কৈলাসে ফিরে গিয়েছেন উমা। সর্বত্র বিষাদের সুর। প্রথা মেনে প্রতিমা নিরঞ্জন হয়ে গিয়েছে। যে মণ্ডপে চার দিন ধরে পূজিতা হলেন জগন্মাতা, সেখানে এখন শুধুই শূন্যতা। ফাঁকা মণ্ডপে জ্বলছে একটি মাত্র প্রদীপ। এ দৃশ্যের চেয়ে বিষাদের ছবি বাঙালি জীবনে আর নেই! কিন্তু শূন্য মণ্ডপে কেন জ্বেলে রাখা হয় প্রদীপ?
দেবদেবীর আরতি থেকে শ্রাদ্ধের ষোড়শ দানের অধীনে দীপ দান, জন্মদিনে প্রদীপের আশিস থেকে কার্তিক মাসের আকাশ প্রদীপ— সনাতন হিন্দু ধর্মে প্রদীপের মাহাত্ম্য অসীম। প্রদীপ বা দীপ হল আলোর উৎস। যা জ্ঞান, বিদ্যা-বুদ্ধি, দীপ্তির প্রতীক। আঁধার হল অজ্ঞানতার প্রতীক। দুর্গাপুজোর অস্থায়ী মণ্ডপ পুজোর দিনগুলিতে মন্দির হয়ে ওঠে। সেই মণ্ডপে মাটির প্রতিমায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়। তার পরে নিয়ম মেনে দশমীতে দর্পণে বিসর্জন শেষে তিরকাঠির সুতো কেটে, ঘট নড়িয়ে দিলেই পুজোর অনুষ্ঠানিক সমাপ্তি। অবশেষে হয় প্রতিমা নিরঞ্জন। ফাঁকা পড়ে থাকে মণ্ডপ। আঁধার যেন সেই শূন্যতাকে গ্রাস করে। যেন বাড়ে অজ্ঞানতাও। তাই অন্ধকাররূপী অজ্ঞানতা মুক্ত করতে প্রদীপ জ্বেলে রাখা হয়।
আলো জ্বলে থাকার অর্থ কোনও শূন্যতাই আর স্পর্শ করতে পারবে না মণ্ডপকে। অন্ধকারের সঙ্গে সঙ্গে যাবতীয় অমঙ্গল থেকে মুক্তি মিলবে। শূন্য মণ্ডপে অশুভ শক্তি বাসা বাঁধার আশঙ্কাও থাকে। প্রদীপের উজ্জ্বল শিখা সে আশঙ্কা নাশ করে।
প্রদীপের শিখা নিয়ে যায় মুক্তির পথে। মাতৃ বিদায়ের বিষাদে ভারাক্রান্ত হৃদয় মুক্তির পথ খোঁজে। মণ্ডপে বা দুর্গা বেদীতে জ্বলতে থাকা আলো দুঃখের গ্রাসে থাকা মনকে অমৃতের সন্ধানে নিয়ে যায়। প্রজ্জ্বলিত আলোক শিখা বলে যায়, বিদায় সাময়িক। কোনও বিদায় শূন্যতা সৃষ্টি করতে পারে না। আগামী শরতে মা আবার আসবেন। তাই বিদায়বেলার কামনা— ‘সংবৎসরে ব্যতীতে তু পুনরাগমনায় চ’। তত ক্ষণের জন্য যাবতীয় অন্ধকার দূর হোক। মনের আঁধার নাশ হোক।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।