Advertisement
E-Paper

ওভালে হারের পরে প্রশ্ন উঠে গেল যুবরাজ, অশ্বিনের ভবিষ্যৎ নিয়ে

ভারতীয় ক্রিকেট দলে অনেক দিন ধরেই আর একা ক্যাপ্টেন সিদ্ধান্ত নেন না। টিম ম্যানেজমেন্ট বসে ঠিক করে, প্রথম একাদশ কী হবে না হবে বা টসে জিতলে টিম কী করবে। ওভালের ফাইনালেও সে রকমই হয়েছে বলে খবর।

সুমিত ঘোষ

শেষ আপডেট: ২০ জুন ২০১৭ ০৪:২০
পরামর্শ: ভারতীয় ক্রিকেটের দুই মাথা। মহেন্দ্র সিংহ ধোনির মগজ এখনও অস্ত্র বিরাট কোহালির। ফাইল চিত্র

পরামর্শ: ভারতীয় ক্রিকেটের দুই মাথা। মহেন্দ্র সিংহ ধোনির মগজ এখনও অস্ত্র বিরাট কোহালির। ফাইল চিত্র

চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ফাইনালে পাকিস্তানের কাছে বিপর্যস্ত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভারতীয় ক্রিকেটের অন্দরমহলে হারের ময়নাতদন্ত শুরু হয়ে গিয়েছে। আর তাতে দেখা যাচ্ছে, টস জিতে ফিল্ডিং নেওয়া এবং যশপ্রীত বুমরার ‘নো বল’ যদি টার্নিং পয়েন্ট হয়, তা হলে আরও অনেক কিছুই রয়েছে, যা মোটেও ঠিকঠাক চলছে না বিরাট কোহালির দলে। কারও কারও মতে, অবিলম্বে এই খুঁতগুলো মেরামত না করলে কোহালির টিম ইন্ডিয়াকে ভুগতে হবে। কী সেই ভুলগুলো? ফাইনালের পরের দিন খোঁজ করতে বসে যে তালিকা পাওয়া গেল—

টসের সিদ্ধান্ত ও কোচ-কাজিয়া: ভারতীয় ক্রিকেট দলে অনেক দিন ধরেই আর একা ক্যাপ্টেন সিদ্ধান্ত নেন না। টিম ম্যানেজমেন্ট বসে ঠিক করে, প্রথম একাদশ কী হবে না হবে বা টসে জিতলে টিম কী করবে। ওভালের ফাইনালেও সে রকমই হয়েছে বলে খবর। পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে, কোচ এবং অধিনায়কের সম্পর্ক ঠিক না থাকাটা কি টসের সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব ফেলেছে? কারও কারও মনে হচ্ছে, কোহালি বা ধোনি-কোহালি জুটি যদি টসে জিতে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েও থাকেন, তাঁদের জোর দিয়ে বোঝানো উচিত ছিল যে, ভুল হচ্ছে। এবং, সেটা করতে পারতেন একমাত্র কোচ। ঘটনা হচ্ছে, অনিল কুম্বলের সঙ্গে কোহালি-সহ সিনিয়র ক্রিকেটারদের সম্পর্ক এখন এমন জায়গায় রয়েছে যে, টিম মিটিং বা মাঠের প্র্যাকটিসেও সেই খোলামেলা হাওয়া থাকছে না। টসের ক্ষেত্রে কোচ তাই খুব অন্য মত পোষণের জায়গায় ছিলেন কি না, তা-ই নিশ্চিত নয়।

