Advertisement
E-Paper

আন্টার্কটিকা থেকে গলগল করে সমুদ্রে মিশছে বিষাক্ত ধাতু! বরফে বিষ আসছে কোথা থেকে? উৎস জেনে বিস্মিত বিজ্ঞানীরা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) যে সমস্ত রাসায়নিককে মানুষের স্বাস্থ্যের পক্ষে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ তকমা দিয়েছে, তার প্রথম দশের তালিকায় রয়েছে এই ধাতু। বরফ থেকে তা সমুদ্রের জলে মিশছে।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১৪ অগস্ট ২০২৬ ০৯:০৩
আন্টার্কটিকার বরফে মিশে যাচ্ছে বিষাক্ত ধাতু, বরফ গলে তা মিশছে সমুদ্রের জলেও!

আন্টার্কটিকার বরফে মিশে যাচ্ছে বিষাক্ত ধাতু, বরফ গলে তা মিশছে সমুদ্রের জলেও! ছবি: শাটারস্টক।

পৃথিবীতে মানবসভ্যতা যত এগিয়েছে, তত বিপন্ন হয়েছে বরফাবৃত মহাদেশ আন্টার্কটিকা। শিল্পায়ন, আধুনিকতার সামনে জনশূন্য ভূখণ্ডটি ধাক্কা খেয়েছে বার বার। বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে আন্টার্কটিকার বরফ গলতে শুরু করেছে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তবে এ বার পৃথিবীর সর্ব দক্ষিণের এই প্রকাণ্ড মহাদেশ অন্য এক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াল। বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, আন্টার্কটিকা থেকে বিষাক্ত ধাতু ক্রমাগত মিশে চলেছে সমুদ্রে। অচিরেই যার প্রভাব পড়তে পারে মানবসভ্যতার উপর।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) যে সমস্ত রাসায়নিককে মানুষের স্বাস্থ্যের পক্ষে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ তকমা দিয়েছে, তার প্রথম দশের তালিকায় রয়েছে পারদ। সামান্য মাত্রাতেও এটি বিষাক্ত। আন্টার্কটিকার বরফ গলে দিনের পর দিন সেই পারদই মিশে চলেছে সমুদ্রে!

সাধারণ ভাবে আগ্নেয়গিরি থেকে এবং কিছু ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে পারদ পরিবেশে মেশে। তবে সেই পরিমাণ তেমন উদ্বেগের নয়। বিজ্ঞানীদের দাবি, শিল্পের প্রয়োজনে আরও বেশি করে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, মাটিতে খননকার্যের ফলে পরিবেশে পারদের মাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গিয়েছে। তাতেই ঘনিয়েছে বিপদ। এখানে অবশ্য আগেই মানব সভ্যতার ত্রাতা হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্টার্কটিকা। বছরের পর বছর ধরে এই মহাদেশের বরফ ‘পারদ শোষক’ হিসেবে কাজ করে আসছে। অর্থাৎ, পরিবেশ থেকে পারদ শুষে নেয় আন্টার্কটিকা। তার বরফে আটকে থাকে বিপুল পরিমাণ পারদ-দূষণ!

কিন্তু সমস্যা অন্যত্র। যে সমস্ত ভারী শিল্পের কারণে পরিবেশে পারদ নির্গত হচ্ছে, সেগুলিই আবার গ্রিনহাউস গ্যাসও উৎপন্ন করছে। ফলে বায়ুমণ্ডলে এই ধরনের গ্যাসের পরিমাণ বাড়ছে। আর এই সমস্ত বিষাক্ত গ্যাস আন্টার্কটিকার বরফ গলিয়ে দিচ্ছে। অর্থাৎ, যে বরফরাশি শিল্পে উৎপন্ন পারদ শোষণ করে দূষণ আটকাচ্ছে, সেই বরফই গলে যাচ্ছে সেই শিল্প ও বায়ুদূষণের কারণে। ফলে বরফের পারদ শোষণে হিতে বিপরীত হচ্ছে। সম্প্রতি আন্টার্কটিকায় এই সমীকরণই চোখে পড়েছে বিজ্ঞানীদের।

চিনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি আন্টার্কটিকার বরফ এবং পারদ দূষণ নিয়ে একটি গবেষণা করেছেন। নেতৃত্বে ছিলেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিদ চেংঝেন ঝোউ। ‘প্রসিডিংস অফ দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস’-এ তাঁরা গবেষণার ফল ব্যাখ্যা করেছেন এবং আন্টার্কটিকার পরিস্থিতি বর্ণনা করেছেন। গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে পিএনএএস পত্রিকায়। আন্টার্কটিকার যে অংশের বরফ পরিবেশ দূষণের কারণে সবচেয়ে দ্রুত গলে যাচ্ছে, তাকে বিজ্ঞানীরা আন্টার্কটিক উপদ্বীপ হিসেবে চিহ্নিত করেন। সেখানকার পলির নমুনা বিশ্লেষণ করতে গিয়েই উদ্বেগের কারণ ধরা পড়েছে।

সারা বিশ্বে যেখানে যত পারদ সঞ্চিত হয়, আন্টার্কটিক উপদ্বীপের বরফে তার দ্বিগুণ পরিমাণ পারদ জমে। বিজ্ঞানীদের দাবি, অষ্টাদশ শতকে ইউরোপে শিল্পবিপ্লব হওয়ার পর এই অংশে পারদ সঞ্চয়ের হার ১৬০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল।

পারদ দূষণের দু’টি চক্র পরিবেশে সক্রিয়। এক, বায়ুমণ্ডল থেকে সমুদ্রের জলে পারদ শোষিত হতে পারে এবং সেখান থেকে আবার তা বাতাসে মিশতে পারে। দুই, আন্টার্কটিকার মতো বরফসমৃদ্ধ এলাকায় পারদ বায়ুমণ্ডল থেকে হিমবাহে শোষিত হয়। সেখান থেকে স্থলভাগ হয়ে আবার সমুদ্রে মেশে। ঝোউ গবেষণাপত্রে লিখেছেন, ‘‘এই দুই চক্রের সংযোগের ফলে বরফ গলে স্থলভাগে পারদের নির্গমন ৫৫০ শতাংশ এবং বায়ুমণ্ডল থেকে সমুদ্রে পারদের বিনিময় ৩৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।’’ এ ভাবে আন্টার্কটিকার সুবিশাল পারদের ভান্ডার ধীরে ধীরে দূষণের উৎসে পরিণত হয়েছে।

একটি পুরনো গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, আন্টার্কটিকার বরফে এমন এক ব্যাকটেরিয়া রয়েছে, যা পারদকে শক্তিশালী নিউরোটক্সিন মিথাইল মার্কারিতে পরিণত করতে সক্ষম। এই মৌল সামুদ্রিক প্রাণীদের দেহেও জমা হয়। সেখান থেকে তা আসতে পারে মানুষের দেহে। পারদের এই রূপ নতুন আবিষ্কারকে বিপজ্জনক করে তুলেছে বলে মত বিজ্ঞানীদের। ঝোউ বলেন, ‘‘আন্টার্কটিকায় পারদ দূষণের বর্তমান পরিস্থিতি সেখানকার বাস্তুতন্ত্রেক ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।’’

বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, দক্ষিণের মহাসাগরে প্রাণীদের দেহে পারদের মাত্রা বাড়তে শুরু করেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা আগের রেকর্ডকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। আন্টার্কটিক উপদ্বীপ থেকে স্রোতের মাধ্যমে খোলা সমুদ্রে পারদ নির্গমনের মাত্রা বেড়েছে ৪০০ শতাংশ। এই দূষণ আগামী দিনে আরও দূরের সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়তে পারে, মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

Antarctica Mercury ice Scientific Research

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy