Advertisement
E-Paper

এত কাদা কোথা থেকে এল হিমবাহ ভেঙে নামা প্রবল স্রোতে? নেপাল বিপর্যয়ের এই রহস্য লুকিয়ে তিব্বতের সেই উৎসেই

নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে লাংটাং হিমল পর্বতমালার লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের উত্তরে বিপর্যয়ের উৎপত্তি। প্রায় ৫২০০ মিটার উচ্চতায় ছিল হিমবাহটি। তা ভেঙে আছড়ে পড়ে ১২০০ মিটার নীচে।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ৩১ অগস্ট ২০২৬ ০৮:৫৬
থিকথিকে কাদায় ঢেকে ভোটেকোশী উপত্যকা। নেপালে হড়পা বানের পর।

থিকথিকে কাদায় ঢেকে ভোটেকোশী উপত্যকা। নেপালে হড়পা বানের পর। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

শুধু জল নয়, তার সঙ্গে মিশে আছে বিপুল কাদা, মাটি আর পাথরের ছোটবড় চাঁই। প্রবল শক্তিতে গর্জন করতে করতে তা ছুটে আসছে লোকালয়ের দিকে। যেন সাক্ষাৎ মৃত্যুর প্রতিরূপ! তার হাত থেকে নিস্তার নেই!

নেপালের ত্রিশূলী ও ভোটেকোশী নদীতে হড়পা বানের ফলে এমনই সর্বগ্রাসী স্রোত তৈরি হয়েছিল হিমালয়ের উপত্যকায়। বিপর্যয়ের পর মৃত্যুমিছিল অব্যাহত। মাটি খুঁড়ে, কাদার স্তূপ সরিয়ে চলছে উদ্ধারকাজ। কিন্তু বিজ্ঞানীদের ভাবাচ্ছে এই বিপর্যয়ের উৎস। কী থেকে এত বিধ্বংসী হড়পা বানের সৃষ্টি হল, সেই উত্তর মিলেছে। পাহাড়ের মধ্যে বিশাল এক হিমবাহ ভেঙে পড়ায় জল উপচে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছে লোকালয়। তবে সেখানেও প্রশ্ন, এত কাদা কেন? হিমালয়ের চিরতুষারাবৃত শৃঙ্গের বরফে এত কর্দমাক্ত মাটি এল কোথা থেকে?

কাদায় ঢেকে নেপালের সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা।

কাদায় ঢেকে নেপালের সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে লাংটাং হিমল পর্বতমালার লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের উত্তরে বিপর্যয়ের উৎপত্তি। প্রায় ৫২০০ মিটার উচ্চতায় ছিল হিমবাহটি। তা ভেঙে আছড়ে পড়ে ১২০০ মিটার নীচে। সেই ধাক্কায় জল এত বিধ্বংসী হয়ে উঠেছিল। বরফের চাঁই ভেঙে পড়ায় তীব্র ভূমিকম্প অনুভূত হয় পাহাড়ি এলাকায়। রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা ছিল ৫.২। বিশেষজ্ঞেরা প্রথমে মনে করেছিলেন, পাহাড়ের নীচে মহাদেশীয় পাতের গতিবিধিতেই হয়তো ভূমিকম্প হয়েছে। তার জেরে নদীর জল ফুলে উঠে হড়পা বানের উৎপত্তি। কিন্তু পরে ধীরে ধীরে ছবিটা স্পষ্ট হয় আরও।

নেপালের হড়পা বানে প্রবল কাদামাটির রহস্য কিন্তু লুকিয়ে অন্য জায়গায়। সর্বগ্রাসী নদী পাহাড়ের ঢাল বরাবর যত এগিয়েছে, উপত্যকা কাঁচিয়ে পলি, বালি, আলগা কাদা এবং পাথরের টুকরো উদরস্থ করেছে। কিন্তু যে পরিমাণ কাদামাটির স্রোত ভোটেকোশীর জলে দেখা গিয়েছে, তা শুধু উপত্যকা থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। বিজ্ঞানীরা এর অন্য রহস্যও উন্মোচন করেছেন। নিউ ইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-পদার্থবিদ গোরান একস্ট্রম জানান, হিমবাহটির গোড়াতেই প্রচুর কাদামাটি ছিল। তা গলে যাওয়ায় বরফের চাঁই ভেঙেছে।

হিমালয়ের বুকে এই হিমবাহ ভেঙেই বিপত্তি নেপালে।

হিমালয়ের বুকে এই হিমবাহ ভেঙেই বিপত্তি নেপালে।

তুষারাবৃত হিমালয়ের বুকে কোথাও কোথাও হিমায়িত অবস্থায় মাটি বা শিলার পুরু স্তর থাকে। টানা দু’বছর বা তার বেশি সময় ধরে বরফের সঙ্গে জমাট বেঁধে থাকলে ওই স্তরকে ভূবিজ্ঞানের উপভাষায় বলে ‘পার্মাফ্রস্ট’। মাটির মধ্যে জমে থাকা বরফের এই শক্ত স্তর নেপালের হড়পা বানের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল, মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। কোলোরাডো বোল্ডার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-বিজ্ঞানী অ্যাল্টন বায়ার্স বলেন, ‘‘হিমবাহটি যে পার্মাফ্রস্টের উপর ছিল, তা গলে যাওয়ায় বরফের আস্ত চাঁই নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল। পার্মাফ্রস্টের পরিবর্তন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পর্বত এবং বরফের কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়। এর ফলে ব্যাপক ধস নামতে পারে।’’ শুধু ধস নয়, এর থেকে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার সূচনা হয় বলে মনে করেন বায়ার্স। তা উপত্যকার নিচু এলাকায় ধ্বংসলীলার কারণ হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছে।

কী থেকে কখন কী ঘটেছে, সেই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার ছবি ধরা পড়েছে উপগ্রহচিত্রে। চিন থেকে প্রাপ্ত উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে নেপাল সরকার জানিয়েছে, হিমবাহ ধসের কারণে তিব্বতের গিরং কাউন্টি থেকে উৎপন্ন লেন্দে খোলা নদী প্রথমে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। ফলে সেখানে একটি অস্থায়ী হ্রদ তৈরি হয়ে যায় এবং কিছুক্ষণের মধ্যে জলের চাপে তা ফেটে যায়। লেন্দে খোলা নদীই পরে ভোটেকোশী এবং ত্রিশূলীতে এসে মিশেছে। ফলে জলের সম্পূর্ণ চাপ গিয়ে পড়ে ওই দুই নদী এবং তাদের অববাহিকায়। নেপালের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে, ধাদিং জেলার কাছে ত্রিশূলী নদীর জলস্তর ৩০ মিনিটে ন’মিটার পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল।

হড়পা বানের কাদামাটির স্রোতে খড়কুটোর মতো ভেসে গিয়েছে ঘরবাড়ি।

হড়পা বানের কাদামাটির স্রোতে খড়কুটোর মতো ভেসে গিয়েছে ঘরবাড়ি।

উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে প্রাকৃতিক কোনও হ্রদ আচমকা ফেটে যাওয়া এবং তার ফলে বন্যা নতুন কিছু নয়। বিজ্ঞানীদের দাবি, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই ধরনের হ্রদ এবং হিমবাহের নীচে পার্মাফ্রস্টের পরিমাণ আগের চেয়ে বেড়ে গিয়েছে। হিমালয়ের পাশাপাশি দক্ষিণ আমেরিকার আন্দেস কিংবা ইউরোপের আলপ্‌সেও আগামী দিনে এই বিপর্যয় নামতে পারে। এই মুহূর্তে সারা বিশ্বে অন্তত দেড় কোটি মানুষ হিমবাহ হ্রদের ফলে সৃষ্ট বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছেন। তবে তিব্বতের শৃঙ্গে বরফধসের আগের অবস্থার কোনও উপগ্রহচিত্রে অস্থায়ী হ্রদ ধরা পড়়েনি। এলাকায় বৃষ্টির তেমন কোনও পূর্বাভাসও ছিল না। বায়ার্সের মতে, এই ধরনের ঘটনা আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব নয়। বিশ্ব উষ্ণায়নের কতটা প্রভাব এর উপর ছিল, তা-ও এখনও স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে আরও বিশদে গবেষণা প্রয়োজন।

কাদামাটি থেকে টেনে তোলার চেষ্টা।

কাদামাটি থেকে টেনে তোলার চেষ্টা।

কী ভাবে এমন বিপর্যয় ঠেকানো যায়? বিজ্ঞানীরা সে বিষয়ে কার্যত সকলেই একমত। হিমবাহের নীচে এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলি চিহ্নিত করে সেখানে ব্যবসায়িক বিনিয়োগ বন্ধ করতে হবে। ভোটেকোশীর ধারে যেখানে বিপর্যয়টি ঘটেছে, সেখানে আদৌ লোকালয় গড়ে ওঠার কথা নয়। পাশাপাশি দুর্গম পাহাড়ে হিমবাহগুলির গতিপ্রকৃতির দিকেও নজর রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিজ্ঞানীদের একাংশ।

সব ছবি: রয়টার্স এবং পিটিআই।

সংক্ষেপে
  • ত্রাণ যেমন পাঠানো হচ্ছে, তেমনই আর্থিক সাহায্যও পাঠানো হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে।
  • বিপর্যস্ত নেপালকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসছে অনেকেই। বিভিন্ন সংস্থা তো বটেই, ব্যক্তিবিশেষও সাহায্য পাঠাচ্ছেন নেপালে।
  • হড়পা বানে বিপর্যস্ত নেপালে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ল। এখনও নিখোঁজ দেড় হাজারের বেশি মানুষ।
Flash flood Nepal Rescue Operation Kathmandu Tibet

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy