দুর্গা বলতেই চোখের সমানে ভেসে ওঠে দশভুজা মাতৃমূর্তি, টানা টানা ত্রিনয়ন, ডাকের বা শোলার সাজ এবং সোনার মতো গায়ের রং। দুর্গার এমন বেশ দেখতে অভ্যস্ত বাংলার মানুষ। বলা হয়, দুর্গার গায়ের রং হবে তপ্তকাঞ্চনের মতো। অর্থাৎ সোনা গলালে যে রং হয় ঠিক তেমন। আবার অতসীপুষ্পবর্ণা দুর্গাও দেখা যায়। পল্লীগ্রামে যে অতসী ফুল দেখা যায়, তার বর্ণ অনেকটা সোনার মতো। তেমনই দুর্গা গড়েন বাংলার পটুয়ারা। কিন্তু বঙ্গদেশ বৈচিত্রের ভূমি। দেবী দুর্গার গাত্র বর্ণেও রয়েছে ব্যতিক্রম। কোথাও দুর্গার গায়ের রং অমাবস্যার রাতের ন্যায় নিকষ কালো, কোথাও শরতের আকাশের মতো নীল কোথাও আবার রক্তের মতো লাল।
বাংলার নানান প্রান্তে কালো রঙের দুর্গা প্রতিমা পুজো হয়। সেগুলি মূলত পারিবারিক দুর্গাপুজো। বর্ধমানের ভট্টাচার্য পরিবারে প্রায় তিনশো বছর ধরে ‘ভদ্রকালীরূপী দুর্গা’র পুজো হচ্ছে। পুজো শুরু হয়েছিল ওপার বাংলায়। প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, এ পরিবারের পূর্বপুরুষ হরিদেব ভট্টাচার্যকে দেবী দুর্গা স্বপ্নাদেশ দিয়ে ভদ্রকালীরূপে পুজো করতে বলেন। সেই থেকে কালো দুর্গার আরাধনা চলছে ভট্টাচার্য বাড়িতে। যদিও কেউ কেউ বলেন, প্রতিমাশিল্পী ভুলবশত কালো রঙ করে ফেলেছিলেন। পর্যাপ্ত সময়ের অভাবে সেই কালো মূর্তিরই পুজো করা হয়। দেশভাগ পরবর্তী সময়ে ভট্টাচার্য পরিবার এপার বাংলায় এসে পড়ে। পরিবার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে যায়। আসানসোল ও কলকাতায় পুজো শুরু হয়। এখন বেলেঘাটার রামকৃষ্ণ নস্কর লেনের ভট্টাচার্যবাড়িতে কালো দুর্গার পুজো হয়। কালো দুর্গার প্রতিমার বাম দিকে থাকেন গণেশ এবং ডান দিকে কার্তিক। ওপার বাংলায় শুরু হওয়া অধিকাংশ বাড়ির পুজোয় গণেশ ও কার্তিকের চিরাচরিত স্থানের এমন বদল দেখা যায়।
নদিয়াতেও কালো দুর্গার আরাধনা হয়। হাঁসখালির বাহিরগাছি গ্রামে দেবীমূর্তির বর্ণ কুচকুচে কালো। এই পুজো শান্তি আশ্রমের। আদতে এটি বাংলাদেশের পাবনার এক জমিদারবাড়ির পুজো। পরিবারের কোনও এক পূর্বপুরুষ হিমালয় ভ্রমণে বেরিয়ে সন্ন্যাসী হয়ে যান। তিনিই বাহিরগাছিতে এসে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে দুর্গাপুজো শুরু করেন। কথিত আছে, ঘুমের ঘোরে পটুয়া ভুল করে বসেন, প্রতিমায় কালো রঙের পোঁচ পড়ে যায়! তার পর দেবী স্বপ্নে কালো রূপে পুজো করার আদেশ দেন।
ক্যানিংয়ের দিঘিরপার এলাকার ভট্টাচার্য পরিবারের দুর্গা প্রতিমার মুখমণ্ডল কালো, দেহের রং বাদামি। দুর্ঘটনার জেরে প্রতিমার এমন ব্যতিক্রমী রূপের সৃষ্টি। ঢাকা বিক্রমপুরের পাইনখাঁড়া গ্রামে প্রায় সাড়ে চারশো বছর আগে সূচনা হয়েছিল পুজোর। খড়ের ছাউনি দেওয়া শনি ও কালী মন্দিরে দুর্গাপুজো আয়োজন করা হত। পাশে অন্য একটি মন্দিরে মনসা পুজো হত। প্রায় ২০০ বছর আগে ঘটে যায় অগ্নিকাণ্ড। একটি কাক হঠাৎই মনসা মন্দির থেকে প্রদীপের জ্বলন্ত সলতে