দক্ষিণেশ্বরে তখনও অনেক দূর। একতো পথের ক্লান্তি, তার উপর জ্বর। অসুস্থ সারদামণির মনে হয়েছিল, হয়তো আর স্বামীর কাছে পৌঁছনো হবে না। ঠিক সেই সময় তাঁর শিয়রে এসে বসেছিল একটি কালো মেয়ে। কে ছিল সে? কেনই বা বলেছিল, ‘তোমার জন্যই তো তাঁকে সেখানে আটকে রেখেছি!’
১৮৭২ সাল। জয়রামবাটি থেকে পিতা রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে পায়ে হেঁটে দক্ষিণেশ্বরের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন সারদামণি। তখনো তিনি জগৎ জননী শ্রী শ্রী মা সারদা হয়ে ওঠেননি। তিনি তখন কেবলই এক গাঁয়ের বধু। যিনি স্বামী শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে যাওয়ার আকুলতায় অসুস্থ শরীরে দীর্ঘ পথের ক্লান্তি ভুলে পায়ে হেঁটে পথ চলছিলেন। কিন্তু পথের মধ্যেই তাঁর শরীর ভেঙে পড়ল। প্রবল জ্বরে আক্রান্ত হলেন তিনি। বাধ্য হয়ে পথের ধারের চটিতে আশ্রয় নিতে হলো।
জ্বরের ঘোরে কখন যে চোখ লেগে গিয়েছিল , তা তাঁর মনে নেই। হঠাৎ অনুভব করলেন, শিয়রের কাছে কেউ বসে আছে। চোখ মেলে দেখলেন, এক অপরূপ সুন্দরী কৃষ্ণবর্ণা বালিকা। পরম মমতায় তাঁর মাথায় ও শরীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আশ্চর্য শীতল সে স্পর্শ। কোন গরম বস্তু যেমন ঠান্ডা বাতাসের সংস্পর্শে এলে তাতে জলীয় বাষ্প তৈরি হয়। ঠিক তেমন সারদামণির শরীরের সমস্ত উত্তাপ, জ্বালা সেই শীতলতার সংস্পর্শে এসে স্বেদবিন্দুতে পরিণত হয়ে, তার শরীর শীতল করে দিচ্ছে। মনে হচ্ছিল সর্বশরীরে কেউ যেন চন্দনের প্রলেপ লাগিয়ে দিচ্ছে।
আরও পড়ুন:
সারদামণি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কোথা থেকে এসেছ?”
মেয়েটি উত্তর দিল, “দক্ষিণেশ্বর থেকে।”
দক্ষিণেশ্বরের নাম শুনেই সারদার মনে যেন আশার আলো জ্বলে উঠল। বললেন, “আমিও তো সেখানে যাব বলে আসছি। কিন্তু এই জ্বরে পড়ে গেলাম। মনে হচ্ছে, আর যাওয়া হবে না।”
মেয়েটি তাঁকে আশ্বস্ত করে বলল, “ভয় কী? তুমি নিশ্চয়ই দক্ষিণেশ্বরে যাবে। শিগগিরই সুস্থ হয়ে উঠবে। তোমার জন্যই তো তাঁকে সেখানে আটকে রেখেছি।”
বিস্মিত সারদা এবার জানতে চাইলেন, “তুমি আমায় চেন। আমার কে হও গো তুমি?”
মেয়েটি উত্তর দিল, “আমি তোমার বোন গো।”
সারদামণি দেবী যেন সেই আত্মীয়তার মধ্যে এক অদ্ভুত আশ্রয় খুঁজে পেলেন। বললেন, “তাই বুঝি! সেইজন্যই তুমি এসেছ!” তারপর ভারী নিশ্চিন্ত হয়ে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়লেন। পরদিন সকালে তাঁর জ্বর অনেকটাই কমে গেল। কিছুদিনের অসুস্থতা ও বিশ্রামের পর তিনি শেষ পর্যন্ত দক্ষিণেশ্বরে পৌঁছলেন। বলাই বাহুল্য, তিনি সেই কৃষ্ণবর্ণা বালিকার খোঁজ আর পাননি। কেউ-ই তাকে দেখেনি, কেউ-ই তাকে চেনে না!
কিন্তু যে মানে, সে জানে তিনি আর কেউ নন, দক্ষিণেশ্বরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মা ভবতারিণী স্বয়ং। যে পথে সারদা যাচ্ছিলেন স্বামীর কাছে, সেই পথেই মা ভবতারিণী আগেভাগে এসে তাঁকে বরণ করে নিয়েছিলেন? পরে সারদামণিদেবী যখন জগৎতারিনী শ্রীশ্রীমা সারদা হয়ে উঠলেন, তখন সেই অমৃত কথা শুনিয়ে ছিলেন তার সন্তান সমভক্তদের।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।