নিজের সব শক্তি দিয়ে ককপিটের দরজাটা খুলে ফেলেছিলেন স্মিত মচ্ছর। আর তাতেই ফ্লাইদুবাই বিমানের বাকি সওয়ারিরা জানতে পেরেছিলেন, সেখানে কী চলছিল। বুধবারের সেই মুহূর্তের কথা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে বললেন পাইলট স্মিত। জানালেন, সেই বিপদের সময়ে হনুমান চল্লিশা পাঠ করে গিয়েছিলেন তিনি। একা স্মিত নন, সেই তেল আভিভগামী বিমানে আরও এক ‘হিরো’র গল্প এ বার প্রকাশ্যে এসেছে। সে হল ছয় বছরের এক খুদে। শৌচালয়ে গিয়ে সেই নিনা মানেসই প্রথম বুঝতে পেরেছিল, ককপিটের ভিতরে কিছু একটা হচ্ছে। সেই মতো সতর্ক করেছিল বাকিদের। হামলাকারীর বিষয়ে এখনও তেমন ভাবে কিছু প্রকাশ করা হয়নি। তবে ইজ়রায়েল সেই সন্দেহভাজনকে নিজের দেশে নিয়ে গিয়ে জেরা করতে চেয়েছে।
বুধবার ফ্লাইদুবাইয়ের এফজ়েড ১০৭৩ বিমানটি দুবাই থেকে তেল আভিভে যাচ্ছিল। বিমান যখন ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায়, তখন ককপিটে পাইলটকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপান সহ-পাইলট। শুধু তা-ই নয়, বিমানটিকে তিনি ‘ক্র্যাশ’ করানোর চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ। সহ-পাইলটের ধারালো অস্ত্রের কোপে গুরুতর আহত হয়েও বিমানের পুরো নিয়ন্ত্রণ সহকারী চালককে নিতে দেননি ভারতীয় পাইলট স্মিত। তাঁর মাথা, হাতে এবং শরীরে বিভিন্ন জায়গায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ। বিমানের এক চিকিৎসক যাত্রী মাঝ-আকাশে স্মিতের চিকিৎসা করেন। বিমানটি সৌদি আরবে জরুরি অবতরণ করার পর সেখানেই চিকিৎসা চলছিল তাঁর। পরে তাঁকে আবু ধাবিতে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়।
হাসপাতালে বসেই শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন স্মিত। বুধবার বিমানে কী হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রীকে তার বর্ণনাও দেন ভারতীয় এই পাইলট। তিনি বলেন, “১৭ বছর ধরে বিমান চালাচ্ছি। গত ১১ বছর ধরে ক্যাপ্টেনের ভূমিকা পালন করছি। আমি জানতাম, একটা শেষ চেষ্টা করতে হবে। কোনও রকমে ককপিটের দরজাটা খুলে দিই। ফলে সবাই ভিতরে ঢুকতে পেরেছিলেন।” স্মিতের প্রশংসা করেন মোদীও।
অন্য দিকে, এই ঘটনায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তিনি জানান, যাঁদের নির্দেশে ওই পাইলট এ হেন কাণ্ড ঘটিয়েছেন, তাঁদের বড় মূল্য চোকাতে হবে! ইজ়রায়েলের বিদেশমন্ত্রী জিডিয়ন সার জানান, তাঁরা অভিযুক্তকে দেশে ফিরিয়ে জেরা করাতে উদ্যোগী হয়েছেন। অভিযুক্ত সহকারী পাইলটকে জিজ্ঞাসাবাদের পর সংযুক্ত আরব আমিরশাহির হাতে তুলে দিয়েছে সৌদি আরব। আদতে ওমানের বাসিন্দা হলেও ওই সহ-পাইলট কাজ করতেন আমিরশাহির ‘ফ্লাইদুবাই’ বিমানসংস্থায়। এই ঘটনার নেপথ্যে কে বা কারা, সেই নিয়ে তদন্ত চলছে। এই ঘটনায় ইরান-যোগ রয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তেমন সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দিচ্ছেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। বিষয়টি প্রমাণিত হলে ইরানকে কঠোর জবাব দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন তিনি। ফ্লাইদুবাইয়ের ঘটনার পর ইজ়রায়েলের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
নিরাপত্তায় আপস
ফ্লাইদুবাইয়ের ঘটনার পর ইজ়রায়েলের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও গত কয়েক বছরে ওমানি পাইলটেরা দুবাই থেকে তেল আভিভে ফ্লাইদুবাইয়ের বিমান চালিয়েছেন। নিষেধাজ্ঞার পরেও কী ভাবে ওমানি পাইলটদের ইজ়রায়েলের পথে বিমান চালানোর অনুমতি দেওয়া হল, সেই প্রশ্ন জোরালো হতে শুরু করেছে। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইজ়রায়েলের সঙ্গে যে সব দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই সেই সব দেশের পাইলটদের নেতানিয়াহুর দেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সেই তালিকায় রয়েছে ওমান। ঘটনাচক্রে, দেখা গিয়েছে, ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানে ভারতীয় পাইলটের উপর হামলাকারী সহ-পাইলট এক জন ওমানি। টাইমস অফ ইজ়রায়েল-সহ বেশ কয়েকটি বিদেশি সংবাদমাধ্যম অন্তত তেমনই দাবি করছে।
মোদীর সঙ্গে কথা
শুক্রবার সকালে ভিডিয়ো কলে স্মিতের সঙ্গে কথা বলেন মোদী। প্রধানমন্ত্রী আরও এক বার মচ্ছরের সাহসিকতার প্রশংসা করেন। মোদীর সঙ্গে কখা বলে দৃশ্যতই আবেগাপ্লুত স্মিত জানান, বিপদের সময় কী ভাবে তিনি সাহস সঞ্চয় করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সময়েও স্মিতের মাথায় ব্যান্ডেজ এবং নাকে অক্সিজেনের নল ছিল। মোদীকে স্মিত জানান, যখনই তিনি বিপদে পড়েন, তখনই হনুমান চালিশা পাঠ করেন। বুধবার বিমানে সহকারী পাইলটের হাতে আক্রান্ত হওয়ার পরেও মনের জোর বাড়াতে তা-ই করেছিলেন তিনি। স্মিতের প্রশংসা করে মোদী বলেন, “এ বার দেশ গর্ব করে বলতে পারবে যে, ভারতীয়রা জীবন কেড়ে নেয় না, বরং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্যদের বাঁচায়।” ভারতীয়দের গর্বিত করার জন্য স্মিতকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।
খুদের চিৎকার
একা স্মিত মচ্ছর নন, ছয় বছরের নিনাও এখন ‘হিরো’। তেল আভিভগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একেবারে সামনের আসনে বসেছিল মানেস পরিবার। ছোট্ট নিনার একটা আর্ত চিৎকারেই প্রকাশ্যে এসেছিল ককপিট-কাণ্ড। তার পরেই নিনার বাবা টিজ়িভিকা মানেসই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন হামলাকারীরা উপরে। প্রাণ বাঁচে স্মিত এভং ক্রু-সহ বিমানের ১৮০ সওয়ারির। নিউ ইয়র্ক টাইমস-কে ফোনে ইজ়রায়েল থেকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন মানেস। তিনি ইজ়রায়েলের ব্যাঙ্ক লিউমির সিইও। সেই সূত্রেই জানা গিয়েছে বুধবারের সেই ঘটনা। ফ্লাইদুবাই ফ্লাইট এফজ়েড১০৭৩ তখন মাঝ-আকাশে। মা টালি মানেসের সঙ্গে শৌচালয়ে গিয়েছিল ছোট্ট নিনা। তার পাশেই ছিল ককপিট। শৌচালয়ের ভিতর থেকেই সে শোনে, ককপিটে কিছু একটা ঝামেলা চলছে। কারা যেন জোরে জোরে ঝগড়া করছেন! কিছু একটা হচ্ছে আঁচ করে শৌচালয়ের দরজা খুলে চিৎকার করে নিনা, ‘‘বাবা আমরা মরতে চাই না।’’ তাতেই সজাগ হন নিনার বাবা এবং অন্য যাত্রীরা। ককপিটের ভিতরে যা ঘটছিল, তা প্রকাশ্যে আসে।
আরও পড়ুন:
ট্রাম্পের ইঙ্গিত
ইজ়রায়েলগামী বিমানের ককপিটে সহ-পাইলটের হাতে আক্রান্ত হয়েছিলেন পাইলট। এই ঘটনায় ইরান-যোগ রয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তেমন সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দিচ্ছেন না ট্রাম্পও। বিষয়টি প্রমাণিত হলে ইরানকে কঠোর জবাব দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন তিনি।
অন্য দিকে, অভিযুক্ত সহকারী পাইলটকে জিজ্ঞাসাবাদের পর সংযুক্ত আরব আমিরশাহির হাতে তুলে দিয়েছে সৌদি আরব। আদতে ওমানের বাসিন্দা হলেও ওই সহ-পাইলট কাজ করতেন আমিরশাহির ‘ফ্লাইদুবাই’ বিমানসংস্থায়।
নেতানিয়াহুর হুঁশিয়ারি
ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু হুঁশিয়ারির সুরে জানান, যাঁদের নির্দেশে ওই পাইলট এ হেন কাণ্ড ঘটিয়েছেন, তাঁদের বড় মূল্য চোকাতে হবে! ‘ফক্স নিউজ়’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘ফ্লাইদুবাই’ বিমানে হামলার ঘটনা নিয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন নেতানিয়াহু। তিনি জানান, আক্রমণকারী পাইলটকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এখনও পর্যন্ত জানা গিয়েছে ওই পাইলট ইসলামপন্থী চরমপন্থায় দীক্ষিত হয়েছিলেন। শুধু তা-ই নয়, যাত্রী-সহ বিমানটিকে ধ্বংস করার অভিসন্ধি ছিল ওই পাইলটের। নেতানিয়াহু বলেন, ‘‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছবিটা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। ওঁকে কেউ পাঠিয়েছিলেন কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। যে বা যাঁরা তাঁকে পাঠিয়েছেন, তাঁদের চরম মূল্য দিতে হবে।’’