সম্প্রতি উত্তম মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল কলাস্তুতি ডান্স ইনস্টিটিউটের নিবেদন ‘উৎকর্ষ ২০২৬’। দু’টি পর্যায়ে বিভক্ত এই অনুষ্ঠানের প্রথম নিবেদন ‘অনহদ ধ্বনি’, যা ভরতনাট্যম নৃত্যের আঙ্গিকে উপস্থাপিত। দ্বিতীয় নিবেদন ‘প্রভু আমার প্রিয় আমার’ রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশনা।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক ‘বন্দে মাতরম্’ সঙ্গীত রচনার দেড়শো বছর পূর্তি উপলক্ষে সূচনায় কলাস্তুতি-র ছাত্রীরা ভরতনাট্যম আঙ্গিকে যে নৃত্য পরিবেশন করেন, তা অত্যন্ত নয়নলোভা। এর পর একে একে উপস্থাপিত হয় ভরতনাট্যম আঙ্গিকে শিবস্তুতি (আঙ্গিকম), গণেশবন্দনা, সরস্বতীবন্দনা, কৃষ্ণভজন এবং তুলসীদাস রচিত ভজন ‘শ্রীরামচন্দ্র কৃপালু ভজনম’। এই নৃত্যাংশগুলির কোরিয়োগ্রাফার সংস্থার কর্ণধার চৈতি ঘোষ। এই নৃত্যাংশে শিশুশিল্পীরা নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছে।
পরবর্তী পর্বে নিবেদিত হয় গম্ভীরানাতেই রাগ এবং আদি তালে নিবদ্ধ পুষ্পাঞ্জলি, কামস রাগ এবং আদি তালে নিবদ্ধ কীর্তনম ‘ইথাডুপদম’, তুলসীদাসের ভজন ‘গাইয়ে গণপতি’, ‘জাভেলি’ এবং বৃন্দাবনী রাগ ও আদি তালে নিবদ্ধ ‘তিল্লানা’। গণপতি নৃত্যে সৃনিথী নন্দী, ঐশী পাত্র, তিয়াসা দত্ত, সুপ্রীতি বন্দ্যোপাধ্যায়, বৈতালী পাল, সৃনিথী বেরা সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। যথেষ্ট বলিষ্ঠ তাঁদের পরিবেশনা, ‘ইথাডুপদম’ এবং ‘জাবালি’ নৃত্য দু’টির একক পরিবেশনা সংস্থার কর্ণধার চৈতি ঘোষের। চৈতি একজন প্রতিষ্ঠিত নৃত্যশিল্পী এবং তার নিদর্শন আমরা দেখলাম তাঁর দু’টি পরিবেশনায়। ‘নৃত্তা’ অর্থাৎ বিশুদ্ধ যতি ব্যবহার করে নৃত্য প্রদর্শন এবং ‘নৃত্য’ অর্থাৎ ভাবের বিন্যাস। এই দু’টি ক্ষেত্রেই চৈতি অসামান্যা। ধ্রুপদী নৃত্যে এই দুইয়ের ব্যবহার ও প্রয়োগ অত্য়ন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
‘ইথাডুপদম’ নৃত্যে সার্থক ভাবে প্রয়োগ করেছেন ‘নৃত্তা’ এবং ‘নৃত্য’-কে। স্মরসুন্দর রাগ এবং আদি তালে নিবদ্ধ ‘জাবালি’ নৃত্যে চৈতির উপস্থাপনা মনোমুগ্ধকর, নয়নলোভা। কন্নড় শব্দ ‘ঝাভালি’ থেকে ‘জাবালি’ শব্দটির উৎপত্তি, যার অর্থ গান বা কবিতা। জাবালি-র মূল বিষয়বস্তু শৃঙ্গার রস। গানের হালকা ও চটুল কথার উপরে ভিত্তি করে নৃত্যশিল্পী চৈতি তাঁর চোখ ও মুখের অভিব্যক্তির মাধ্যমে চমৎকার ভাব প্রকাশ করেছেন। ‘অন্থাদধ্বনি’ পর্যায়ের শেষ উপস্থাপনা ‘তিল্লানা’, যেখানে চৈতি ঘোষ তাঁর ছাত্রীদের সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করে নেন। বলিষ্ঠ উপস্থাপনা।
দ্বিতীয় পর্বে ছিল রবীন্দ্রনাথের গানের ছয়টি পর্যায়ের উপরে ভিত্তি করে ‘প্রভু আমার প্রিয় আমার’। পূজা, বিচিত্র, প্রকৃতি, প্রেম, আনুষ্ঠানিক এবং স্বদেশ পর্যায়ের গানগুলি ছিল যথাক্রমে ‘আলোয় আলোকময় করে হে’, ‘জোনাকি কী সুখে ওই ডানা দুটি’, ‘আজ ধানের খেতে’, ‘আয় তবে সহচরী’, ‘মরুবিজয়ের কেতন উড়াও’ এবং ‘আমরা সবাই রাজা’। শেষ নিবেদন ছিল শান্তির বার্তা নিয়ে ‘বহে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা’। এই পর্বের সুচিন্তিত নৃত্য পরিকল্পনা, পোশাক ও আলোর ব্যবহার ছিল নজরকাড়া।
অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা ও পরিচালনায় চৈতি ঘোষ। আলোকপাতে সৌমেন চক্রবর্তী ও মঞ্চসজ্জায় সৌরভ চট্টোপাধ্যায়ের কাজ বেশ ভাল। সঞ্চালনায় ছিলেন বাংলায় শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ও ইংরেজিতে সঞ্চিতা দত্ত। সার্থক এই অনুষ্ঠানটি দর্শকদের আনন্দ প্রদান করেছে।