ঠোঁটে করে তুলে দুর্গা মন্দিরের খড়ের চালে এসে বসে, মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে ভয়ঙ্কর আগুন। আগুনে পুড়ে যায় দুর্গা প্রতিমার কিছু অংশ। পোড়া প্রতিমায় পুজো কী ভাবে হবে? দেবীর শরণাপন্ন হন বাড়ির পূর্বপুরুষরা। আধপোড়া মূর্তিকেই পুজো করার আদেশ দেন দেবী। তার পর থেকে কালো দুর্গার পুজো শুরু হয় ভট্টাচার্য বাড়িতে। উত্তর দিনাজপুর জেলার কালিয়াগঞ্জের ধনকৈল গ্রামের পাকড়াশি বাড়ির দুর্গাও কালো। ওপারের পাবনায় এই পুজোর সূচনা। প্রায় প্রতিটি কালো দুর্গার শিকড় রয়েছে ওপার বাংলায়।
নদীয়ার কৃষ্ণনগরে পূজিতা হন নীল দুর্গা। একই পরিবারের দুই শরিকের বাড়িতে নীল দুর্গার আরাধনা চলে। কৃষ্ণনগর নাজিরাপাড়ায় চট্টোপাধ্যায় বাড়ির মাতৃ প্রতিমার রং নীল। চট্টোপাধ্যায় পরিবারের আদি বাড়ি ছিল বাংলাদেশের বরিশাল জেলার রামরাইন গ্রামে, সেখানেই পুজোর সূত্রপাত। তবে প্রথম থেকে দুর্গার রং নীল ছিল না। শোনা যায়, প্রতিমাশিল্পী রাতের অন্ধকারে ভুল করে দেবীমূর্তির গায়ের নীল রং করে ফেলেছিলেন। চালির রং প্রতিমার গায়ে আর প্রতিমার হলুদ চালিতে গিয়ে পড়েছিল।
নদিয়ায় আবার লাল দুর্গারও দেখা মেলে, লাল দুর্গার পুজো হয় নবদ্বীপের যোগনাথতলার ভট্টাচার্য বাড়িতে। লাল দুর্গার নেপথ্যে রয়েছে এক মর্মান্তিক কাহিনি। ভট্টাচার্যদের আদি বাড়ি ছিল বাংলাদেশের ঢাকা জেলার মিতরা গ্রামে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, দেবীর গায়ের রং প্রথম থেকে রক্তবর্ণ ছিল না। কোনও এক বছর নবমীর দিন ভট্টাচার্য পরিবারের গৃহকর্তা রাঘবরাম ভট্টাচার্য চণ্ডীপাঠে বসেছেন। তিথি পেরিয়ে যাচ্ছে, দ্রুত পাঠ চলছে। পাশে ছিলেন রাঘবরামের তৃতীয় পুত্র রামভদ্র। বাবার উচ্চারণ তাঁর কানে বাঁধে। বাবার ত্রুটি ধরিয়ে দিতে যান রামভদ্র। ছেলের মুখে এ-কথা শুনে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠেন রাঘবরাম। ছেলেকে চণ্ডীপাঠ করতে নির্দেশ দেন। বাবার আদেশে পূর্বদিকে মুখ করে চণ্ডীপাঠ করতে বসেন রামভদ্র। শুরু হল বাবা-ছেলের একসঙ্গে চণ্ডীপাঠ। হঠাৎই দিক পরিবর্তন করেন দেবী, দক্ষিণমুখী থেকে একেবারে পশ্চিমমুখী! রাঘবপুত্রের দিকে যেন ঘুরে গেলেন মা। চণ্ডীপাঠ চলল আর দেবীর গায়ের রং বদলাতে থাকল ধীরে ধীরে। লাল বর্ণ ধারণ করলেন দেবী, রামভদ্রের সারা শরীর ক্রমশ রক্তশূন্য হয়ে গেল। চণ্ডীপাঠ শেষ হল, রামভদ্রও মারা গেলেন। এ ঘটনার পর থেকে এই বাড়ির পুজোয় চণ্ডীপাঠ নিষিদ্ধ।
গোটা বাংলায় অধিকাংশ স্থানে দেবী তপ্তকাঞ্চনবর্ণা রূপেই পূজিতা হন। বিপুলা বঙ্গে কখনও নিছক ভ্রমে, কখনও দুর্ঘটনার জেরে মা দুর্গার গাত্রবর্ণ বদলে গিয়েছে। আবার কোথাও কোথাও স্বপ্নাদেশের কাহিনিও শোনা যায়। যেন লৌকিকভাবে দেবীর নানা রঙের প্রতিমাগুলি গড়ে উঠেছে। এহেন ব্যতিক্রমগুলিই বাংলার দুর্গাপুজো ও সংস্কৃতিকে ঋদ্ধ করেছে।
এই প্রতিবেদনটি “আনন্দ উৎসব” ফিচারের অংশ।