পৃথিবীর পড়শি গ্রহ মঙ্গলকে নিয়ে বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের শেষ নেই। সেখানে একসময় জলের অস্তিত্ব ছিল, আগেই তার প্রমাণ মিলেছে। কিন্তু জলের সঙ্গে সঙ্গে প্রাণও কি ছিল লালগ্রহে? বিজ্ঞানীরা তার খোঁজে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন। তেমনই এক গবেষণায় নতুন তথ্য উঠে এল মঙ্গলের লালমাটি থেকে। বিজ্ঞানীরা জানতে পারলেন, মঙ্গল গ্রহের একদিক আসলে উল্টোদিকের চেয়ে অনেক বেশি গরম। বাইরে থেকে নয়, একেবারে ‘অন্তর’ থেকে।
আমেরিকার আরিজ়োনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আলেকজ়ান্ডার বার্ন মঙ্গলের ভূত্বকীয় বিভাজন নিয়ে সম্প্রতি একটি গবেষণা করেছেন। নেচার পত্রিকায় তার ফল প্রকাশিত হয়েছে গত ২৭ অগস্ট। বার্ন গবেষণাপত্রে জানিয়েছেন, জোয়ার-ভাটা সংক্রান্ত টোমোগ্রাফি মঙ্গলগ্রহের ভূত্বকীয় বিভাজনের নীচে একটি তাপীয় অসঙ্গতি চিহ্নিত করেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, মঙ্গলের দক্ষিণ গোলার্ধটি ভিতর থেকে উত্তরের চেয়ে অনেক বেশি উষ্ণ। ভূত্বকের নীচে দক্ষিণাংশের উষ্ণতা উত্তরের চেয়ে প্রায় ২০০ থেকে ৪০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। এমনকি, দক্ষিণ গোলার্ধের গভীরে কোনও কোনও প্রকোষ্ঠে এখনও গলিত অবস্থায় থাকতে পারে উষ্ণ শিলা।
আরও পড়ুন:
মঙ্গলের দক্ষিণ গোলার্ধের সঙ্গে উত্তর গোলার্ধের বাহ্যিক তারতম্য বরাবরই অনেক বেশি। দক্ষিণে রয়েছে উঁচু উঁচু পর্বতমালা, সুগভীর প্রাচীন গর্ত এবং গিরিখাত। কিন্তু উত্তরাংশে সে সব দেখা যায় না। গ্রহটির উত্তর গোলার্ধে রয়েছে নিচু সমভূমি। কী কারণে দুই গোলার্ধের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যে এত তারতম্য, বিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই তা নিয়ে ধন্দে ছিলেন। নানা জনে নানা রকম ব্যাখ্যা দিয়েছেন বার বার। কিন্তু সর্বজনগ্রাহ্য কোনও ব্যাখ্যা এখনও মেলেনি। এ বার ভূত্বকের অভ্যন্তরেও দুই গোলার্ধের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য পরিলক্ষিত হল। দু’দিকের তাপমাত্রায় যে এত বেশি ফারাক, বিজ্ঞানীরা তা কল্পনা করতে পারেননি।
মঙ্গলের দুই গোলার্ধের তাপীয় তারতম্য ধরতে একটি মডেল প্রস্তুত করেছিলেন বার্ন। তা মহাকর্ষীয় পরিবর্তনের ক্ষুদ্র তথ্যগুলি থেকে গ্রহের অভ্যন্তরের চিত্র প্রতিফলিত করতে পারে। মঙ্গলগ্রহের বিভিন্ন অভিযান থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তিনি এই মডেলে প্রয়োগ করেন। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, মঙ্গলের কক্ষপথ কিছুটা উপবৃত্তাকার। অক্ষও এক দিকে হেলানো। তাই এই গ্রহের উপর সূর্যের মহাকর্ষীয় টান সময়বিশেষে পরিবর্তিত হয়। তার প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণের জন্য টাইডাল টোমোগ্রাফি নামক বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করেন বার্ন। তার মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠের গভীরের ঘটনাও স্পষ্ট হয়েছে। বার্নের কথায়, ‘‘ধরে নেওয়া হয় গ্রহগুলির অভ্যন্তর ভাগ গোলাকার ভাবে প্রতিসম। কিন্তু সবসময় তা হয় না। এ ক্ষেত্রে মহাকর্ষীয় তথ্য যত বেশি পাওয়া যাবে, গ্রহের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর জট তত সহজে কাটবে।’’
আরও পড়ুন:
দুই গোলার্ধের উষ্ণতার তারতম্য মঙ্গলের আরও এমন কিছু রহস্যের উত্তর দিচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে যা বিজ্ঞানীদের কাছে জটিল ধাঁধা হয়ে রয়েছে। এই গ্রহের দক্ষিণের ভূত্বকে প্রাপ্ত লৌহ খনিজগুলিতে অদ্ভুত এক ধরনের চৌম্বকীয় নকশা দেখা যায়। বিজ্ঞানীদের কাছে এত দিন এর কোনও ব্যাখ্যা ছিল না। কিন্তু দক্ষিণ গোলার্ধের অতিরিক্ত তাপমাত্রার কথা প্রকাশ্যে আসার পর ওই নকশার ব্যাখ্যা দিচ্ছেন কেউ কেউ। তাঁদের মতে, দক্ষিণের ম্যান্টলের উষ্ণ অঞ্চল প্রাচীন চৌম্বকক্ষেত্রকে শক্তিশালী করে তুলতে পারে। এ ছাড়া, নাসার ইনসাইট ল্যান্ডার এর আগে আবিষ্কার করেছিল, মঙ্গলের ভূকম্পীয় তরঙ্গগুলি উত্তর গোলার্ধের চেয়ে দক্ষিণ গোলার্ধ দিয়ে যাওয়ার সময় দ্রুত শক্তি হারিয়ে ফেলে। কেন? তার ব্যাখ্যা এত দিন ছিল না। এখন বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, দক্ষিণের উষ্ণতার কারণে ভূকম্পীয় তরঙ্গে ওই প্রভাব পড়তে পারে।
কেন দক্ষিণ দিকটি এত উষ্ণ হল? বিজ্ঞানীরা সে বিষয়ে একমত হতে পারেননি। কেউ বলছেন, এর নেপথ্যে থাকতে পারে অতীতের বড়সড় কোনও সংঘর্ষ। তার ফলে উত্তরে যে তাপের বিস্ফোরণ ঘটেছিল, পরোক্ষে তা দক্ষিণকেও উত্তপ্ত করে তোলে। ভিন্ন মত অনুসারে, মঙ্গলের দক্ষিণ ম্যান্টলের অভ্যন্তরে প্রাচীন এমন কোনও প্রক্রিয়া সক্রিয়, যা তাপকে উপরের দিকে তুলে এনে আটকে রাখছে। সেখান থেকে আর তাপ বেরিয়ে আসতে পারছে না। কেউ কেউ আবার মনে করেন, মঙ্গলের দক্ষিণাংশের পুরু ভূপৃষ্ঠীয় বৈশিষ্ট্য কোটি কোটি বছর ধরে তাপকে আটকে রেখেছে। তাই পৃথিবীর অন্যত্র যে পদ্ধতিতে শীতল হয়েছিল, মঙ্গলে তা ঘটেনি। এ ক্ষেত্রে কোন ব্যাখ্যাটি গ্রহণযোগ্য, এখনও স্পষ্ট নয়।