Advertisement
E-Paper

বাড়ছে হার্টের রোগ, কী ভাবে সামলে রাখবেন হৃদয়কে?

পৃথিবী জুড়ে বাড়ছে হার্টের রোগ। অল্প বয়সেও ছাড় মেলে না। তাই সাবধান হতে হবে অনেক আগে থেকেইইঙ্গিত এমনই মোক্ষম যে, কখনও কখনও এমারজেন্সি অবধি পৌঁছনোর সুযোগটুকুও মেলে না। চিকিৎসা শুরুই করা যায় না। 

পৌলমী দাস চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ০০:১০
মডেল: তৃণা, ছবি: অমিত দাস। মেকআপ: মৈনাক দাস। পোশাক:ভেরো মোদা, কোয়েস্ট মল

মডেল: তৃণা, ছবি: অমিত দাস। মেকআপ: মৈনাক দাস। পোশাক:ভেরো মোদা, কোয়েস্ট মল

আমাদের হৃদযন্ত্রটির হাবভাব বোঝা শক্ত। দিব্যি চলছে। সপ্তাহান্তের আড্ডা, নেমন্তন্ন বাড়ি, লং ড্রাইভ— কোথাও কোনও সমস্যা নেই। আচমকাই বুকের উপর যেন হাতি চেপে বসার মতো চাপ, শ্বাসকষ্ট এবং দৌড় এমারজেন্সির দিকে। পরীক্ষানিরীক্ষার পর জানা গেল হৃদযন্ত্রটি যে এ বার কাজে জবাব দেবে, তা আগাম জানিয়ে রাখল। এই ইঙ্গিত এমনই মোক্ষম যে, কখনও কখনও এমারজেন্সি অবধি পৌঁছনোর সুযোগটুকুও মেলে না। চিকিৎসা শুরুই করা যায় না।

তাই হার্টের যত্ন নিন। সমস্যা শুরুর অনেক আগে থেকেই। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ড. বিশ্বজিৎ ঘোষদস্তিদার জানালেন, হার্টের ক্ষেত্রে প্রধান ছ’টি রিস্ক ফ্যাক্টর হল— ওবেসিটি, ডায়াবিটিস, হাইপার টেনশন বা হাই ব্লাডপ্রেশার, হাই কোলেস্টেরল, ধূমপানের অভ্যেস এবং হার্টের রোগের পারিবারিক ইতিহাস। এদের মধ্যে একমাত্র ধূমপানের অভ্যেসটাই সম্পূর্ণ ভাবে মানুষের নিজের হাতে। ধূমপান থেকে নিজেকে একেবারে সরিয়ে রাখলে হার্টের অসুখের আশঙ্কা অনেকটা কমানো যায়। অন্য তিনটি রোগ অর্থাৎ ডায়াবিটিস, ব্লাডপ্রেশার এবং কোলেস্টেরল— তিনটেই লাইফস্টাইল এবং পারিবারিক সূত্রে পাওয়া। জিনকে পালটানো যায় না। কিন্তু লাইফস্টাইল পরিবর্তন সম্ভব। এবং তাতে হার্টের এই তিন চরম শত্রুকে অনেকটাই আটকে রাখা যায়।

শুরু হোক ছোট থেকেই

ব্লাডপ্রেশার, কোলেস্টেরল, ডায়াবিটিসের মতো রোগ আগে সাধারণত বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়ত। তাই হার্টের অসুখও ধরত বেশি বয়সে। বেশি বয়সে হার্ট কমজোরি হবে, নানা জটিল রোগ এসে বাসা বাঁধবে, এমনটাই ভাবা হত। কিন্তু এখন খুব অল্প বয়সেই প্রেশার, সুগারের মতো রোগ কড়া নাড়ছে। ১৫-১৬ বছর বয়সেই প্রেশার বা সুগার ধরেছে— এমন উদাহরণও বিরল নয়। সংখ্যাটাও বাড়ছে ক্রমশ। তাই ডায়েট আর এক্সারসাইজ়ের মধ্য দিয়ে লাইফস্টাইল বদলাতে হবে খুব ছোট বয়স থেকেই। বিশেষ করে ওজন ঠিক রাখা শিশু বয়স থেকেই দরকার। ড. ঘোষদস্তিদার জানালেন, বাচ্চার অতিরিক্ত ওজন মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়। মায়েদের মধ্যে এই সচেতনতাটা থাকা দরকার। বাচ্চা রোগা হলেই মায়েরা ডাক্তারের কাছে ছোটেন ওজন কেন বাড়ছে না বলে। এই চিন্তার ভিতরেই গলদ রয়েছে। ছটফটে, সুস্থ বাচ্চার স্বাভাবিক ওজনই কাম্য। বরং অতিরিক্ত পরিমাণে মাখন, চিজ়, চকলেট, আইসক্রিম এবং জাঙ্ক ফুড থেকে তাকে বাঁচিয়ে রাখা দরকার। কারণ বাড়তি ফ্যাট এক বার শরীরে লাগলে তা ঝরানো খুব শক্ত। এবং অতিরিক্ত মোটা মানেই নানা রোগের সূচনা।

পাশাপাশি চার-পাঁচ বছর থেকেই বাচ্চাকে এক্সারসাইজ়ের দিকে ঠেলে দিতে হবে। অন্তত গ্যাজেটের বাইরে খোলামেলা জায়গায় প্রতি দিন খানিকটা সময় ঘাম ঝরানো দরকার তাদের। ছোটবেলার এই অভ্যেস পরবর্তী জীবনেও ধরে রাখতে পারলে অকালে শরীরটা রোগের বাসা হওয়ার হাত থেকে বাঁচবে।

