বিজ্ঞানের ভাষায় তারা ‘নেফোটেট্টিক্স ভিরেসেনস’। ইংরেজিতে যাদের পোশাকি নাম ‘গ্রিন লিফহপার’। আর বাঙালির কাছে সে শুধুই ‘শ্যামাপোকা’। কালীপুজোর সময়, হেমন্তকালে ওদের আবির্ভাব। বলা হয়, দীপাবলি বা শ্যামাপুজোর বাহক নাকি তারা। আলো দেখলেই ঝাঁকে ঝাঁকে এসে উপস্থিত হয় এই পোকা। আর আলো নিভলেই ‘মৃত্যু’!
কেন এই আত্মঘাতী দৌড়?
নিশাচর কীটপতঙ্গরা রাতে ওড়ার জন্য চাঁদ বা তারার মৃদু আলোকে কম্পাস বা দিকনির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করে (যাকে বিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা হয় 'ট্রান্সভার্স ওরিয়েন্টেশন')। কিন্তু আমাদের ঘরের তীব্র বৈদ্যুতিক আলো বা নিয়ন বাতি তাদের এই প্রাকৃতিক 'নেভিগেশন সিস্টেম' সম্পূর্ণ গুলিয়ে দেয়। আলোকে কেন্দ্র করে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং বাল্বের তাপে পুড়ে বা মেঝেতে আছড়ে পড়ে মারা যায়।
কেন কালীপুজোতেই হানা?
শ্যামাপোকার প্রধান খাদ্য হল ধান গাছের রস। তাই ধান উৎপাদনকারী রাজ্যেই এক মাত্র দেখা যায় এই শ্যামাপোকাদের। হেমন্তে সদ্য শিস আসা ধান গাছ থেকে এরা খাদ্য সংগ্রহ করে এবং ফসলের সর্বনাশ করে। প্রতিবছর অক্টোবর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ শীত আসার কিছু মুহূর্ত আগে পর্যন্ত হানা দেয় এরা। আক্রমণের মূল সময় হিসেবে ধরা হয় এই কালীপুজো এবং তার আগে-পিছে কিছু দিন।
একটা সময় এমনও ছিল, কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর পর থেকেই দায় হয়ে উঠত ঘরের লাইট জ্বালানো। ঘর-বারান্দা থেকে রাস্তাঘাট, এই পোকার উপদ্রবে জীবন প্রায় ওষ্ঠাগত! খাবারের সঙ্গেও যে কত পোকা শরীরে গিয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু পরিস্থিতি বদলাচ্ছে ক্রমাগত। দূষণ, উষ্ণায়ন এবং কৃষিজমিতে ব্যাপক হারে ব্যবহৃত কীটনাশকের কারণে ক্রমশ কমছে এই শ্যামাপোকার সংখ্যা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ুর পরিবর্তনও এর কাল ডেকে এনেছে। খুব আর্দ্র পরিবেশ ছাড়া শ্যামাপোকা বাঁচতে পারে না। জলবায়ু বদলের জেরে এখন সারা বছরই কমবেশি গরম থাকে। কলকাতার আশপাশে এখন আর ধান চাষও হয় না। সে কারণেও শহরে শ্যামাপোকার সংখ্যা কমছে বলেই মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।