কেন টস জিতে ব্যাটিং করা দরকার ছিল: ক্লাইভ লয়েড রবিবার লাঞ্চের সময়েই বলছিলেন, ফাইনাল মানেই হাইপ্রেশার ম্যাচ। আগেভাগে ব্যাট করে বড় রান চাপিয়ে দাও প্রতিপক্ষের ওপর। সেটাই সঠিক স্ট্র্যাটেজি। এ ছাড়াও দু’তিনটে কারণ রয়েছে। যেমন রবিবার লন্ডনে উপমহাদেশের মতো গরম ছিল। ম্যাচ হারার পরে মার্ক টোয়েনের মতোই হয়তো কোহালি এক দিন বইয়ে লিখবেন, ‘জীবনের শীতলতম দিন আমি কাটিয়েছি লন্ডনের এক গ্রীষ্মে’। যখন কোনও কিছুই ঠিক চলেনি তাঁর। বরং পাকিস্তানের কাছে ১৮০ রানের হারের যন্ত্রণা নিয়ে ফিরতে হয়েছিল। এখানকার চড়া রোদে মানে একেবারে পুড়িয়ে দেবে। কলকাতার মতোই গায়ে জামা রাখা কঠিন হয়ে যায়। প্রথমে পঞ্চাশ ওভার ফিল্ডিংয়ের খাটুনি খেটে ভারতীয় দল এনার্জি শেষ করে ফেলেছিল কি না, সেই প্রশ্নও তাই এখন উঠছে।

বোলিং ভাল হচ্ছে দেখে অতিরিক্ত আত্মতুষ্টি: ভারতীয় বোলিংকেও টিম ম্যানেজমেন্ট অতিরিক্ত নম্বর দিয়ে ফেলেছিল। কারও কারও মন্তব্য, বুমরা-ভুবনেশ্বর কি লিলি-থমসম নাকি যে, আগে বোলিং করে দু’শোর মধ্যে প্রতিপক্ষকে সাবাড় করে দেবে? গোটা টুর্নামেন্টে ভাল বল করেছেন ভারতীয় পেসাররা। সম্ভবত সেটা দেখেই অধিনায়ক কোহালি এবং ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্টের মনে হয়েছিল, পাকিস্তানকে ধরাছোঁয়ার মধ্যে রেখে আমরা রান তাড়া করে দিতে পারব। লয়েডের সঙ্গে অনেকেই একমত যে, এমন শক্তিশালী ব্যাটিং লাইন-আপ নিয়ে কোহালিদের অবশ্যই প্রথমে ব্যাট করা উচিত ছিল। তা হলে জোহানেসবার্গের সেই ফাইনালে সৌরভদের বিরুদ্ধে পন্টিংরা যেমন প্রথমার্ধেই খেলা শেষ করে দিয়েছিলেন, সেটা ওভালে করার ক্ষমতা ছিল ভারতের। উল্টে ওভালের পাটা উইকেট আর ‘নো বল’-এর সুযোগ নিয়ে সেটা করে দিয়ে গেলেন ফখর জমান-রা।

আরও পড়ুন:কোচের যাত্রা নিয়ে ধন্দে থাকল দলই

ধাক্কা: চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ফাইনালে যুবরাজের আউটের মুহূর্ত। ফাইনালে উইকেট পাননি, টুর্নামেন্টেও ব্যর্থ অশ্বিন। ফাইল চিত্র

