পোষ্যকে নিজের সন্তানের মতোই দেখে আধুনিক মানব। নাওয়ায়, খাওয়ায়, ঘুম পাড়ায়, আদর করে, গল্পও করে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, আধুনিক মানব একা তা করে না। এই প্রবণতা রয়েছে বানর জাতীয় সব স্তন্যপায়ীরই। আধুনিক মানবের মধ্যে সম্ভবত উত্তরাধিকার সূত্রেই পোষ্য রাখার এই প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
উগান্ডার জঙ্গলে দু’টি ছোট শিম্পাঞ্জিকে বহু দিন ধরে পর্যবেক্ষণ করছিল বিজ্ঞানীদের একটি দল। তাদের নাম ছিল ইশে এবং ডেম্বে। এক দিন বিজ্ঞানীরা দেখেন, দু’টি শিম্পাঞ্জি যখন গাছের ডালে ঝুলে খেলা করছিল, তখন তাদের কাছে গিয়ে দাঁড়ায় একটি রেড-টেলড হনুমান। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা ছিল, ওই হনুমানকে হয়তো মারধর করবে ইশে-ডেম্বে। কিন্তু তারা তা করেনি। উল্টে বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করে ছোট প্রাণীটিকে আদর করতে শুরু করে তারা। গবেষণার পরে বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন, শুধু মানুষ নয়, বানর জাতীয় সব স্তন্যপায়ীর মধ্যেই পোষ্য রাখার একটি প্রবণতা রয়েছে। সেই সংক্রান্ত গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে ‘জার্নাল প্রাইমেটস’-এ।
বিজ্ঞানীদের মতে, আধুনিক মানবের পোষ্য রাখার এই যে প্রবণতা, তা আদতে ছিল তাদের পূর্বসূরিরও। পোষ্যকে খাওয়ানো হয়, পরিচর্যা করা হয়, বদলে তার থেকে মালিক কী পান? এই প্রশ্ন বিজ্ঞানীদের ভাবিয়েছিল। সেই নিয়ে নানা গবেষণা হয়েছে। তাতে দেখা গিয়েছে, কিছু প্রাণীকে পোষ্য রাখা হয় সঙ্গী হিসাবে। কিছু মানুষ সামাজিক মর্যাদা পেতে পোষ্য রাখেন। কেউ আবার পোষ্য রাখেন কোনও কাজের জন্য। অভিনেতা নিকোলাস কেজের দু’মাথাওয়ালা একটি সাপ ছিল। ড্রাগ মাফিয়া পাবলো এস্কোবারের ছিল আস্ত চিড়িয়াখানা। গবেষণা বলছে, পোষ্য রাখার প্রবণতা আধুনিক মানুষের জিনে রয়েছে।
আরও পড়ুন:
ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট অফ অ্যানিম্যান বিহেভিয়ারের গবেষক জ়ো গোল্ডসবরোর মতে, ‘‘অতীত কালে পোষ্য রাখা হত শিকার ধরায় সাহায্য করার জন্য, আত্মরক্ষার জন্য। তা ছাড়া মানুষের প্রবণতা হল জীবিত প্রাণীর দেখভাল করা।’’
১৪ হাজার বছর আগে জার্মানিতে একটি কবর থেকে এক স্ত্রী এবং এক পুরষের দেহাবশেষের সঙ্গে তাঁদের কুকুরের দেহাবশেষও উদ্ধার হয়েছে। মনে করা হয়, প্রিয় পোষ্যের সঙ্গে সমাধিস্থ করা হয়েছিল তাদের। তবে বিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, তারও বহু বছর আগে আধুনিক মানব পোষ্য রাখত। ওয়েস্টার্ন ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্ববিদ হাল হারজ়গের মতে, ঠিক কবে থেকে আধুনিক মানব বা তার পূর্বসূরিরা পোষ্য রাখতে শুরু করেছিল, তার প্রমাণ খাতায়কলমে এখনও উদ্ধার করা যায়নি।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী সিরিল গ্রুয়েটার শাংহাইয়ের একটি চিড়িয়াখানায় গিয়ে দেখেছিলেন, একটি ছোট্ট ইঁদুরকে খপাৎ করে ধরে নিয়ে আদর করছে এক স্ত্রী উল্লুক। ইঁদুরটিও নির্ভয়ে আদর খাচ্ছে। সেই দৃশ্য দেখে গ্রুয়েটারের কাছে কিছুটা স্পষ্ট হয় যে, কেন মানুষ বাড়িতে লোমশ জীব পোষে। তার পরেই গ্রুয়েটার এবং তাঁর সহকর্মীরা ৮৮টি বানর জাতীয় প্রাণীর উপর পরীক্ষানিরীক্ষা করেন। তাতে সকলের মধ্যেই পোষ্য রাখার কোনও না কোনও প্রবণতা লক্ষ্য করেন বিজ্ঞানীরা।
একটি ক্ষেত্রে দেখা যায়, এক বানরের খাঁচায় একটি মুরগি ঢুকে পড়েছিল। তাকে রীতিমতো যত্ন করে লালন করতে থাকে সেই বানর। মাসের পর মাস তা করে গিয়েছিল বানরটি। গ্রুয়েটারেরা দেখেন, খাঁচা হোক বা জঙ্গল, সব জায়গায় বসবাসকারী বানর শ্রেণির প্রাণীর মধ্যেই পোষ্য রাখার প্রবণতা রয়েছে। এমনকি, টিকটিকি, পাখি, কাঠবিড়ালিকেও আদরযত্ন করে কাছে রেখে দিতে দেখা গিয়েছে বানরদের। শিশু প্রাণীদের তাদের সঙ্গে খেলতে দেখা গিয়েছে। আর পরিণত স্ত্রী প্রাণীদের ওই জীবগুলিতে লালন করতে দেখেছেন বিজ্ঞানীরা। তবে কিছু পুরুষ বানর আবার অন্য ধরনের কোনও প্রাণী দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে, তা-ও লক্ষ্য করেছেন গবেষকেরা। তবে বেশির ভাগ বানরই অন্য প্রাণীকে পেয়ে লালন করার চেষ্টা করেছে। গ্রুয়েটারের মতে, একাকিত্ব মেটাতেই তারা সেই পদক্ষেপ করেছে। আর তা করে চলেছে আদিম কাল থেকে। কত হাজার বা লক্ষ বছর ধরে তা করে চলেছে, তা এখনও জেনে উঠতে পারেননি বিজ্ঞানীরা।