হাওড়া-বর্ধমান কর্ড লাইনের মির্জাপুর-বাঁকিপুর স্টেশন থেকে মিনিট দশেকের হাঁটাপথ। হুগলি জেলার সিঙ্গুর ব্লকের জগৎনগর গ্রাম। এখানেই কানা নদীর প্রাচীন প্রবাহের স্মৃতি বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক ঐতিহ্যবাহী কালীক্ষেত্র— মা আনন্দময়ীর মন্দির। দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মন্দিরের স্থাপত্যশৈলীর অনুকরণে তৈরি ৬৫ ফুট উঁচু নবরত্ন মন্দিরটি দূর থেকেই দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কিন্তু এই মন্দিরের পরিচয় শুধু তার স্থাপত্যে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক কিশোরীর মৃত্যু, শ্মশানের অলৌকিক উপাখ্যান এবং কয়েক শতাব্দীর লোকবিশ্বাস।
স্থানীয় জনশ্রুতি অনুসারে, আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে জগৎনগর ছিল ঘন জঙ্গলে ঘেরা এক জনপদ। কাশীনাথ রায়ের নাতনি এবং সুবলচন্দ্র রায়ের কন্যা শ্যামাসুন্দরী দেবী, বাড়ির আদরের ‘আন্দি’ ছিলেন এই গ্রামেরই মেয়ে। মাত্র আট বছর বয়সে জনাইয়ের মুখোপাধ্যায় পরিবারে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের অল্প দিনের মধ্যেই স্বামীর মৃত্যু হলে তিনি ফিরে আসেন পিতৃগৃহে। পরবর্তীকালে অল্প বয়সে তাঁরও মৃত্যু হয়।
কানা নদীর তীরবর্তী শ্মশানে যখন আন্দির সৎকার চলছিল, আচমকা প্রবল ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়। প্রাণভয়ে শবযাত্রীরা আধপোড়া দেহ ফেলে চলে যান। সেই সময়ে পাশের বলরামবাটী গ্রামের এক কালীসাধক শ্মশানের কাছে সাধনায় রত ছিলেন। লোককথা অনুযায়ী, তিনি স্বপ্নাদেশ পান— আধপোড়া দেহটি সমাধিস্থ করে সেখানে দেবীর আরাধনা করতে হবে। সেই নির্দেশ অনুসারেই চিতাস্থলে একটি ঘট প্রতিষ্ঠা করে পাতা ও ডালপালার ছাউনি গড়ে শুরু হয় দেবী আনন্দময়ীর পুজো। গ্রামেরই এক কন্যা ক্রমে পরিণত হন আরাধ্যা মাতৃরূপে।
আরও পড়ুন:
পরবর্তী কালে দেবীর নিত্যপুজোর দায়িত্ব পান কাশীবাসী ব্রাহ্মণ দিগম্বর চক্রবর্তী। স্বপ্নাদেশ পেয়ে তিনি কাশী থেকে ফিরে এসে মন্দিরে সেবার ভার গ্রহণ করেন। আজও তাঁর বংশধরেরাই প্রাচীন রীতি মেনে সেবাপুজো পরিচালনা করেন।
এই মন্দিরের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কৈলাসচন্দ্র দত্তের উদ্যোগ। স্থানীয় ব্যবসায়ী কৈলাস দত্ত দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে মন্দির নির্মাণে উদ্যোগী হন। চন্দননগরের সরকার জমিদাররা মন্দিরের জন্য জমি দান করেন। কাশী থেকে দেবীমূর্তি এনে প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীকালে পুরনো মন্দির সংস্কার করে ১৪১২ বঙ্গাব্দের ২৭ মাঘ দক্ষিণেশ্বরের আদলে বর্তমান সুবিশাল নবরত্ন মন্দিরে দেবীকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়। ভক্তদের দানে নির্মিত এই মন্দিরের উচ্চতা প্রায় ৬৫ ফুট; নির্মাণের খরচ প্রায় ৬৫ লক্ষ টাকা।
এই কালীক্ষেত্রের কয়েকটি বিশেষ প্রথা আজও আলোচনার বিষয়। কথিত, কৈলাস দত্তের প্রতিষ্ঠিত পিতলের ঘটের জল শতাধিক বছরেও বদলানো হয়নি। গর্ভগৃহে প্রবেশের অধিকারও মূলত দিগম্বর চক্রবর্তীর বংশধরদের জন্য সংরক্ষিত। ভক্তদের মধ্যে ওজনের সমপরিমাণ বাতাসা বা সন্দেশ নিবেদনের মানত প্রচলিত। এক সময়ে ছাগবলি দেওয়া হলেও বর্তমানে সেই প্রথা বন্ধ। ফল বলির মাধ্যমে পুজোর রীতি বজায় রয়েছে।
গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, নিশুতি রাতে দেবী পাশের পুকুরে স্নান করতে যান। তাই গভীর রাতে মন্দির চত্বরে কেউ থাকেন না। এমনকি শবদেহ নিয়ে শ্মশানে যাওয়ার আগেও মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে সংকীর্তন করে দেবীর অনুমতি নেওয়ার রীতি প্রচলিত।
কালীপুজোয় সারা রাত ধরে চলে বিশেষ আরাধনা। লুচি, খিচুড়ি, পায়েস ও ফলমূল দিয়ে দেবীকে ভোগ নিবেদন করা হয়। রোগব্যাধি, পারিবারিক সঙ্কট কিংবা মনের বাসনা নিয়ে দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা ছুটে আসেন এই মন্দিরে।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।