মোদী সরকার আগেই ঘোষণা করেছিল, এ বার জনগণনার সঙ্গে দেশের জাতগণনা হবে। তবে জনগণনার মূল পর্ব আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু হওয়ার আগে যে তথ্য সামনে এসেছে, তাতে জাত-তথ্য জানানো ঐচ্ছিক। যে প্রশ্নমালা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের আওতাধীন রেজিস্ট্রার জেনারেল অব ইন্ডিয়া প্রকাশ করেছে, তাতে তফসিলি জাতি (এসসি) এবং তফসিলি জনজাতি (এসটি) সংক্রান্ত প্রশ্ন (এসসি/এসটি/কাস্ট) থাকলেও ওবিসি (অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি) সংক্রান্ত কোনও তথ্য চাওয়ার উল্লেখ নেই এখনও। ভারত জোড়ো যাত্রায় বেরিয়ে রাহুল গান্ধী দাবি তুলেছিলেন, এসসি, এসটি-র সঙ্গে এ দেশে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি বা ওবিসি-র সংখ্যা এবং তাঁদের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি জানা দরকার।
২৫ জানুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাড়ি বাড়ি গিয়ে জনশুমারির মূল পর্বে ৪০টি প্রশ্নের জবাব বাসিন্দাদের থেকে নেওয়ার কথা। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ— জাত-তথ্য। জানতে চাওয়া হবে, জন্মস্থানের (কোন দেশ বা এলাকা) তথ্য, কোন ধর্মাবলম্বী। জানতে চাওয়া হতে পারে, জাত কী (ব্রাহ্মণ-কায়স্থ ইত্যাদি)। এসসি, এসটি শ্রেণিভুক্ত হলেও, নির্দিষ্ট জাত কী তা জানতে চাইতে পারেন সমীক্ষক। কিন্তু সূত্রের দাবি, সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ঐচ্ছিক। কেউ চাইলে সেই তথ্য সমীক্ষকের কাছে প্রকাশ না-ও করতে পারেন।
স্বাধীন ভারতে এই প্রথম জনগণনার সময় জাত জানতে চাওয়া হলেও, তা জানাতে বাধ্য নন কেউ।
বিরোধীদের বক্তব্য, ওবিসি-দের আসল সংখ্যা প্রকাশ হলে সেই অনুযায়ী ওবিসি-দের সংরক্ষণ দেওয়ার দাবি উঠবে। অনেকেরই অনুমান, দেশে ওবিসি-শ্রেণিভুক্তদের সংখ্যা ৫০ শতাংশ বা তার বেশি। ওবিসি-দের জন্য সংরক্ষণ বাড়াতে হলে উচ্চবর্ণ ক্ষুব্ধ হবে। এই জাঁতাকলে পড়ে প্রথমে জাতগণনায় রাজি না হলেও পরে ওবিসি ভোট হারানোর ভয়ে মোদী সরকার জাতগণনার ঘোষণা করে। কিন্তু বাস্তবে জাতগণনা বা ওবিসি-দের আসল সংখ্যা নির্ধারণ করতে চাইছে না কেন্দ্র। প্রশাসনিক সূত্রের পাল্টা দাবি, সরকারি স্তরে দেশে বিপুল সংখ্যক উপভোক্তা রয়েছেন বহু স্তরে। ফলে সেখান থেকেই জাত-তথ্য সবিস্তারে পাওয়া যায়। সেই কারণে প্রশ্নমালায় সেগুলি বাধ্যতামূলক করার তেমন প্রয়োজন নেই।
প্রশ্ন থাকবে, কোভিড টিকাকরণ হয়েছে কি না এবং হয়ে থাকলে তা কোথায় হয়েছে, তার উত্তর দিতে হবে। জানাতে হবে, ক’টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। অবশ্য অ্যাকাউন্ট নম্বর চাওয়া হবে না। পাশাপাশি, আধার-ভোটার নম্বর, ফোন নম্বর জানতে চাইবেন সমীক্ষক। তবে এই প্রশ্নগুলিও ঐচ্ছিক। যদিও এ দেশের পাসপোর্ট থাকলে, তার নম্বর দিতে হবে।
প্রথম দফায় গৃহগণনার সময়ে যে প্রশ্নগুলি রাখা হয়েছিল, তা মোটামুটি সংশ্লিষ্ট বাড়ি এবং তার পরিস্থিতি সম্পর্কে। দ্বিতীয় দফায় যে প্রশ্নমালা তৈরি হয়েছে, তাতে দেশের বাসিন্দাদের সামাজিক, ধর্মীয়, জাতিগত, পারিবারিক এবং আর্থিক বিষয়ের সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব।
সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন যে, জনশুমারির মাধ্যমে যে তথ্য পাওয়া যায়, তার ভিত্তিতে সরকারি পরিকল্পনা করা হয়। মানুষের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির উন্নতি বা অবনতি ধরা পড়লে প্রকল্পের পরিমার্জন-সংশোধন বা নতুন প্রকল্পের পরিকল্পনা করে সরকার। রাজ্যগুলি যে কেন্দ্রীয় অনুদান পায়, তা অনেকাংশে নির্ভর করে সেই রাজ্যের মানুষের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির উপরে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, যে ভাবে মানুষের পরিচয়-তথ্য গ্রহণ করা হবে, তার ভিত্তিতে রাজনৈতিক পরিকল্পনা পরিমার্জিত হতে পারে। জনগণনার পরবর্তী ধাপে দেশের লোকসভা আসনে হেরফেরও ঘটতে পারে জনসংখ্যার নিরিখে। তা-ও বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিকল্পনার অঙ্গ হয়ে উঠতে পারে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, জনগণনার চূড়ান্ত পর্যায়ে অনলাইনে নিজে থেকে তথ্য দেওয়ার সময়সীমা হবে ২০২৭ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে ২৪ জানুয়ারি।