E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

পঞ্চভূতের কারুবাসনা ও গৃহস্থালির গল্পগাথা 

পরবর্তী জীবনে ছবির পটভূমিতে টেক্সচার বা গঠনরীতিতে নতুনত্ব আনতে গিয়ে ওই সব কাপড়ের টুকরো ব্যবহার করেছেন সোমা।

শমিতা বসু

শেষ আপডেট: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:২৮
দোঁহে মিলে: শিল্পী রুমা চৌধুরী ও সোমা দাসের যৌথ প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম।

দোঁহে মিলে: শিল্পী রুমা চৌধুরী ও সোমা দাসের যৌথ প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম।

সোমা দাস রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেন্টিং নিয়ে পাশ করার পরে ছবি নিয়ে থেকেছেন সারা জীবন। কলকাতা সেন্টার ফর ক্রিয়েটিভিটিতে সোমার একটি প্রদর্শনী সম্প্রতি আয়োজিত হয়েছিল। শিল্পী ছোটবেলায় থেকেছেন এয়ারপোর্টের কাছে নিউ ব্যারাকপুর অঞ্চলে। কাজেই বিমানের আকাশে ওঠানামা দেখে যেন এক স্বপ্নের জগতে বাস ছিল মেয়েটির।

বাড়িতে তাঁর বাবা কাঠের কাজ করতেন। কাঠের সঙ্গে সোমার পরিচিতি শিশুকাল থেকেই। মা সেলাই করার সময়ে সুন্দর সব ছিট কাপড়ের টুকরো জড়ো করে রাখতেন। সেই সব কাপড়ের ডিজ়াইন সোমাকে আকর্ষণ করত।

পরবর্তী জীবনে ছবির পটভূমিতে টেক্সচার বা গঠনরীতিতে নতুনত্ব আনতে গিয়ে ওই সব কাপড়ের টুকরো ব্যবহার করেছেন সোমা। তিনি অনেক সময়েই ক্যানভাসের উপরে সুতির ছাপা শাড়ির টুকরো পেস্ট করে তার উপরে জাপানি ‘লোকটা’ কাগজ সেঁটে, এক অনবদ্য পটভূমি সৃষ্টি করে, তার‌ উপরে গোয়াশের কাজে ছবি আঁকেন।

গোয়াশ হল এক ধরনের অস্বচ্ছ জলরঙের মাধ্যম। সাধারণ জলরঙের মতো এতেও পিগমেন্ট থাকে, যা জলে গুলে যায়। কিন্তু তার সঙ্গে সাধারণত বাড়তি অস্বচ্ছ সাদা উপাদান, আজকাল রঙের সঙ্গে গাম অ্যারাবিক মিলিয়ে সৃষ্টি করা হয় এক রং, যেটি ম্যাট ফিনিশ দেয় এবং গাঢ় রঙের উপরে হালকা রঙের আস্তরণ দেওয়া যায়, যা সাধারণ জলরঙে হয় না। এই পটভূমিতে সোমা নিখুঁত তুলিতে খুঁটিনাটি এঁকেছেন।

ছোটবেলা থেকেই বাড়ি এবং আশপাশের মানুষ ও প্রকৃতিকে ভালবেসে বড় হয়ে উঠেছেন সোমা। ঘরে মাকে দেখেছেন, মা-বাবার মধ্যে অপরিসীম ভালবাসা দেখেছেন,‌ হয়তো দেখেছেন অন্যান্য মহিলাদেরও, নানা গৃহকর্মে। শান্তিপূর্ণ পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা মেয়েটি যখন পরিপূর্ণ ভাবে শিল্পী হয়ে উঠলেন, তখন তাঁর ছবিতে উঠে এল গৃহস্থালির নানা উপাদান। শাড়ির ডিজ়াইনের উপরে আকর্ষণ ছিল বরাবরই। নারীদের শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে প্রেম যেন জড়িয়ে থাকে, তা খেয়াল করেছিলেন ছোট থেকেই। সাধারণ ঘরোয়া কাজগুলিতে অত্যন্ত যত্নে ও গভীর ভালবাসায় সোমার ফুটিয়ে তোলা সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ প্রশংসনীয়। স্নানঘর থেকে বেরিয়ে এসে যে রকম মেয়েরা শাড়ি পরে, ভিজে চুলে গামছা বেঁধে রাখে, যে রকম পাশাপাশি বাড়িতে মেয়েরা ছাদের আবহাওয়ায় গল্পে মজে, ছেলেরা বসে পড়াশোনা করে, বয়স্ক মহিলারা চেয়ারে আরাম করে পা তুলে বসে‌ চা-চক্রের সদস্য হন, ছোট মেয়ের কোলে পুতুল... ইত্যাদি নিয়ে এক প্রাণবন্ত ছাদবাগান ধরা পড়ে সোমার কাজে।

