Advertisement
E-Paper

শুধু প্লেব্যাক গায়িকা হয়েই থেকে যেতে চাই না, নিজে সঙ্গীত সৃষ্টি করলেই শিল্পী হিসাবে মানুষ মনে রাখবে: আকৃতি

সুরেলা কণ্ঠের সঙ্গে স্মিত হাসি, আকৃতি কক্কড়কে এ ভাবেই চেনেন বাঙালি শ্রোতা-দর্শক। কলকাতা শহরে তাঁর আনাগোনা লেগেই থাকে। সম্প্রতি ঘুরে গেলেন কলকাতা থেকে এবং আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে সঙ্গীতজীবন নিয়ে কথা বললেন।

স্বরলিপি দাশগুপ্ত

শেষ আপডেট: ১৭ অগস্ট ২০২৬ ০৯:০২
ক্ষণিকের খ্যাতি নয়, স্থায়িত্বে বিশ্বাসী আকৃতি!

ক্ষণিকের খ্যাতি নয়, স্থায়িত্বে বিশ্বাসী আকৃতি! ছবি: সংগৃহীত।

পারিবারিক সূত্রে অবাঙালি তিনি। তবে কলকাতার সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক শৈশব থেকেই। বাংলা ছবিতে গেয়েছেন অসংখ্য গান। কখনও নায়িকা কোয়েল মল্লিক, কখনও আবার শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ের কণ্ঠ হয়ে উঠেছেন তিনি। তবে বাঙালি শ্রোতাদের আরও কাছের হয়ে উঠেছেন গানের রিয়্যালিটি শো-এর মাধ্যমে। সুরেলা কণ্ঠের সঙ্গে স্মিত হাসি, আকৃতি কক্কড়কে এ ভাবেই চেনেন বাঙালি শ্রোতা-দর্শক। কলকাতা শহরে তাঁর আনাগোনা লেগেই থাকে। সম্প্রতি ঘুরে গেলেন কলকাতা থেকে এবং আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে সঙ্গীতজীবন নিয়ে কথা বললেন।

বাংলা ছবিতে ‘প্রেম কি বুঝিনি’, ‘মন বিবাগী’ ,‘ওরে মনওয়া রে’, ‘তুই আমার হিরো’র মতো একাধিক জনপ্রিয় সঙ্গীত রয়েছে আকৃতির। গায়িকা জন্মসূত্রে হিন্দিভাষী। বাংলা গান গাওয়ার প্রস্তাব এলে কী ভাবে তা বেছে নেন, সেই প্রসঙ্গে কথা বললেন আকৃতি। গায়িকার জবাব, “আমি কিন্তু খুব ভেবেচিন্তেই গান নির্বাচন করি।” তাঁর কানে নাকি সহজেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে নির্মিত সঙ্গীতও ধরা পড়ে যায়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আপত্তি

বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে সঙ্গীত নির্মাণ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে নানা ক্ষেত্রে। আকৃতিরও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্মিত গানের প্রস্তাব পাওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে জানান। তবে তা বুঝতে তাঁর অসুবিধা হয়নি। আসন্ন ছবি ‘এরাও মানুষ‍’-এ গান গেয়েছেন আকৃতি। সঙ্গীত পরিচালক বালাসাই লাহিড়ীর তৈরি একটি গান গেয়েছেন তিনি। পরিচালক আকৃতির সুরেলা কণ্ঠের জন্যই এই গানের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই গানটির কথা বলতে গিয়েই গায়িকা বলেন, “‘এরাও মানুষ’-এর গানটি খুবই মধুর। গানটি মানুষের মন স্পর্শ করবে, তা বুঝতে সময় লাগেনি। কিন্তু আরও একটি বাংলা ছবিতে গান গাওয়ার প্রস্তাব এসেছিল। আমি আগে ট্র্যাক শুনি, তার পরে সিদ্ধান্ত নিই। সেই গানটি ছিল এআই দিয়ে তৈরি। আমার বুঝতে অসুবিধা হয়নি।”

শুনেই কি সহজে বুঝে ফেলা যায়, কোন গান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি? আকৃতির কথায়, “সহজেই বুঝতে পারি, কোন গান এআই দ্বারা তৈরি হয়েছে। আসলে মানুষের তৈরি গানের মধ্যে আবেগ থাকে, যা মন ছোঁয়। কিন্তু যন্ত্র দিয়ে তৈরি সঙ্গীত কোনও ভাবেই মন স্পর্শ করতে পারে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি কি না, তা বোঝার জন্য কোনও যান্ত্রিক সাহায্যেরও দরকার হয় না। মন দিয়ে শুনলেই বুঝতে পারি।” আকৃতি জানান, গানের কথা ও সুরের গুরুত্ব যাতে তাঁর কাছেও পরিষ্কার থাকে, এই দিকটি নিয়ে তিনি বিশেষ ভাবে সতর্ক থাকেন। “আসলে গানের ক্ষেত্রে পারিশ্রমিকই সব নয়। গানের অর্থ যেন মন ছোঁয়। কত সহস্র গান গাইলাম, তার কোনও গুরুত্ব নেই আমার কাছে। বরং ক’টা ভাল গান গাইলাম, সেটা নিয়ে আমি ভাবিত থাকি। সে কারণেই প্লেব্যাক গাওয়ার সঙ্গে নিজেও গান বাঁধি। নিজের আত্মার শান্তির জন্যই চলচ্চিত্রের বাইরেও স্বতন্ত্র গান গাই, গান তৈরি করি।” স্বীকারোক্তি আকৃতির।

