খাতায় লেখার কথা ছিল হিসাব, সেই খাতাতেই লেখা হল অভিমানের কথা। মাস শেষের বেতনের হিসাবের জায়গায় খাতার পাতায় পাতায় জমছে মায়ের কাছে সন্তানের অভিমান, অভিযোগ আর আকুলতা। সাদা কাগজে দেনা পাওনার জায়গায় জ্বলজ্বল করছে কালী কথা। আসলে, দেনা-পাওনার ইঁদুর দৌড়ে অভিমানের হিসাব ক’জনই বা করতে পারে? জনশ্রুতি বলে, পেরেছিলেন এক জনই। তিনি রামপ্রসাদ সেন। হিসাবের খাতায় পাটিগণিত না কষে যিনি লিখেছিলেন কালী নাম।
রামপ্রসাদকে নিয়ে এই গল্প বেশ প্রচলিত। জনশ্রুতি থাকলেও এই কাহিনী নিয়ে কোনও লিখিত দলিল নেই। তবে, এমনই নাকি ছিলেন মায়ের আরও এক পাগল ছেলে রামপ্রসাদ। যার হাত ধরে শ্যামাসঙ্গীত পেয়েছে নতুন ভাষা। বৈষ্ণব-শাক্তকে মিলিয়ে মিশিয়ে তিনি গান বেঁধেছেন, “শ্যাম শ্যামাকে প্রভেদ কর, চক্ষু থাকতে হলে কানা।” আর এখানেই রামপ্রসাদকে বোঝা শক্ত। যিনি কালী নামেও এগিয়ে রেখেছিলেন মানুষকে। সঞ্জীবনী দিয়েছিলেন মানুষের ভাল থাকার প্রবণতাকে। ভক্তিরসে ডুব দিয়েও করেছিলেন বিদ্রোহ।
আরও পড়ুন:
স্বয়ং আদ্যাশক্তি কালীই যেন ছিলেন রামপ্রসাদের মা। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে যখন দিকে দিকে চরমে মৃত্যু মিছিল, পেটে ভাত নেই রামপ্রসাদেরও। খেতে না পেয়ে মরছে শয়ে শয়ে মানুষ। সে সময়েও কালী কথাতেই প্রতিবাদ করেন রামপ্রসাদ। গান বাঁধেন, “ঘরে ঘরে যাব, ভিক্ষা মাগি খাব, মা বলে আর কোলে যাব না।” এ তো সাধকের চরিত্র নয়। এই রামপ্রসাদ যেন বিদ্রোহী। মায়ের কাছে সন্তানের এই অভিমান আসলে এক অর্থে অসহায় মানুষের বেঁচে থাকার দাবি। ঈশ্বরের কাছে প্রশ্ন তোলার মধ্যে দিয়ে কবি যেন সমাজের দুঃখকেও সামনে নিয়ে আসছেন।
আরও পড়ুন:
মায়ের কাছে এক মুঠো অন্ন চেয়ে রামপ্রসাদ মনে করান, মানুষের বাঁচার প্রথম শর্ত খাদ্য। ধর্মের উর্ধ্বে উঠে গেয়েছেন বেঁচে থাকার জয়গান। রামপ্রসাদের কাছে সাধনা মানে শুধু স্তব নয়; কখনও তা অভিমান, কখনও প্রতিবাদ, কখনও চোখের জল মায়ের আঁচলে মুছে নেওয়ার আকুতি।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।