কাগজে কালি-কলমের ভারী সুন্দর একটি ড্রয়িং ছিল সোমার, যেটির নাম ‘মেড ফর ইচআদার’। সেখানে গৃহকর্তা ঘরের উপরের সিমেন্ট করা উঁচু জায়গায় মালপত্র উঠিয়ে রাখছেন, আর ঠিক তার নীচে সিঁড়ি ধরে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর স্ত্রী, স্বামীর নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে। এখানে ভারতীয় মিনিয়েচার ছবির দৃষ্টিকোণ, অলঙ্করণ এবং নান্দনিক সাজসজ্জার রূপ মধ্যবিত্ত জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে নিজস্ব এক অনন্য স্বাক্ষর রেখেছেন শিল্পী সোমা দাস।

প্রদর্শনীর দ্বিতীয় শিল্পী ছিলেন রুমা চৌধুরী। রুমা কলাভবনের প্রাক্তনী। সেখানে চিত্রকলা এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে পড়াশোনার সঙ্গে কাগজ তৈরির প্রশিক্ষণ তাঁর হয়েছিল। পরে তাঁর গবেষণাপত্রের বিষয় ছিল কাগজ উৎপাদনের নিবিড় শিক্ষা। তখন তিনি নিজস্ব এক স্টুডিও নির্মাণ করেন, যেটির নাম দিয়েছিলেন ‘পেপার নেস্ট’। রুমা চৌধুরীর শিল্পের শিকড় শান্তিনিকেতনে, যে স্থান এক গভীর শিল্প-ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার হিসেবে প্রসিদ্ধ।

রুমা তাঁর কাজে পঞ্চভূতের কথা বলেছেন— ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম। প্রথমেই আসে ক্ষিতি, অর্থাৎ পৃথিবীতে উৎপন্ন যত রকম তন্তু ও অবশিষ্ট পদার্থ, ফাইবার বা আঁশ থেকে তিনি কাজ আরম্ভ করেন। তার পর সেগুলিকে ধোয়া আবার বাইরে ফেলে রাখার মধ্যে আছে অপ বা জলের সান্নিধ্য। এর পরে সেই আঁশ বাইরে রোদে ফেলে শুকনো ও বিবর্ণ করার মধ্যে আছে তেজ। তা যখন কাগজে রূপান্তরিত হল, তখন আকাশের নীচে বিস্তারের মধ্যে আছে মরুৎ এবং ব্যোম।

শান্তিনিকেতনে থাকার সময়ে রুমা লক্ষ করেছেন রামকিঙ্কর বেজের আঙিনায় রাখা বিশাল স্থাপত্যগুলি যেন মেঘ, বৃষ্টি, ঝড়ের সঙ্গে একাত্মতা স্থাপন করেছে। আরও দেখেছেন, সোমনাথ হোরের ‘উন্ড’ সিরিজ়ের ছবি, যেখানে কাগজের ভিতর থেকেই জন্ম নিল ক্ষত,‌ কোনও বাইরের পদার্থের সাহচর্যে নয়। সেখানে দেখা যায় কেটে যাওয়া পায়ে রক্তের ছাপ।

উপাদান ও শিল্প প্রক্রিয়ার সঙ্গে শিল্পীর সখ্য সেই সময় থেকেই। তাঁর নিজস্ব শিল্পকলার উপরে প্রকৃতির ছাপ তোলেননি তিনি। প্রকৃতির সমস্ত উপজাত দ্রব্যই তাঁর শিল্পচর্চার উপাদান। প্রকৃতিই তাঁর শিল্পের অমূল্য উপকরণের সামগ্ৰী প্রদানকারী। আখের ছিবড়‌ে, কলাগাছের শুকনো কাণ্ড, পরিত্যক্ত ডুমুরের খোসা ছাড়াও প্রকৃতির কোল থেকে আদরে, যত্নে সংগ্রহ করেছেন বহু জিনিস। এমনকি রুমা নিজের কাগজে ধরে রেখেছেন বৃষ্টির টাপুর-টুপুর পদচিহ্ন।

ধানের শুকিয়ে যাওয়া আঁশ, তসরের থেকে যে কাগজ জন্ম নিল, তার রং সাদা, ইন্ডিগো থেকে নীল। সর্বোপরি সেই কাগজকে শিল্পী মানুষের চোখে মূল্যবান করে তুলেছেন সোনার পাত, সোনার গুঁড়ো ছড়িয়েছিটিয়ে।‌ প্রকৃতি, প্রেম যখন শিল্পের দেহালঙ্কার হয়, তখন সেটি হয় অমূল্য। দুই শিল্পীর এই প্রদর্শনীটি যেন সেই সার্থকতার কথাই বলে।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Rabindra Bharati University Art exhibition

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy