পালাবদলেই পাল্টে গেল স্বাস্থ্য ভবনের অবস্থান! চিকিৎসক অভীক দে-র সম্পর্কে। ছ’মাস আগে তাঁকে ‘নির্দোষ’ বলে ছাড়পত্র দিয়েছিলেন রাজ্যের স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিকর্তা। সোমবার সেই একই অভিযোগ সামনে রেখে অভীকের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন সেই একই পদাধিকারী ইন্দ্রজিৎ সাহা। এ ক্ষেত্রে যিনি ছা়ড়পত্র দিয়েছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধেও তদন্ত হবে না কেন, প্রশ্ন তুলেছে চিকিৎসক সংগঠনগুলি।
আরজি কর কাণ্ডের সময় রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ‘থ্রেট কালচার’-এর অন্যতম হোতা হিসেবে চিকিৎসক অভীক দে-র নাম উঠে এসেছিল। এসএসকেএম হাসপাতালের শল্য চিকিৎসা বিভাগের প্রাক্তন পিজিটি অভীক বর্তমানে সাসপেনশনে রয়েছেন। ‘থ্রেট কালচার’ চালানোর অভিযোগে বিভাগীয় তদন্তের ভিত্তিতে তৃণমূল আমলেই সাসপেন্ড হয়েছিলেন তিনি। তখনই প্রশ্ন উঠেছিল, সার্ভিস কোটায় এসএসকেএম হাসপাতালে পিজিটি হিসেবে কী ভাবে ভর্তি হলেন তিনি? এ নিয়ে কলকাতা হাই কোর্টে জনস্বার্থ মামলা করেছিলেন রৌনক হাজারি নামে এক চিকিৎসক। আদালত স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিকর্তা (ডিএমই) ইন্দ্রজিৎ সাহার কাছ থেকে এ বিষয়ে রিপোর্ট তলব করে। জবাবে চলতি বছরের এপ্রিলে ডিএমই জানান, অভীক দে-র সার্ভিস কোটা পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনও ‘অসঙ্গতি’ নেই।
আরজি কর কাণ্ডের দু’বছর পূর্তির ঠিক পরের দিন সার্ভিস কোটা নিয়ে অভীকের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন ইন্দ্রজিৎ সাহা-ই। স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে বলা হচ্ছে, সার্ভিস কোটায় পিজিটি হিসেবে ভর্তি হতে গেলে গ্রামীণ এলাকায় চিকিৎসা পরিষেবার কাজে যুক্ত থাকতে হয়। অভীক যে নথি জমা করেছেন তাতে দেখা যাচ্ছে, তিনি বর্ধমানে অনাময় হাসপাতালে কাজ করেছেন। কিন্তু স্বাস্থ্য ভবনের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া হলে অনাময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেন, অভীক দে নামে কোনও চিকিৎসক সেখানে কাজ করেননি। এই তথ্যের উপরে ভিত্তি করে গত ৫ অগস্ট অভীকের বিরুদ্ধে তদন্ত করার সুপারিশ করা হয় ভিজিল্যান্স ব্রাঞ্চের তরফে। তার পরেই চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির মাথায় সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ পার্থপ্রতিম প্রধান। অন্য সদস্যেরা হলেন আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ মানস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজের ফরেন্সিক মেডিসিন অ্যান্ড টক্সিকোলজি বিভাগের প্রধান সোমনাথ দাস এবং বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিনের প্রফেসর কৌশিক মিত্র।
রবিবার স্বাস্থ্য ভবনে অভয়া স্মরণে স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়, স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগম, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিকর্তা ইন্দ্রজিৎ সাহা। — নিজস্ব চিত্র।
স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিকর্তা কমিটি তৈরির বিজ্ঞপ্তি জারি করার পরেই তদন্ত নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন চিকিৎসক সংগঠনগুলির নেতারা। এমনকি কমিটির সদস্যেরাও। তাঁদের বক্তব্য, অভীককে অন্যায় ভাবে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাইয়ে দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদেরও তো কাঠগড়ায় তোলা উচিত। কারণ, তাঁদের অগোচরে তো আর অভীকের আবেদন মঞ্জুর হয়নি। স্বাস্থ্য দফতর সূত্রের খবর, সার্ভিস কোটায় ভর্তির সুযোগ পেতে হলে গ্রামীণ, দুর্গম এলাকায় তিন বছর কাজ করতে হয়। বর্ধমানের অনাময় হাসপাতালকে গ্রামীণ হাসপাতাল হিসাবে দেখিয়েছিলেন অভীক। আর দুর্গম পরিস্থিতি হিসেবে কোভিডকালের উল্লেখ করা হয়েছিল। চিকিৎসক সংগঠনগুলির বক্তব্য, অভীক যে অনাময় হাসপাতালে কাজ করেছেন বলে দাবি করেছিলেন, সেটি পঞ্চায়েত এলাকায় অবস্থিত হলেও গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বলতে যা বোঝায়, তা নয়। আর কোভিডকালকে ‘দুর্গম পরিস্থিতি’ বলা চলে কি না, তা তর্কসাপেক্ষ। অভীকের আবেদন মঞ্জুর করেছিলেন বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ কৌস্তুভ নায়েক। তিনি এখন স্বাস্থ্য ভবনে অবস্থিত ইনস্টিটিউট অফ হেলথ অ্যান্ড ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ারের ডিরেক্টর। ইন্দ্রজিৎ সাহা ডিএমই পদেই রয়েছেন। আরজি কর কাণ্ডের সময় যিনি স্বাস্থ্যসচিব ছিলেন, সেই নারায়ণস্বরূপ নিগমও এখনও সেই পদে বহাল। প্রশ্ন উঠেছে, অভীকের পাশাপাশি এঁদের ভূমিকাও কি তদন্তের আওতায় আসবে?
আরও পড়ুন:
গত এপ্রিলে ডিএমই যখন হাই কোর্টে অভীককে ছাড়পত্র দেন তখনই আরজি কর নিয়ে আন্দোলনকারী চিকিৎসক নেতারা প্রশ্ন তুলেছিলেন, এই মামলায় তাঁদের যুক্ত করা হল না কেন? স্নাতকোত্তরে অভীকের ভর্তির ক্ষেত্রে কারচুপির বিষয়ে তাঁদের কাছে বিস্তারিত তথ্য আছে বলে দাবি ওই নেতাদের। অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথ সার্ভিস ডক্টর্সের চিকিৎসক নেতা মানস গুমটা বলেন, ‘‘অভীক দে-র আবেদন যিনি মঞ্জুর করেছিলেন তিনি এখন স্বাস্থ্য ভবনে ইনস্টিটিউটের অধিকর্তা। কলকাতা হাই কোর্টে যে রিপোর্ট ডিএমই দিলেন, তাতে এক প্রকার ক্লিনচিট পেলেন অভীক দে। আর এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসচিবও দায় এড়াতে পারেন না। তা হলে নতুন কমিটি তদন্ত করবে কার বিরুদ্ধে? যাঁরা ক্লিনচিট দিলেন তাঁদের বিরুদ্ধেই তো তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।’’ ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টর্স ফোরামের সভাপতি কৌশিক চাকী বলেন, ‘‘থ্রেট কালচারের সিস্টেমের লোকেরাই এখনও পদে বহাল। এ ভাবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় প্রকৃত পরিবর্তন আসবে কি না সংশয় রয়েছে।’’ আরজি কর আন্দোলনের চিকিৎসকের অন্যতম মুখ অনিকেত মাহাতো বলেন, ‘‘স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বদল ঘটাতে হলে সবার আগে দৃষ্টিভঙ্গির বদলের প্রয়োজন।’’