একটা ছবি, কয়েক লাইন লেখা, রিল, ভিডিয়ো, পডকাস্ট— সবই এখন কনটেন্ট। কিন্তু সবই কি ভাল কনটেন্ট? কত জন ভিডিয়ো শেষ পর্যন্ত দেখল বা শেয়ার করল, তার উপরেই সাফল্য নির্ভর করে। যে কনটেন্ট মানুষকে ভাবায়, হাসায় বা শেয়ার করতে বাধ্য করে, সেটিই সফল। আর পরিকল্পিত ভাবে কনটেন্ট তৈরি, প্রকাশ ও ছড়িয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াই কনটেন্ট ক্রিয়েশন।
আধুনিক প্রজন্ম এখন বুঁদ সেই কনটেন্ট ক্রিয়েশনের দুনিয়ায়। এটাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন অনেকে। বাজেটে কেন্দ্র সরকারও এই সেক্টরের জন্য ২৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। সরকারি উদ্যোগে ১৫ হাজার মাধ্যমিক স্তরের স্কুল ও ৫০০ কলেজে এভিজিসি কনটেন্ট ক্রিয়েটর ল্যাব তৈরি হচ্ছে, যা বিষয়স্রষ্টা হয়ে উঠতে সাহায্য করবে। মুম্বই, দিল্লির কিছু কলেজে কনটেন্ট ক্রিয়েশন কোর্স করানো হচ্ছে। মিলছে সার্টিফিকেট, ডিগ্রিও। কিন্তু শিখিয়ে-পড়িয়ে কি ভাল স্রষ্টা তৈরি করা যায়?
শুভম চৌধুরী একজন সফল কনটেন্ট ক্রিয়েটর। হাস্যরসই তাঁর মূল কনটেন্ট। তাঁর পেজ বং শর্ট। তাঁর কথায়, “নাচ, গান, ছবি আঁকা এ সব যেমন সৃজনশীল গুণ, তেমনই কনটেন্ট ক্রিয়েশন। কোনও ব্যক্তির মধ্যে নিজস্বতা না থাকলে শুধুই শিখে, কোর্সের পড়া মুখস্থ করে কনটেন্ট ক্রিয়েটর হওয়া যায় না। তবে প্রযুক্তিগত কাজগুলো ছোট থেকে শেখা থাকলে ভবিষ্যতে দক্ষতা বাড়বে।” আর এক কনটেন্ট ক্রিয়েটর অভ্র শঙ্কর রায়, পেশায় বিজ্ঞানী, দুবাইয়ে থাকেন। বলছিলেন, “ছোট থেকে নাটক করতাম। পরিচালনার কাজ করেছি। সেই শখ, চর্চার অভ্যাস থেকে এখানে এসে ভিডিয়ো বানাতে শুরু করি। অনেকেই হয়তো চিত্রনাট্য, পরিচালনা জানেন, কিন্তু ক্যামেরার কাজ জানেন না। সে ক্ষেত্রে কনটেন্ট ক্রিয়েশন শেখানোর উদ্যোগ ভাল।” তবে এ ক্ষেত্রে নিজস্বতা হারিয়ে এক ধাঁচে সকলে কাজ করবেন, সে আশঙ্কাও রয়েছে।
ভাল বিষয় বানাতে গেলে
শুভম বলছেন, “প্রথমেই ঠিক করতে হবে ‘টার্গেট অডিয়েন্স’ কারা। তার উপরেই নির্ভর করে বিজ্ঞাপন আসা, অর্থ রোজগারের বিষয়টি।” ১৮ বছরের বাচ্চার জন্য যে বিষয়, ৪০ বছরের কর্মজীবী মানুষের ক্ষেত্রে তা একই রকম না-ও হতে পারে। দ্বিতীয় ধাপে কনটেন্ট পিলার। ফ্যাশন, বিনিয়োগ, কমেডি নাকি রেসিপি, ঘুরতে যাওয়ার ঠিকানা... ভিউয়ার্স ও ফলোয়ার্সকে কী পরিবেশন করতে চান, তা আগে ভেবে নিতে হবে।
বিষয় সৃষ্টির টুকিটাকি
- শর্ট-ফর্ম ভিডিয়োর ক্ষেত্রে প্রথম কয়েক সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ। সে সময়টাই ঠিক করে দেয় দর্শক দেখবেন নাকি স্ক্রল করে চলে যাবেন। এই কাজটা করে ‘হুক’। ভাল হুক আগ্রহ তৈরি করে।
- স্বতঃস্ফূর্ত হোন, কিন্তু পরিকল্পনাহীন নয়। ‘কী বলবেন’ আগে ভেবে নিন।
- তথ্যের ভারে ভারাক্রান্ত না করে বরং গল্প বলুন। তা দর্শক ধরে রাখে।
- থাম্বনেল, ক্লিকবেট বা প্রচ্ছদ উপস্থাপনা যেন কৌতূহল বাড়ায়।
- সামগ্রিক দৃশ্যভাষা, কথা বলার ধরনে নিজস্ব পরিচিতি তৈরি করুন।
অনুগামী বাড়াতে
- নিয়মিত পোস্ট করুন। দু’-একটি ভাইরাল ভিডিয়োর চেয়ে ধারাবাহিক ভাল কনটেন্ট দরকার।
- দর্শকের মন্তব্যের উত্তর দিন, মতামত চান। সেখান থেকে পরের কনটেন্টের বিষয় খুঁজুন।
- ‘কল টু অ্যাকশন’ দিন। তাতে পরের ভিডিয়োর জন্য দর্শকের আগ্রহ থাকবে।
- চলতি ট্রেন্ড কাজে লাগান কিন্তু স্বকীয়তা, অরিজিনালিটি বজায় রাখুন।
- তথ্যপূর্ণ, বিনোদনমূলক কনটেন্ট মানুষ বেশি শেয়ার করে। রোজকার জীবনের সঙ্গে মিলে যায় এমন বিষয় রিচ বাড়ায়।