প্লেব্যাক বনাম নিজস্ব গান

তবে কি প্লেব্যাক গায়িকা ও সঙ্গীতস্রষ্টা, এই দুইয়ের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা নিয়ে কি আকৃতিও ভাবিত? চলতি বছরের শুরুতেই অরিজি‌ৎ সিংহ জানিয়ে দেন, প্লেব্যাক আর তিনি গাইবেন না। তবে সঙ্গীত থেকে অবসর নয়। বরং সঙ্গীতকে নিজের মতো করে অনুধাবন করবেন। আকৃতিও মনে করেন, সামগ্রিক ভাবে সঙ্গীতশিল্পী হয়ে ওঠা তাঁর কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। প্লেব্যাক গানেই নিজেকে কখনও সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। তাঁর কথায়, “প্লেব্যাক গাইলে সারা জীবন প্লেব্যাক গায়িকা হিসাবেই পরিচয় থাকবে। সঙ্গীত সৃষ্টি করলেই সঙ্গীতশিল্পী বলে মানুষ মনে রাখবেন। অরিজিৎ খুব সুন্দর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।”

বাংলা গানের সফর

বাংলা ছবির গান নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কলকাতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি উঠে আসে আকৃতির কথায়। বাংলায় তাঁর সঙ্গীতসফরের শুরুতে স্বয়ং ‘মা দুর্গা’র ভূমিকা ছিল বলেও জানান গায়িকা। তিনি বলেন, “মা দুর্গাই হয়তো চেয়েছিলেন, আমি বাংলার একটা অংশ হয়ে উঠি। আমি মুম্বইয়ের এক পুজোমণ্ডপে গান গাইছিলাম। সেখানেই জি‌ৎদার (জিৎ গঙ্গোপাধ্যায়) স্ত্রী চন্দ্রাণীদি আমার গান শুনেছিলেন। আমাকে দিয়ে বাংলা গান গাওয়ানো যায় কি না, সে কথা জি‌ৎদাকে তিনিই ভাবতে বলেছিলেন। তার পরেই প্রথম গাইলাম ‘পাগলু’। সেখান থেকেই পর পর গান গাইতে থাকলাম বাংলা ছবিতে।”

তবে আকৃতির জীবনে বাংলা গানের সূচনা বেশ কিছুটা আগেই হয়ে গিয়েছিল। গুরুর কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীতও শিখেছেন তিনি। তিনি বলেন, “আমার গুরু ব্যোমকেশ বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, সমস্ত রকমের সঙ্গীতের গায়কি শিখতে হবে। একাধারে গজ়ল, ভজন, ধ্রুপদ, ধামার, খেয়াল, রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতির গায়কির সঙ্গে পরিচয় করিয়েছেন। সেই সময় আমি বাংলা ভাষা বুঝতাম না। গুরুজিই বুঝিয়ে দিতেন। মনে আছে, প্রথম শিখিয়েছিলেন ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’ এবং ‘বড় আশা করে এসেছি গো’।” আজও সুযোগ পেলেই রবীন্দ্রসঙ্গীত গান আকৃতি।

ক্ষণিকের খ্যাতি নয়, ধারাবাহিকতাই স্থায়ী

নিজের সঙ্গীতসফর শুরুর দিনগুলি আজও স্পষ্ট আকৃতির কাছে। মনে রেখেছেন নিজের উৎস। তার পাশাপাশি নতুনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলাতেও বিশ্বাসী তিনি। রিল-এর মাধ্যমে সঙ্গীতের জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রেও একই মতামত তাঁর। আকৃতির বক্তব্য, “সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলাতেই হয়। মানুষের ধৈর্য এখন সীমিত, এটা জেনেও এখন অযথা ৬-৭ মিনিটের সঙ্গীত তৈরির অর্থ হয় না। আবার শুধুই রিল-এ জনপ্রিয় করার জন্য গান তৈরি হবে, এমন ভাবনাও ঠিক নয়। পুরো গানটিই যেন মানুষের মন ছোঁয়, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।”

নেটমাধ্যম ব্যবহার করে বহু শিল্পীই আজকাল ভাইরাল হচ্ছেন। বিষয়টিকে উৎসাহ দেন আকৃতিও। একসময় নিজের গান অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়া এত সহজ ছিল না, জানান আকৃতি। তিনি বলেন, “এখন সহজেই মানুষের কাছে পৌঁছোনো যায়। কিন্তু গানের ক্ষেত্রে অসাধারণ না হলে সেই জনপ্রিয়তা বেশিদিন স্থায়ী হয় না। তাই এক বার বা ক্ষণিকের জন্য খ্যাতি পেলে মানুষ মনে রাখবে না। আরও ভাল করে গাওয়ার জন্য ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।”

বাংলা-প্রীতি

হিন্দিতেও আকৃতির রয়েছে একাধিক জনপ্রিয় গান। ‘স্যাটারডে’, ‘খুদায়া খৈর’, ‘ইসকী উসকী’র মতো গান গেয়েছেন তিনি। বলিউডে বেশ কিছু গান গাইলেও, বাংলা ইন্ডাস্ট্রিকেও নিজের খুব কাছের মনে করেন গায়িকা। বরং তাঁর বক্তব্য, বলিউডের বিনোদনজগতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আধিপত্য আজও বাঙালিদের। হাসতে হাসতেই তিনি বলেন, “বাংলায় কাজ তো করে যেতেই চাই। তবে সবচেয়ে ভাল লাগে এটা দেখে যে, বলিউডেও এমন কোনও ছবি নেই, যেখানে বাঙালিরা নেই। বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তাঁদের উপস্থিতি রীতিমতো উজ্জ্বল।” বাংলায় জিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের পরিচালনাতেই অধিকাংশ গান আকৃতির। তবে অপেক্ষায় ছিলেন অনুপম রায়ের পরিচালনায় একটি গানের। তাঁর কথায়, “অনুপম রায়ের পরিচালনায় একটি গান গেয়েছিলাম। তবে ছবিটি মুক্তি পায়নি। তাই আবার অনুপমের সুরে গাইতে চাই।”

বাংলার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কে কলকাতাকে ভালবেসে ফেলেছেন আকৃতি। বাংলা সঙ্গীতের সঙ্গে বাংলার খাওয়াদাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে আনেন তিনি। বলতে থাকেন, “কলকাতার বিরিয়ানি, বাসন্তী পোলাও,ভোগের খিচুড়ি, শুক্তো, আলু পোস্ত, মোচার ঘন্ট, মাছের ঝোল, চিংড়ি মালাইকারি— এই খাবারগুলি প্রিয়। কলকাতা এলেই আমার বন্ধুরা এগুলি রেঁধে খাওয়ায়।” খাওয়াদাওয়ার প্রসঙ্গেই ব্যক্তিগত জীবনের কথাও উঠে আসে। ২০২৩-এ মা হয়েছেন আকৃতি। রোজের সঙ্গীতের রেওয়াজের সঙ্গে মিশেছে পুত্র মেহরানের বেড়ে ওঠা। এই সফরও উপভোগ করছেন তিনি। “আমি গান গাই বা কাজ করি, ও আমার গানের সঙ্গে নাচতেই থাকে। সব মিলিয়ে এই সময়টা আমার ভালই লাগছে।”

আকৃতি-প্রকৃতি-সুকৃতি, তিন বোনের সমীকরণ

আকৃতির পরিবারে বরাবরই সঙ্গীতের আবহ। গায়িকার দুই বোন প্রকৃতি ও সুকৃতি কক্কড়ও সঙ্গীতশিল্পী। বোনেদের সঙ্গে সঙ্গীতের বন্ধন কেমন? গায়িকার অকপট স্বীকারোক্তি, “অনেকেই জানতে চান, আমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা আছে কি না। কই, কোনও পরিবারে দুই বোন চিকিৎসক হলে তাঁদের তো এমন বলা হয় না! ভাইবোন হিসাবে আমাদের মধ্যে অসাধারণ সমীকরণ। আমরা পরস্পরকে উৎসাহ দিই। আবার কারও কোনও গান পছন্দ না হলেও স্পষ্ট ভাবে তা জানিয়ে দিই। আমি ওদের চেয়ে বড়, ওরা দু’জন যমজ। পরস্পরের জন্য আমরা গলা ফাটিয়ে উৎসাহ দিই।” তবে পরিবারতন্ত্র বা নেপোটিজ়ম নিয়েও স্পষ্ট মত রয়েছে আকৃতির। “আসলে আজকের যুগে শ্রোতারা বুদ্ধিমান। কে স্বজনপোষণ বা পরিবারতন্ত্রের সাহায্যে কাজ পাচ্ছেন, আর কে সত্যিই প্রতিভাবান, তা বুঝতে তাঁদের বেশি সময় লাগে না।”

২০০৪ সাল থেকে ছবিতে গান গাওয়ার সফর শুরু আকৃতির। কেটে গিয়েছে প্রায় দুই দশক। নানা ভাষায় গান গেয়েছেন, নিজে গান বেঁধেছেন, বিচারকের আসনে থেকেছেন। ২০ বছর আগের আকৃতির সঙ্গে আজ হঠাৎ দেখা হয়ে গেলে তাই গায়িকা বলতে চান, “বেশি চিন্তা করার দরকার নেই। অতিরিক্ত চাপ নিয়েও লাভ নেই। ভবিষ্যতে সব ভালই হবে। শুধু নিষ্ঠার সঙ্গে গান গেয়ে এগিয়ে চলো।”

Akriti Kakar

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy