দু’দিন আগেও যা স্বপ্নে ভাবা যায়নি, তা-ই বাস্তব হল নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে। গত কাল রাতে ব্রিকসের পার্শ্বমণ্ডপে আবু ধাবির যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ান। আজ আরও এক ধাপ এগিয়ে পেজ়েশকিয়ান বলেছেন, দু’টি দেশই ‘সম্পর্কের পাতা উল্টে নতুন অধ্যায়’ শুরু করতে চাইছে। যদিও আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর মধ্যেই মন্তব্য করেছেন, উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে ইরানের বৈঠক হল কি না, তিনি তাতে গুরুত্ব দিতে রাজি নন।
মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে দিল্লি আসা পেজ়েশকিয়ান আজ বলেন, “যুদ্ধের মধ্যে এবং পারস্য উপসাগরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলির পর এই প্রথম আবু ধাবির যুবরাজের সঙ্গে আমাদের গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। আমরা সম্পর্কের পুরনো অধ্যায় বন্ধ করে সামনে এগিয়ে যাওয়া এবং একসঙ্গে ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার বিষয়ে একমত হয়েছি।” আবু ধাবির তরফে বক্তব্য, দুই নেতা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, উত্তেজনা প্রশমন, স্থিতিশীলতা এবং অঞ্চলে শান্তি ও উন্নয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করেছেন। গত কয়েক মাসে ইরানের একের পর এক হামলার মুখে পড়েছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির বিভিন্ন শহর। তেহরানের অভিযোগ, আমিরশাহি আমেরিকার ‘প্রক্সি’। অন্য দিকে, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ নিয়ে ব্রিকসের ঘোষণাপত্রে কী ভাষা ব্যবহার করা হবে, তা নিয়েও গত ছ’মাস ইরান ও আমিরশাহির মধ্যে মতপার্থক্য ছিল। মে মাসে ব্রিকস-এর বিদেশমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে এই দুই রাষ্ট্রের সংঘাতের কারণে যৌথ ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা যায়নি। সেই প্রেক্ষাপটে শনিবার ব্রিকস সম্মেলনে ভারত বহু প্রতীক্ষিত ঐকমত্যে পৌঁছতে সক্ষম হয়, ইরান ও আমিরশাহির নেতৃত্বও পৃথক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেন।
‘পাতা উল্টে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করার’ ভূকৌশলগত ব্যাখ্যা কী, তা নিয়ে চর্চা শুরু হয়ে গিয়েছে ব্রিকস-পরবর্তী পর্যায়ে। প্রাথমিক ভাবে জ্বালানি নিরাপত্তার প্রসঙ্গ তুলছেন দু’দেশের বিশেষজ্ঞরা। হরমুজ় প্রণালীতে নতুন করে কোনও ধরনের অস্থিরতা তৈরি না হওয়াটা নিশ্চিত করা সংযুক্ত আরব আমিরশাহির স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। কারণ, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি রফতানি এই পথ দিয়েই বিশ্বের বাজারে পৌঁছয়। বর্তমান সংঘাত ইতিমধ্যেই জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করেছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সংলাপ এমন একটি আঞ্চলিক যোগাযোগের পথ তৈরি করতে পারে, যার মাধ্যমে তেল পরিকাঠামো, বন্দর এবং সমুদ্রপথকে সংঘাতের বাইরে রাখার চেষ্টা করা সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, আরব দেশগুলি সামরিক ক্ষেত্রে আমেরিকার সঙ্গে সহযোগী ঠিকই। কিন্তু তারা বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্লান্তও বটে। অনির্দিষ্ট কাল ধরে চলা আমেরিকা–ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে থাকা যে তাদের পোষাচ্ছে না, তা এই বৈঠক স্পষ্ট করেছে। মনে করা হচ্ছে, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি আমেরিকার ছত্রচ্ছায়া বজায় রেখেই তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের দরজাটি খোলা রাখতে চাইছে। ট্রাম্পের মন্তব্য এই প্রেক্ষাপটেই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠছে। তিনি যতই বৈঠকটিকে হালকা করে দেখাতে চান না কেন, এ দিকে যে তাঁর নজর রয়েছে, সে কথা তাঁর মন্তব্যেই প্রকাশ। আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরান যুদ্ধ শেষ হতে পারে বলে ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি।
তৃতীয়ত, এই বৈঠক ভবিষ্যতে ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সৌদি আরব ও ওমানকে নিয়ে বৃহত্তর উপসাগরীয় কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সূচনা করতে পারে বলেও চর্চা শুরু হয়েছে। যদি উপসাগরীয় দেশগুলি সম্মিলিত ভাবে হরমুজ়কে ঘিরে যুদ্ধবিরতি বা নিরাপত্তা-ব্যবস্থার পক্ষে চাপ তৈরি করে, তা হলে সামরিক চাপের বদলে আলোচনার পথে যেতে আমেরিকার উপরেও চাপ বাড়বে।
তবে এই একটি বৈঠককেই কেন্দ্র করে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি যে ওয়াশিংটন-বিরোধী হয়ে উঠবে মনে করছে না কূটনৈতিক শিবির। কারণ আবু ধাবি তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে ওয়াশংটনের উপর যথেষ্ট নির্ভরশীল। তাই এই বৈঠককে কৌশলগত ভাবে উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা বলেও দেখা হচ্ছে। তবে ভারতের জন্য ঘটনাটা গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে তেহরান, উপসাগরীয় আরব দেশ এবং পশ্চিম বিশ্বের মধ্যে নয়াদিল্লি একটি সেতুর ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে, কোনও একটি পক্ষকে বেছে নেওয়ার দায় এড়িয়ে।