ভুল প্রথম একাদশ এবং অশ্বিনের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন: ইংল্যান্ডের আবহাওয়ায় কোহালিরা নিজেদের দেশের মতো স্পিনারদের ওপর বেশি ভরসা রেখেছিলেন। যা ওভালের ফাইনালের জন্য মোটেও সঠিক রণনীতি ছিল না। একে তো পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানেরা স্পিন ভাল খেলেন। তাঁদের দেশেও স্পিনের ইতিহাস এবং পরম্পরা যথেষ্ট ভাল। তারা আর ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া এক নয় যে, স্পিন লেলিয়ে দিয়ে ভয় পাইয়ে দেওয়া যাবে। পাকিস্তান কিন্তু ভারতের বিরুদ্ধে পেসকে অস্ত্র করেই নেমেছিল। মহম্মদ আমির আগের ম্যাচে চোটের জন্য খেলতে না পারলেও তাঁকে ফেরানো হয়েছিল এবং আমিরের হাতেই প্রধান বোলারের মুকুট তুলে দেয় টিম। ভারতীয় ব্যাটিংয়ের থ্রি মাস্কেটিয়ার্স রোহিত শর্মা, শিখর ধবন, বিরাট কোহালিকে তুলে নিয়ে আমির সেই আস্থার পূর্ণ মর্যাদা দেন। পাকিস্তান শুধু ব্যাটিং-বোলিংয়ে নয়, স্ট্র্যাটেজিতেও ভারতের চেয়ে এগিয়ে ছিল। আরও গুরুতর প্রশ্ন উঠে পড়েছে রবিবারের পরে যে, অশ্বিন কি আদৌ ওয়ান ডে ক্রিকেটে ভারতের অস্ত্র হতে পারেন? বরং সৌরভ অধিনায়ক থাকার সময় যে ভাবে এখনকার কোচ কুম্বলেকে বাইরে বসতে হতো, অশ্বিনের ভাগ্যেও তা-ই হয়তো লেখা থাকবে ভবিষ্যতের রাস্তায়। ময়নাতদন্তে এটাও উঠে আসছে যে, দুই স্পিনার খেলানো ভুল হয়েছে। এবং, এখন যা পরিস্থিতি, অন্তত বিদেশের মাঠে ওয়ান ডে হলে একমাত্র স্পিনার হিসেবে রবীন্দ্র জাডেজা খেলবেন যে হেতু তিনি ব্যাটও করতে পারেন এবং দারুণ ফিল্ডার। অশ্বিনকে সম্ভবত তাঁর কোচের মতোই বাইরে থাকতে হবে।

মহম্মদ শামিকে না খেলানোর বিস্ময়কর সিদ্ধান্ত: ম্যাচের পরে অনেককে বলতে শোনা গেল, বরাবর পাকিস্তান ম্যাচে এত ভাল বল করেন মহম্মদ শামি। আর তাঁকেই কি না খেলানো হল না। শুধু ফাইনাল বলে নয়, গোটা টুর্নামেন্টে একটাও ম্যাচ খেলেননি শামি। অথচ, সুস্থ থাকলে তিনি যে ভারতীয় পেসারদের মধ্যে সেরা, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ থাকাই উচিত নয়। ২০১৫ বিশ্বকাপের সময় নিউজিল্যান্ডে স্যার রিচার্ড হ্যাডলি যাঁর সুইং এবং সিম বোলিং দেখে অভিভূত হয়ে অভিনন্দন জানিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁকে ইংল্যান্ডের আবহাওয়ায় খেলানোই হল না। শামি বা উমেশ যাদবের কেউ না থাকায় পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানদের আতঙ্কিত করার মতো কোনও এক্সপ্রেস বোলার ভারতের ছিল না। পাকিস্তানের আমির যে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের পেস ও সুইং দিয়ে আক্রমণ করে আতঙ্কিত করে তুলেছিলেন, সেটা করার মতো কেউ ভারতের ছিল না। বুমরা, ভুবনেশ্বর বা হার্দিক পাণ্ড্য সকলেই মিডিয়াম পেসার।

দল নির্বাচনে নীতির অভাব এবং যুবরাজের ভাগ্য নির্ধারণ: যুবরাজ সিংহের বয়স ৩৫। দীনেশ কার্তিক ৩২। মহেন্দ্র সিংহ ধোনি ৩৫। এঁরা কেউ ২০১৯ বিশ্বকাপে খেলার মতো অবস্থায় থাকবেন কি না, জানা নেই। আর দু’বছর পরে সেই বিশ্বকাপ হবে ইংল্যান্ডেই। সেটা মাথায় রেখেও ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে দল গড়ার কোনও ইচ্ছা নেই জাতীয় নির্বাচকদের। এখান থেকে আজ, মঙ্গলবারই কোহালিরা বেরিয়ে যাচ্ছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজে সীমিত ওভারের সিরিজ খেলতে। এমনকী, সেখানেও যুবরাজ, কার্তিকদের রেখে দল গড়া হয়েছে। রোহিত শর্মা এবং বুমরাকে বিশ্রাম দিয়ে নেওয়া হয়েছে ঋষভ পন্থ এবং কুলদীপ যাদবের মতো তরুণকে। কিন্তু এ বার গুরুতর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে যুবরাজকে নিয়ে। তাঁকে আর টেনে কী লাভ হবে? যুবরাজ ব্যাট হাতে প্রথম ম্যাচে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভাল খেলেছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে খারাপ খেলেননি। এ ছাড়া বলার মতো কোনও ইনিংস নেই। ফাইনালে মোক্ষম সময়ে দাঁড়াতে পারলেন না। এখন তিনি আগের মতো পার্টটাইম বোলারের কাজও করতে পারেন না। এক সময়কার দুরন্ত ফিল্ডারকে এখন মাঠে লুকনোর জায়গা খুঁজতে হয়। তেমনই প্রশ্ন উঠছে, দিল্লির ঝোড়ো ক্রিকেটার ঋষভ পন্থ যদি ভবিষ্যতের বাজি হয়, তা হলে আর দীনেশ কার্তিককে ডাকা হচ্ছে কেন? ধোনিকে নিয়ে তা-ও বলা যায় যে, তিনি এখনও দারুণ ফিট। দারুণ উইকেটকিপিং করে যাচ্ছেন। ব্যাট হাতে ঝলক দেখাচ্ছেন। দলের একাধিক কাজে তিনি অবদান রাখেন। তাঁকে ধরে রাখা যেতেই পারে যত দিন পারা যায়। কিন্তু যুবরাজ বা কার্তিকের মতো সিনিয়রদের নির্বাচন ভারতীয় ক্রিকেটকে পিছিয়ে দিচ্ছে বলেই সংখ্যাগরিষ্ঠ পণ্ডিতের মত। ব্যাট হাতে সাংঘাতিক কিছু যদি তিনি করে না দেখাতে পারেন, খুব অবাক হওয়ার থাকবে না যদি ওয়েস্ট ইন্ডিজই যুবরাজের শেষ সফর হয়।

পাক-যুদ্ধে নরম মনোভাব: কোহালি বা তাঁর দলের এমনিতে যে রকম আক্রমণাত্মক শরীরী ভাষা থাকে, সেটা রবিবার মাঠে দেখা যায়নি। বরং চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দু’টো ম্যাচেই দেখা গিয়েছে, ভারতীয়দের বেশ নরমসরম মনোভাব। কী পাক ক্রিকেটারদের প্রশংসা করার ব্যাপারে, কী মাঠে তাঁদের সঙ্গে ব্যবহারে। কোহালিরা ভুল বুঝতে পারেন রবিবার ব্যাট করতে নেমে। আমির যে আমির, যিনি কি না কোহালির প্রতি ভীষণ সশ্রদ্ধ, তিনিও হা রে রে রে করে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আজহার মেহমুদ এই টোটকাটা দিয়েছিলেন পাক বোলারদের। বলেছিলেন, ভারতের অনেকে আমাদের বন্ধু। কিন্তু সেই বন্ধুত্বটা মাঠের বাইরেই রাখো। ভিতরে একদম আগুনে মনোভাব চাই আজ। ম্যাচের পরে ভারতীয় দলের অনেকে তাই বলাবলি করেছেন, বড্ড নরমসরম হয়ে ছিলেন তাঁরা। আরও অনেক আগ্রাসী হওয়া উচিত ছিল। তা হলে পাকিস্তান এতটা মাথায় চড়তে পারত না। কিন্তু হায়, তখন যে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে!

MS Dhoni Virat Kohli Yuvraj Singh Ravichandran Ashwin Failure Pakistan Final চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি Champions Trophy ICC Champions Trophy 2017 Cricket যশপ্রীত বুমরা বিরাট কোহালি

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy