একটি প্রদর্শনী যখন অতীত ও বর্তমানের শিল্পচর্চাকে পাশাপাশি নিয়ে আসে, তখন তা শুধু ছবির সমাবেশ থাকে না। সময়ের সঙ্গে শিল্পের সম্পর্কও সেখানে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সেন্সোরিয়ামের উদ্যোগে, কিউরেটর শৌনক চক্রবর্তীর পরিকল্পনায় ললিত কলা অকাদেমির গ্যালারি টু-এ আয়োজিত ভিভিড ইকোজ় সেই সময়ের প্রতিধ্বনিকেই সামনে আনে। যামিনী রায় থেকে পরিতোষ সেন, সোমনাথ হোর, বি আর পানেসর, শানু লাহিড়ী প্রমুখকে পেরিয়ে সমকালীন শিল্পীদের কাছে পৌঁছনোই এই প্রদর্শনীর মূল ভাবনা।
এর বৈশিষ্ট্য শুধু প্রজন্মের বিস্তারে নয়, নির্বাচনের মধ্যেও। বহুল পরিচিত কাজের বদলে কিছু অপেক্ষাকৃত কম দেখা ছবিকে সামনে আনা হয়েছে। সুহাস রায়ের চেনা ‘রাধা’-র পরিবর্তে তাঁর ল্যান্ডস্কেপ, পরিতোষ সেনের ‘রুগ্ণ নবাব’ কিংবা ১৯৫৪ সালের এম এফ হুসেনের কাজ— এই নির্বাচন শিল্পীদের পরিচিত চেহারার বাইরে অন্য একটি শিল্পভুবন দেখার সুযোগ দেয়। কিউরেটর শৌনক চক্রবর্তীর ভাবনা ছিল, বাণিজ্যিক ভাবে পরিচিত ফরম্যাট নয়, শিল্প-ইতিহাসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ চিহ্নকে পাশাপাশি রাখাই এই প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য।
প্রতিধ্বনি: ললিত কলা অকাদেমিতে আয়োজিত প্রদর্শনী ‘ভিভিড ইকোজ়’-এর চিত্রকর্ম। — নিজস্ব চিত্র।
পরিতোষ সেনের ছবিতে মানুষের অবয়ব বাস্তবতার সীমা পেরিয়ে গতি ও ছন্দে পৌঁছয়। রেখা, রঙের ছিটে এবং মুহূর্তের অভিব্যক্তি মিলিয়ে চরিত্রগুলি যেন চলমান। রেবা হোরের কাজে আবার গাঢ় বাদামি, কালো, লাল ও হলুদের তীব্র রেখাচালনা তৈরি করে অস্থির এক পরিসর। বিপরীতে গণেশ পাইনের ছোট ছবিতে সূক্ষ্ম রেখা ও ধূসর-সবুজের স্তর খুলে দেয় পুরনো স্মৃতির দরজা। তাঁর নারীমূর্তির মধ্যে বিষণ্ণতা ও নিঃসঙ্গতার কাব্যিক আবহ অনিবার্য ভাবে ফিরে আসে।
স্বল্প রেখায় রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্কেচ অবলীলায় যেন একটি মুহূর্তকে ধরে রাখে। গোয়াশের বুনটে সাদার রিলিফে বিষয়কে তুলে ধরেছেন মকবুল ফিদা হুসেন। ছোট বর্গাকৃতি জমিতে হাতির চলমান ছন্দ, হুসেনের নিপুণ রেখাচালনায় ক্লাসিক রূপ নেয়। প্রকাশ কর্মকারের নারী অবয়ব কয়েকটি প্রবহমান রেখায় নির্মিত, সেখানে শরীরের বাঁক ও স্বতঃস্ফূর্ততাই হয়ে ওঠে প্রধান ভাষা। সুনীল দাসের মুখাবয়বে রেখার দৃঢ়তা ও শক্তিশালী ড্রয়িংয়ের পরিচয় স্পষ্ট।
প্রতিধ্বনি: ললিত কলা অকাদেমিতে আয়োজিত প্রদর্শনী ‘ভিভিড ইকোজ়’-এর চিত্রকর্ম। — নিজস্ব চিত্র।
অন্য দিকে রবীন মণ্ডলের গাঢ় পটভূমিতে বসে থাকা নারী নিঃসঙ্গতার এক তীব্র প্রতিরূপ। দীর্ঘ শরীর, ভারী রেখা এবং উজ্জ্বল লাল পোশাক তেলরঙের অনুভূতিকে আরও ঘনীভূত করেছে। শানু লাহিড়ীর মাটিরঙা তৈলচিত্রে উপবিষ্ট নারী শান্ত এবং আত্মমগ্ন। সংযত রেখা ও কোমল টোনে এক ধরনের স্থিরতা থাকলেও, চোখের দৃষ্টি ছবির নির্দিষ্ট সীমানা মুছে দেয়। যোগেন চৌধুরীর কাজ মূলত রেখানির্ভর। ভাঙা-গড়া মুখাবয়বে, কিছুটা ব্যঙ্গাত্মক ইঙ্গিতে তাঁর পরিচিত শিল্পভাষা উঠে আসে। সম্পূর্ণ অন্য পরিমণ্ডলের ছবির স্রষ্টা গণেশ হালুই। এখানে নির্দিষ্ট দৃশ্যের বদলে রঙের স্তর, রেখার গতিপথ এবং ভূমির মতো বিস্তৃত অনুভূতি প্রধান হয়ে উঠেছে। হালকা জলরঙের সরু সরু রেখা পাশাপাশি চলতে চলতে একটি বিমূর্ত ভূদৃশ্য তৈরি করে।
একই ভাবে সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়ের সাদা-কালো ড্রয়িং তাঁর রঙিন কাজের পরিচিত পরিসর থেকে সরে এসে, রেখার নিজস্ব শক্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। অতিরিক্ত বিবরণে না গিয়ে কালো কালির সীমিত রেখায় নারী-পুরুষের অবয়বী ভঙ্গি আনেন শিল্পী। কৃষ্ণেন্দু চাকীর পাখির ফর্মে রং, রেখা ও চিহ্নের সমন্বয়ে দেখা যায় নতুন নির্মাণভাষা। পাখির অবয়বকে সরল ও প্রায় জ্যামিতিক ফর্মে ভেঙে, তার ভিতরে বিবিধ রং, রেখা এবং চিহ্নের দ্বারা আকৃষ্ট করার মতো ক্ষমতা রেখেছেন শিল্পী। শুভাপ্রসন্নের সাম্প্রতিক কাজগুলির মধ্যে ফুলের ছবিটি বিশেষ উল্লেখ্য। গাঢ় কালো পটভূমিতে কমলা ও সাদা ফুলের বাঁকানো রেখার হিন্দোল ও রঙের আলঙ্কারিক স্তর এক অন্তর্মুখী জগৎ তৈরি করে।
প্রতিধ্বনি: ললিত কলা অকাদেমিতে আয়োজিত প্রদর্শনী ‘ভিভিড ইকোজ়’-এর চিত্রকর্ম। — নিজস্ব চিত্র।
ভারতীয় নারীমূর্তির প্রতিরূপ মনে হলেও, শিল্পী শিপ্রা ভট্টাচার্য নিজস্ব ভঙ্গিতে সরল করে নিয়েছেন নারীমূর্তি। অবয়বের সঙ্গে রঙের মসৃণ ব্যবহার লক্ষণীয়। গাঢ় চিত্রপটে নারীর চোখ, ঠোঁট ও আবরণ— সবই প্রায় সমতল প্রলেপে নির্মিত। লাল ও সবুজের উষ্ণ অভ্যর্থনায় ছবির আবহ প্রাণ পায়। শমিতা বসুর ‘অশোকবনে সীতা’-য় উজ্জ্বল ভিরিডিয়ান গ্রিনের ঘন আঁধারে বসে থাকা এক নারী। সাদা ডিম্বাকৃতি মুখ। মুখের অভিব্যক্তির পরিবর্তে ভঙ্গিই হয়ে উঠেছে বিষাদের ভাষা। প্যাস্টেলের নরম প্রলেপে বন্দিত্ব ও আশাভঙ্গের এক নিঃসঙ্গ মুহূর্ত ধরা পড়ে।
প্রতিধ্বনি: ললিত কলা অকাদেমিতে আয়োজিত প্রদর্শনী ‘ভিভিড ইকোজ়’-এর চিত্রকর্ম। — নিজস্ব চিত্র।
এই ধারাবাহিকতায় বিশেষ সমৃদ্ধ করে তোলে সোমনাথ হোরের পেন্সিলের কাজ, লালুপ্রসাদ সাউয়ের লিথোগ্রাফ, মনোজ দত্ত-র মিশ্র মাধ্যম, সমীর সরকার ও সুকান্ত দাসের অ্যাক্রিলিক, শমীক দে ও সুশোভন অধিকারীর ইঙ্ক, বিশ্বপতি মাইতির মিশ্র মাধ্যম, কে জি সুব্রহ্মণ্যনের মিশ্র মাধ্যম, গীতা মাইতির সিল্কের উপরে মিশ্র মাধ্যম, বি আর পানেসর ও শাকিলার কোলাজ, চিত্রভানু মজুমদারের তেলরং এবং শ্যামল দত্ত রায়ের জলরং। তাঁদের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের উপস্থিতি অতীতের প্রতিধ্বনিকে বর্তমানের আলোয় শ্রদ্ধা জানায়। যেমন বাপ্পা ভৌমিকের পেন অ্যান্ড ইঙ্কের ড্রয়িং, সৌরভ শী ও জোনাকি ভট্টাচার্যের রং প্রয়োগের সাহস আশাবাদী।
প্রতিধ্বনি: ললিত কলা অকাদেমিতে আয়োজিত প্রদর্শনী ‘ভিভিড ইকোজ়’-এর চিত্রকর্ম। — নিজস্ব চিত্র।
ভিভিড ইকোজ় তাই কেবল স্মৃতির প্রদর্শনী নয়। পরিচিতের পাশে অপরিচিত, ইতিহাসের পাশে সমকাল— এই পাশাপাশি অবস্থানই তার মূল শক্তি। পুরনো শিল্পভাষার পুনরাবৃত্তি নয়, নতুন চোখে ফিরে দেখার এক অবিরাম সম্ভাবনা।