দূরে থাকুক স্ট্রেস

মনের সঙ্গে হার্টের যোগ বেশ ঘনিষ্ঠ। মন যদি ভাল না থাকে, তার উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, হার্টও তখন ভাল থাকে না একেবারেই। মন ভাল না থাকার সমস্যা সারা পৃথিবী জুড়েই বাড়ছে। বিশেষ করে অল্পবয়সিদের মধ্যে মানসিক রোগ থাবা বসাচ্ছে। যে কোনও ধরনের স্ট্রেস থেকেই কিছু কিছু হরমোন তৈরি হয় আমাদের শরীরে, যার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে হার্টের উপর। তা ছাড়া অতিরিক্ত স্ট্রেস হার্টের অন্য রিস্ক ফ্যাক্টরগুলোকেও বাড়িয়ে তোলে। যেমন, মানসিক চাপ থেকে ব্লাডপ্রেশার বাড়তে পারে। কেউ কেউ মানসিক চাপ কাটাতে অতিরিক্ত ধূমপান করেন। ডিপ্রেশন চলাকালীন অনেকে বেশি খেয়ে ফেলেন। শেষমেশ এই সব কিছুর ফল ভোগ করে হৃদযন্ত্রটি। তাই চাপ কাটাতেই হবে। প্রথমে চিনে নিতে হবে স্ট্রেসের কারণগুলো।

তার পর ছোট ছোট সহজ সমাধানের মধ্য দিয়ে চাপমুক্ত হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। যেমন, অফিসে যাওয়ার আগে প্রতিদিন রাস্তার ট্রাফিক জ্যাম যদি স্ট্রেসের কারণ হয়, তা হলে বাড়তি সময় হাতে নিয়ে বেরোতে হবে।

গ্যাস-অম্বল নয়

গ্যাস অম্বলের ব্যথার সঙ্গে হার্টের ব্যথার পার্থক্য করা খুব মুশকিল। তাই অনেকেই বুকে চাপ, ব্যথাকে অম্বলের ব্যথা ভেবে বাড়িতেই নিজের মতো চিকিৎসা শুরু করে দেন। চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়েই বোতল বোতল অ্যান্টাসিড খেয়ে নেন। এতে পরে আরও ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ড. এস বি রায় জানালেন, যাঁর কোনও দিন গ্যাস-অম্বলের ধাত ছিল না, তাঁরও হঠাৎ এক দিন গ্যাসের ব্যথা শুরু হলে এবং নির্ধারিত মাত্রায় অ্যান্টাসিড খেয়েও আরাম না মিললে, সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সঙ্গে যদি কোনও রিস্ক ফ্যাক্টর থাকে, তা হলে তো আরও সাবধান! এ ক্ষেত্রে ইসিজি করে দেখে নেওয়া হয় হার্টের সমস্যা কি না। সাধারণ ভাবে গ্যাস-অম্বলের ব্যথা এক ঘণ্টার বেশি স্থায়ী হলে এবং সাধারণ অ্যান্টাসিডে তা না কমলে দেরি না করেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এই বাড়তি সাবধানতা থাকলে হৃদরোগে বড়সড় ক্ষতি অনেকটাই আটকানো যায়।

মেয়েরা পিছিয়ে নেই

মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের হার্ট অ্যাটাক বেশি হয়— এই ধারণার কোনও জায়গা নেই এখন। যদিও, শারীরিক ভাবে মেয়েদের হৃদযন্ত্র অনেকটাই সুরক্ষিত। বিশেষত, নারী যত দিন অবধি সন্তান ধারণে সক্ষম থাকে, সেই সময় ইস্ট্রোজেন হরমোনের প্রভাব এই মারণ রোগ থেকে অনেকটাই আগলে রাখে। কিন্তু সময় বদলেছে। ফলে তিরিশ পেরোলেই প্রেশার, সুগার, কোলেস্টেরলের চোখরাঙানি মহিলাদের মধ্যেও হামেশাই দেখা যায়। ড. রায়ের মতে, এই রিস্ক ফ্যাক্টরগুলো ইস্ট্রোজেনের সুরক্ষার বর্মকে অনেকখানি অকেজো করে দেয়। সঙ্গে মহিলাদের বাড়ির পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রের চাপও একই ভাবে বইতে হয়। ফলে তাদের মধ্যে অত্যধিক হারে বাড়ছে স্ট্রেসের পরিমাণ। বাইরের খাবারে অভ্যস্ত জীবনে ডায়াবিটিস, স্থূলতার সমস্যা তো আছেই। শরীর ঠিক রাখতে প্রয়োজনীয় এক্সারসাইজ়ের সুযোগটুকুও পান না অধিকাংশ মহিলা। ফলে, তাঁদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের হারও ইদানীং অনেক বেড়েছে।

তা সত্ত্বেও মেনোপজ়ের আগে পর্যন্ত মেয়েরা কিছুটা সুরক্ষা পান প্রাকৃতিক ভাবেই। মেনোপজ়ের চার-পাঁচ বছর পরও সেই রক্ষাকবচ থেকে যায়। কিন্তু তার পরই হৃদরোগের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের পার্থক্য প্রায় থাকে না বললেই চলে। তাই চল্লিশ পেরোলেই মহিলাদের বাড়তি যত্ন নেওয়া উচিত নিজের শরীরের প্রতি। পরিমিত খাওয়াদাওয়া, হেলদি লাইফস্টাইল, নিয়মিত এক্সারসাইজ় এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর চেকআপ অনেকটাই সামলে রাখতে পারে হৃদযন্ত্রকে। সেটা মহিলাদের ক্ষেত্রে যেমন সত্যি, পুরুষদের ক্ষেত্রেও তেমনই।

Heart Heart care Health tips

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy