‘যখন রোদেরই কণা, ধানেরই শীষে, বিছিয়ে দেয় রোদ্দুর...’— ঠিক তখনই মা, তোমায় ছুঁতে মন চায়! তোমায় কাছে পেতে কী যেন এক আবেগে মন দিশাহারা হয়। আর মনই তো, সে কবেই বা আর দেশ, কাল, সীমানার গণ্ডি মেনেছে? দশ বছর আগে, এমনই এক শিউলি-ভোরে আকাশে যখন শারদীয় মেঘের মাতামাতি, আমেরিকার পশ্চিম উপকূলের ক্যালিফোর্নিয়ায় ট্রাইভ্যালি নামে এক ছোট্ট উপত্যকায় জনাকয়েক পরবাসী বাঙালির উৎসাহে মা এলেন।
পুজোর ছুটি নেই, ভিড় নেই, কোনও থিম নেই, আয়োজনও নেই। তবু অনেক ‘নেই’-এর মাঝেও, ছিল অফুরান উৎসাহ, আর প্রাণঢালা উৎসবের আবেগ। যার নাম ‘আগমনী’। মাঝে প্রশান্ত মহাসাগরের অনেক ঢেউ আছড়ে পড়েছে উত্তর-পশ্চিম আমেরিকার সৈকতে। আর ‘আগমনী’ তার চলার পথে আরও অনেককে সঙ্গী পেয়েছে। পরিবারের কলেবরও বেড়েছে।
এ বারের পুজো তাই যেন আমাদের কাছে এক মহোৎসব। এক দশকের ছোট ছোট প্রয়াস, বিশ্বাস, ভালোবাসা আর ভরসার খড়কুটো জড়ো করে এ বার আমাদের প্যান্ডেল সেজেছে কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের আদলে। কুমোরটুলি থেকে এসেছে প্যান্ডেলের সাজ। সেই সঙ্গে চন্দননগরের চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা এ বার স্যান রামোনের বাঙালিদের উৎসবে। মঙ্গলবার রাত থেকেই সাজ সাজ রব ট্রাইভ্যালিতে। সদস্যেরা বিভিন্ন টিম তৈরি করে পুজোর সার্বিক দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছেন প্রতিবারের মতো। বে এরিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, গত কয়েক বছরের মতোই, আনুমানিক পাঁচ হাজারেরও বেশি দর্শনার্থী আসবেন আমাদের পুজো দেখতে। ব্যবস্থাপনাও বৃহৎ। দু’হাজার গাড়ি রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে তাই।
‘আগমনী’র পুজো অনেকটাই কলকাতার ম্যাডক্স স্কোয়ারের পুজোকে মন করায়। বিরাট মাঠের এক দিকে প্যান্ডেলে মায়ের পুজো চলছে। মাঠ ঘিরে বিভিন্ন খাবারের স্টল—রোল, ফুচকা, বিরিয়ানি, এগ ডেভিল— মানে পুজো দেখতে বেরিয়ে যা যা আপনার রসনায় চাগাড় পারে, সবই রয়েছে। শুধু কি তাই? পুজোয় একটা শাড়ি হয়েছে, কিন্তু তার সঙ্গে মানানসই জাঙ্ক জুয়েলারি লাগবে বা লক্ষ্মীপুজোর জন্য জাঁকালো ‘ইন্ডিয়ান আউটফিট’? ‘আগমনী’র পুজো প্রাঙ্গণ এক কথায় ‘সব পেয়েছির আসর’। খালি হাতে বা মনে ফিরে যেতে হবে না কাউকেই। তাই নতুন পোশাকে সেজেগুজে বে এরিয়ার সব বাঙালিরা এক বারের জন্য হলেও এই পুজোয় আসবেনই। এ বার পুজো শুরুর আগেই এসেছে আর এক খুশির খবর— দীর্ঘ এক দশক ধরে প্রবাসে বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বহন করার স্বীকৃতিতে বে এরিয়ার ‘আগমনী’ সম্মানিত হয়েছে ‘শক্তি সম্মান প্রাইড অফ ভারত ২৬’ পুরস্কারে।
আরও পড়ুন:
শুক্র থেকে রবি, সদস্যদের জন্য থাকছে চারবেলা পেটপুরে ভূরিভোজের ব্যবস্থা। কচুরি থেকে শুরু করে পাতুরি, ফিশ ফ্রাই থেকে ভাপা সন্দেশ— কী নেই সেই তালিকায়! আর হ্যাঁ, পুজো দেখতে এসেছেন, অথচ ঢাকের বাদ্যির মাঝে মাঝে চেনা গানের কলি বা প্রিয় কবিতার দুটো লাইন কানে ভেসে আসবে না? ভিন্দেশে ‘বন্দি’ নস্টালজিয়ার একটা বড় অংশই তো জুড়ে রয়েছে ‘রেকর্ড করা শূন্যতা’! ‘আগমনী’ তা জানে এবং মানেও। তিন দিন ধরে রংবেরঙের দারুণ অনুষ্ঠানে ঠাসা আমাদের পুজোয় সাংস্কৃতিক সূচি। তার মহড়া শুরু হয়ে গিয়েছে প্রায় মাস তিনেক আগে থেকেই। এবার ‘আগমনী’র পুজোয় দু’জন অতিথি শিল্পী আসছেন কলকাতা থেকে— ঋষি পাণ্ডা এবং শহর ও পরশপাথর ব্যান্ডের গায়ক-গীতিকার অনিন্দ্য বসু (‘তোমায় ছুঁতে চাওয়ার মুহূর্তরা’ নিয়ে?)।
এতো গেল পুজোর তিন দিন। ‘আগমনী’র কর্মকাণ্ড কিন্তু ৩৬৫ দিনই চলতে থাকে। ‘হলিডে ডিনার’, ‘ফুড ড্রাইভে’র মতো ‘কমিউনিটি ওয়ার্কে’র পাশাপাশি ‘আগমনী’-র হৃদয়ে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ। গত কয়েক বছরে তারা নিয়মিত সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে সুন্দরবনের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা মুক্তি ফাউন্ডেশনের হাতে। বাদাবন ঘেরা প্রত্যন্ত গ্রামে তৈরি হয়েছে ‘মুক্তি কিশলয় বিদ্যালয়’। কাকদ্বীপের বাজারবেড়িয়া ঠাকুরচকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়। দিগম্বরপুরে চালু হয়েছে, মহিলাদের স্বনির্ভর কর্মসূচি। ক্যালিফোর্নিয়ার ভারতীয়দের সংগঠন ‘নারিকা’র সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে চলছে পারিবারিক হিংসার শিকার হওয়া নারীদের সহায়তায় কাজ! হাতের উপর হাত রাখা খুব সহজ নয়, তবুও চেষ্টায় খামতি নেই বে এরিয়ার এই বাঙালিদের। প্রবাসের দুর্গোৎসব কলকাতার অনেক পাড়ার পুজোর মতোই তাঁরা সকলকে নিয়ে নজর দেন সামাজিক দায়বদ্ধতার দিকেও।
এক থেকে দশ গোণার আগে
যে কবারই থামলে,
তারচে’ বেশি হোঁচট খাওয়া
হাঁটতে শেখায়, জানলে?
আজকে যখন মুখ ফিরিয়ে
রাস্তাটাকে দেখো,
পথের নুড়ি সাবাশি দেয়,
জয়টা মনে রেখো!
আরও কয়েক দশক পরে
আবার যখন পুজো,
‘আগমনী’ র ঝুলিতে ফের
নতুন স্বপ্ন খুঁজো।
এ ভাবেই এগিয়ে চলুক ‘আগমনী’। ‘দুগ্গা দুগ্গা’।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।