চারদিকে আলো, সাজসজ্জা, ঢাকের আওয়াজ, প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দ। উৎসব মানেই যেন খুশিতে মেতে ওঠার সময়। কিন্তু এই আবহেই কারও কারও মন জুড়ে জমে থাকে বিষণ্ণতা, একাকিত্ব কিংবা হারানোর যন্ত্রণা। কেন এমন হয়?
মনোবিদ শ্রেয়া দত্তের মতে, প্রিয়জনকে হারানো, সম্পর্কের বিচ্ছেদ, পারিবারিক সমস্যা কিংবা দীর্ঘদিনের একাকিত্ব উৎসবের সময় পুরোনো স্মৃতি ও আবেগকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসতে পারে। অন্যদের আনন্দের সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করা এবং ‘উৎসব মানেই আনন্দ’— এই সামাজিক প্রত্যাশাও মানসিক চাপ বাড়ায়। এই অভিজ্ঞতাকেই সাধারণ ভাবে ‘ফেস্টিভ ব্লুজ’ বলা হয়।
শ্রেয়ার কথায়, “উৎসবের আবহ আমাদের জীবনের অভাব, বিচ্ছেদ বা একাকিত্বকে অনেক সময় আরও স্পষ্ট করে তোলে। তাই চারপাশে আনন্দ থাকলেও, নিজের ভিতরে আনন্দ না থাকা মানেই তা কোনও অস্বাভাবিকতা নয়।”
কী এই ফেস্টিভ ব্লুজ?
এটি কোনও স্বতন্ত্র মানসিক রোগ বা ক্লিনিক্যাল ডায়াগনসিস নয়। উৎসবের সময় দৈনন্দিন জীবনে বদল, অর্থনৈতিক চাপ, পারিবারিক প্রত্যাশা, পুরোনো স্মৃতি কিংবা সম্পর্কের টানাপড়েন থেকে মনখারাপ বাড়তে পারে। এর লক্ষণ হিসেবে একাকিত্ব, অস্থিরতা, খিটখিটে মেজাজ, কান্না, ক্লান্তি, ঘুম বা খাওয়ার পরিবর্তন এবং মানুষের থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
কী ভাবে সামলাবেন?
উৎসবের সময় মনখারাপ হলে জোর করে আনন্দ করার প্রয়োজন নেই। পরিবেশ অসহ্য লাগলে কিছুটা নিরিবিলিতে থাকা, কান্না পেলে কাঁদতে দেওয়া কিংবা বিশ্বাসযোগ্য কারও সঙ্গে সময় কাটানো সাহায্য করতে পারে। পছন্দের খাবার খাওয়া, নিজের শখে মন দেওয়া বা কিছুক্ষণ ধীরে শ্বাস নেওয়ার মতো ছোট অভ্যাসও স্বস্তি দিতে পারে।
শ্রেয়ার কথায়, “নিজের মতো করে উৎসব তৈরি করার অর্থ সবসময় আনন্দ খোঁজা নয়। কখনও কখনও নিজের জন্য একটু নিরাপদ, শান্ত এবং সহনীয় একটা জায়গা তৈরি করাও উৎসবের অংশ হতে পারে।”
কাছের কেউ এমন অবস্থায় থাকলে তাঁকে জোর করে আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা না করে তাঁর কথা শুনুন। পাশে থাকার আশ্বাস দিন। কেউ যদি বাঁচতে না চাওয়ার কথা বলেন বা নিজের ক্ষতি করার ইঙ্গিত দেন, বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত পেশাদার সাহায্যের ব্যবস্থা করুন।
উৎসবের পরেও মনখারাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে, দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেললে কিংবা দীর্ঘদিন কোনও কিছুতেই আগ্রহ না থাকলে মনোবিদ বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
শ্রেয়ার বক্তব্য, “সবাই যখন উৎসবের আনন্দে আছেন তখন আপনার ভাল না লাগাটাও একটি বৈধ অনুভূতি। এই মুহূর্তে আনন্দ খুঁজে পাওয়ার চেয়ে নিজেকে বোঝা এবং নিরাপদ রাখা বেশি জরুরি।”
এই প্রতিবেদনটি "আনন্দ উৎসব" ফিচারের একটি অংশ।