ফলোয়ার্স, সাবস্ক্রাইবার, রিচ প্রয়োজন হলেও আর্থিক ব্যাপারটি সম্পূর্ণ ভাবে তার উপরে নির্ভরশীল নয়। “দশ হাজার ফলোয়ার্স যার তার চেয়ে হাজার অনুরাগী থাকা বিষয় স্রষ্টার রোজগার বেশি হতে পারে। তাই বুুস্ট করে বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। বরং অর্গ্যানিক দর্শকই আসল সম্পদ,” বলছেন অভ্র।
টাকাপয়সার হিসেবনিকেশ
আয় নির্ভর করে ব্র্যান্ডিং ও বিজ্ঞাপনের উপরে। কোনও ক্রিয়েটরের কনটেন্ট নিয়মিত ভাল দর্শক টানলে বিভিন্ন সংস্থা তাঁদের পণ্য বা পরিষেবার প্রচারের জন্য যোগাযোগ করে। ডিজিটাল ফরেন্সিক ইনভেস্টিগেটর পার্থপ্রতিম মুখোপাধ্যায় বলছেন, “অর্থনীতি, বিনিয়োগ, ব্যবসা এ সব কনটেন্টে আয় বেশি হয়। লাইফস্টাইল, ফ্যাশনে বিজ্ঞাপনের সংখ্যা এবং সুযোগ বেশি। ভ্রমণ বা কমেডি মানুষ দেখতে পছন্দ করে। ফলে সে কনটেন্টেও দর্শক ভাল হয়।” তা ছাড়া, ট্রেন্ডিং যে কোনও সমস্যা নিয়ে কনটেন্ট বানালে রিচ বাড়ে।
দরকারি গ্যাজেটস
ভাল কনটেন্ট ক্রিয়েটর হতে দামি ক্যামেরার প্রয়োজন নেই। ভাল স্মার্টফোন, ওয়্যারলেস মাইক্রোফোন দিয়েই শুরু করা যায়। ফোরকে ভিডিয়ো, অটোফোকাস ও স্টেবিলাইজেশন-যুক্ত ফোন হলে শুটিংয়ের মান ভাল হয়। ট্রাভেল ভ্লগিংয়ে ৩৬০ ডিগ্রি ক্যামেরা ব্যবহার করতে পারেন। তা ছাড়া—
- ব্লুটুথ ক্যামেরা রিমোট: সোলো শুটিংয়ের জন্য ভাল। দূর থেকে রেকর্ডিং নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
- স্মার্ট গিম্বল: ক্রিয়েটর নড়াচড়া করলে ক্যামেরাও নিজে নড়ে তাঁকে ফ্রেমে রাখতে পারে।
- টেলিপ্রম্পটার: স্ক্রিপ্ট মুখস্থ না করেও ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে সাবলীল ভাবে কথা বলা যায়।
অভ্রর মতে, “শুরুতে বড় বিনিয়োগের চেয়ে ভাল ফোন, পরিষ্কার অডিয়ো, ঠিকঠাক আলো ইত্যাদিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।” আজকাল কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের কথা মাথায় রেখে বেশ কিছু সংস্থা বিশেষ সুবিধেযুক্ত স্মার্টফোন বাজারে আনছে, যেখানে টেলিপ্রম্পটার, এআই অটো-ট্র্যাকিং ক্যামেরা সুবিধা থাকে।
এই কি ভবিষ্যৎ?
অরেঞ্জ ইকোনমির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েশন। সরকারি আশা, ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, চাকরি, ব্যবসার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে কনটেন্ট ক্রিয়েশন। এই কোর্স করা থাকলে বাইরের দেশেও কাজের সুযোগ বাড়বে। তবে ভার্চুয়াল দুনিয়ার অস্তিত্ব যে কোনও মুহূর্তে সঙ্কটের মুখে পড়তে পারে, আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সমাজতত্ত্ববিদ অনিরুদ্ধ চৌধুরী। তাঁর কথায়, “অল্পবয়সিদের এই পেশাকেই ভবিষ্যৎ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বরং একে ভিত্তি করে অন্য পেশার কথা ভাবতে হবে।”
খেয়াল রাখবেন
চ্যানেলের নাম, নিজস্ব ধরন থাকলে তার কপিরাইট নিয়ে রাখুন। কনটেন্ট ক্রিয়েশন থেকে আয় হলে ট্যাক্স ফাইলে তা দেখানো জরুরি। ফ্যাশন বা বিনিয়োগের কনটেন্টে আয় আলাদা, সেই বিষয়টিও উল্লেখ রাখতে হবে। একাধিক ব্যক্তি মিলে যদি চ্যানেল বা পেজ খোলেন, সে ক্ষেত্রে মৌখিক কথায় আস্থা না রেখে মালিকানার আইনি কাগজপত্র বানিয়ে রাখা ভাল।
কনটেন্ট শুধু ‘কী বলছি’ নয়, কী ভাবে বলছি সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের দায়িত্ব অনেকটা। সমাজ তাঁদের দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই কী দেখাচ্ছেন, তার সত্যতা নজরে রাখা জরুরি।