূর্ণাঙ্গ পঞ্চায়েত ভবন তৈরির জন্য।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘আমরা আট মাসের ভোট অন একাউন্ট করে সরকারে এসেছি, ১২ মাস পাইনি। আমাদের হাতে পাঁচ মাসেরও কম আছে। আমরা ২২ কোটি পূরণ করব, ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রপারলি ইউটিলাইজ় করব, এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরকে গোটা ভারতবর্ষে আমরা মডেল করব। রাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ যে দফতরগুলি রয়েছে তার মধ্যে পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতর প্রথম স্থানে যাবে পারফরম্যান্সে, আমার এই বিশ্বাস আছে।’’
মুখ্যমন্ত্রী জানান, নতুন রাজ্য সরকারের অধীনে ‘ভিবি জি-রামজি’ প্রকল্পের মাধ্যমে ২২ লক্ষ মানুষকে প্রতিদিন রোজগারের সুযোগ করে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। গ্রামাঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রামীণ পরিকাঠামোর উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সেই লক্ষ্যেই নিউটাউনে পাঁচ একর জমির উপর নতুন পঞ্চায়েত ভবন গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন তিনি। এই ভবন থেকে পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন সংক্রান্ত প্রশাসনিক কাজকর্ম আরও সুসংগঠিত ভাবে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানান, কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যের জন্য ২২ কোটি শ্রমদিবস তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এই প্রকল্পের জন্য বরাদ্দের পরিমাণ ২২ হাজার কোটি টাকা। ইতিমধ্যেই কেন্দ্রের তরফে ১২০০ কোটি টাকা রাজ্যে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই ৬৫ লক্ষ ৬২ হাজার কর্মদিবস তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাত লক্ষ কর্মদিবস তৈরি হচ্ছে। হাতে সময় কম থাকলেও কেন্দ্রের নির্ধারিত সম্পূর্ণ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে স্পষ্ট বার্তা দেন তিনি।
পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় কর্মী ও ইঞ্জিনিয়ারের ঘাটতি মেটাতেও বড় পদক্ষেপের ঘোষণা করা হয়েছে। ব্লক স্তরে দীর্ঘদিন ধরে থাকা শূন্যপদ পূরণের জন্য মোট ৭১৯০টি পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করার আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। নিয়োগ সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যেতে দীপাবলির ছুটির পর বিশেষ বিধানসভা অধিবেশন ডাকার কথাও জানানো হয়েছে। ওই অধিবেশনে নিয়োগ সংক্রান্ত বিল পেশ করা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি। সব মিলিয়ে কর্মসংস্থান, প্রশাসনিক পরিকাঠামো এবং স্বচ্ছ নিয়োগ—এই তিন ক্ষেত্রকে সামনে রেখে পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরের কাজের গতি বাড়াতে চাইছে রাজ্য সরকার।
ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়িত হলে গ্রামীণ অর্থনীতি ও পঞ্চায়েত পরিষেবায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, বিভিন্ন গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পে রাজ্যে ইতিমধ্যেই প্রায় ১২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার কাজের পরিকল্পনা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮৫০০ কোটি টাকা দেবে কেন্দ্র। বাকি অর্থের বড় অংশ বহন করবে রাজ্য সরকার। কেন্দ্রের তরফে প্রথম পর্যায়ে ইতিমধ্যেই প্রায় ১২০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৭ লক্ষ ৯ হাজার কর্মদিবস তৈরি হচ্ছে। এখনও পর্যন্ত প্রায় ৬৫ লক্ষ ৬২ হাজার কর্মদিবস তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।
এই প্রকল্পে আধার ও কেওয়াইসি সংযুক্তিকরণের সময় প্রায় ৩১ লক্ষ ভুয়ো জব কার্ড বাতিল হয়েছে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, নতুন করে জব কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রের অনুমোদন পাওয়ার পর জনকল্যাণ শিবির, সেবা সেতু ও সংকল্প অভিযানের মাধ্যমে প্রায় ১০ লক্ষ নতুন জব কার্ড দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ আবাস যোজনায় বাড়ি তৈরির কাজ নিয়েও আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রাথমিক সমীক্ষায় ৫৪ লক্ষ বাড়ির নাম উঠে এলেও পরবর্তী যাচাইয়ের পর সেই সংখ্যা কমে প্রায় ৪৭ লক্ষ হয়েছে। আগামী দুটি অর্থবর্ষের মধ্যে সমস্ত বাড়ি তৈরির কাজ শেষ করার অঙ্গীকার করেছেন তিনি। পঞ্চায়েত দফতরে কর্মী অভাব মেটাতেও বড় ঘোষণা করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রায় ৭২০০টি স্থায়ী পদে নিয়োগের অনুমোদন দিয়েছে রাজ্য মন্ত্রিসভা। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। লক্ষ্য, ২০২৭ সালের এপ্রিলের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করা। পাশাপাশি এক বছরের জন্য আরও ১০০০ জন চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। দীপাবলির পর বিশেষ বিধানসভা অধিবেশনে নিয়োগ সংক্রান্ত নিয়ম সংশোধনের কথাও জানিয়েছেন তিনি।